আজ উঠান, কাল ঘর — নদীভাঙনে নিঃস্ব হওয়ার অপেক্ষায় চরবংশীর মানুষ
লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার ২ নম্বর চরবংশী ইউনিয়নের গরম বাজার এলাকায় ভয়াবহ নদীভাঙনে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন শতাধিক পরিবার। প্রতিদিন নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, কৃষিজমি ও জনপদের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই ভাঙনের তীব্রতায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।সরেজমিনে দেখা যায়, গরম বাজার সংলগ্ন নদীতীরে ভয়াবহ ভাঙন চলছে। নদীর তীব্র স্রোতে পাড়ের বিশাল অংশ ধসে পড়ছে। কয়েকটি বসতঘর ভাঙনের একেবারে কিনারায় ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। কোথাও কোথাও ঘর থেকে নদীর দূরত্ব মাত্র কয়েক ফুট। পাড়জুড়ে বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। সামান্য বৃষ্টি বা জোয়ার এলেই নতুন করে মাটি ধসে পড়ছে।স্থানীয় বাসিন্দা রহিমা বেগম বলেন, “নদীর দিকে তাকালেই বুকটা কেঁপে ওঠে। এই ঘরটা বানাতে অনেক কষ্ট করেছি। এখন মনে হয় সবকিছু চোখের সামনে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে নদী।” তিনি জানান, রাত হলেই সন্তানদের নিয়ে আতঙ্কে থাকতে হয়। বৃষ্টি হলেই ঘর ধসে পড়ার ভয় তাড়া করে বেড়ায়।একই এলাকার আবদুল করিম বলেন, “আমার বাড়ির সামনের অনেক অংশ নদীতে চলে গেছে। আগে যেখানে উঠান ছিল, এখন সেখানে নদীর পানি। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি নতুন করে মাটি ভাঙছে। এভাবে চলতে থাকলে কয়েক দিনের মধ্যে ঘর সরানো ছাড়া উপায় থাকবে না।”স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত কয়েক মাসে ভাঙনের তীব্রতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। নদীর ধারঘেঁষে থাকা অনেক পরিবার ইতোমধ্যে ঘরবাড়ি সরানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। কেউ মূল্যবান জিনিসপত্র আত্মীয়দের বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছেন, আবার কেউ বিকল্প আশ্রয়ের খোঁজ করছেন।এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা হাবিব উল্লাহ বলেন, “এই এলাকায় নদীভাঙন নতুন নয়। তবে এবার পরিস্থিতি অনেক বেশি ভয়াবহ। আগে ধীরে ধীরে ভাঙত, এখন এক রাতেই কয়েক ফুট মাটি নদীতে চলে যাচ্ছে।”শুধু বসতভিটা নয়, নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে কৃষিজমিও। স্থানীয় কৃষক নুরুল ইসলাম জানান, তার প্রায় আধা একর কৃষিজমি নদীতে চলে গেছে। ওই জমির ফসল দিয়েই সংসার চলত। জমি হারিয়ে এখন তিনি চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন।স্থানীয় ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিন বলেন, “গরম বাজার এলাকার বাজার, রাস্তা ও বসতবাড়ি—সবকিছুই এখন ঝুঁকির মধ্যে। আমরা বারবার প্রশাসনের কাছে বিষয়টি জানিয়েছি, কিন্তু এখনো স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।”এলাকাবাসীর অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে নদীভাঙন চললেও কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়নি। ভাঙনকবলিত এলাকায় জিও ব্যাগ ফেলা কিংবা স্থায়ী নদীতীর সংরক্ষণ প্রকল্প বাস্তবায়নের কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই। ফলে প্রতি বর্ষা মৌসুমেই নতুন করে আতঙ্কে দিন কাটাতে হয় স্থানীয়দের।স্থানীয় যুবক সোহেল রানা বলেন, “নদী প্রতিদিন একটু একটু করে আমাদের বসতভিটা গিলে খাচ্ছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পুরো এলাকাই একদিন নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে।”এ বিষয়ে লক্ষ্মীপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী গোকুল চন্দ্র পাল বলেন, “রায়পুর উপজেলার প্রায় চার কিলোমিটার এলাকাজুড়ে নদীভাঙন অব্যাহত রয়েছে। ভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে একটি প্রকল্প প্রস্তাবনা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।”তিনি আরও জানান, সম্প্রতি পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. এনামুল হক ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন।স্থানীয়দের দাবি, বর্ষা মৌসুম আরও তীব্র হওয়ার আগেই জরুরি ভিত্তিতে নদীতীর সংরক্ষণ কাজ শুরু করতে হবে। অন্যথায় শত শত পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়ে মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।চরবংশীর নদীতীরে দাঁড়িয়ে থাকা ঝুঁকিপূর্ণ ঘরগুলো যেন প্রতিনিয়ত সেই আশঙ্কার কথাই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। নদী এখানে শুধু মাটি ভাঙছে না, ভেঙে দিচ্ছে মানুষের স্বপ্ন, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের আশ্রয়।