মোঃ শফিকুজ্জামান সোহেল, গঙ্গাচড়া (রংপুর) প্রতিনিধি
প্রকাশ : ২২ জুলাই ২০২৬ রাত ১০:৩০:৫২
গঙ্গাচড়ায় পানি নামতেই তিস্তার করাল থাবা, একে একে গিলছে ভিটেমাটি
বন্যার পানি নামতে শুরু করেছে। কিন্তু সেই স্বস্তি ছাপিয়ে এখন গঙ্গাচড়ার মানুষের বুক কাঁপছে তিস্তার ভাঙনের আতঙ্কে। নদীর তীব্র স্রোতে প্রতিদিন একটু একটু করে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, ফসলি জমি, মানুষের আজীবনের সঞ্চয়। চোখের সামনে নিজের ঘর নদীতে তলিয়ে যেতে দেখে অসহায় দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া যেন আর কিছুই করার নেই তাদের।
রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার নোহালী ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের কাচাড়িপাড়া গ্রামে গিয়ে এমনই হৃদয়বিদারক চিত্র দেখা গেছে। গত কয়েক দিনের অব্যাহত ভাঙনে অন্তত আটটি বসতবাড়ি তিস্তা নদীগর্ভে চলে গেছে। হারিয়ে গেছে শত বিঘা আবাদি জমিও। নদীতীরের শতাধিক পরিবার এখন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে—কখন যে তাদের শেষ সম্বলটুকুও নদী গিলে খায়।
বুধবার সরেজমিনে দেখা যায়, তিস্তার উত্তাল স্রোতে নদীতীরের মাটি মুহূর্তেই ধসে পড়ছে। কোথাও বাড়ির আঙিনা নেই, কোথাও ভাঙন এসে ঠেকেছে ঘরের বারান্দায়। কেউ ঘরের টিন খুলে রাখছেন, কেউ ইট, কাঠ কিংবা আসবাবপত্র সরিয়ে নিচ্ছেন নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে। অনেক পরিবার খোলা আকাশের নিচে গৃহস্থালির মালপত্র নিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের অপেক্ষায়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, পানি বাড়ার সময় বন্যার শঙ্কা থাকলেও এখন পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে ভাঙনের তীব্রতা কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। বর্তমানে তিস্তার পানি বিপদসীমার ১৭ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও প্রবল স্রোতে নদীতীর দ্রুত ভেঙে পড়ছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, ভাঙনে আলহাজ মোত্তালিব, সুরুজ মিয়া ও আনোয়ার হোসেনসহ অন্তত আটটি পরিবারের বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। পাশাপাশি শত বিঘা ফসলি জমিও হারিয়ে গেছে। প্রতিদিনই নতুন নতুন এলাকা ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়ছে।
চোখে অশ্রু নিয়ে আলহাজ মোত্তালিব বলেন, “চোখের সামনে আমার বাড়ি নদীতে চলে গেল। সারাজীবনের সঞ্চয় মুহূর্তেই শেষ হয়ে গেছে। এখন পরিবার নিয়ে কোথায় আশ্রয় নেব, জানি না।”
সুরুজ মিয়ার কণ্ঠেও একই অসহায়ত্ব। তিনি বলেন, “ভিটেমাটি হারিয়ে আমরা এখন নিঃস্ব। সরকার যদি দ্রুত পাশে না দাঁড়ায়, তাহলে পরিবার নিয়ে পথে বসতে হবে।”
আনোয়ার হোসেন বলেন, “নদী আমার ঘর, জমি—সবকিছু কেড়ে নিয়েছে। এখন সন্তানদের নিয়ে কোথায় যাব, সেটাই সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা।”
নোহালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আশরাফ আলী বলেন, পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ইতোমধ্যে কয়েকটি বসতবাড়ি ও বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। বিষয়টি উপজেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে জানানো হয়েছে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জেসমিন আক্তার জানান, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে সমন্বয় করে ভাঙনরোধে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্তদের সরকারি সহায়তা দেওয়ার বিষয়েও ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম বলেন, ভাঙনের খবর পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এলাকা পরিদর্শন করেছেন। পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং বিভিন্ন স্থানে ভাঙনরোধে কাজ চলমান রয়েছে।
তবে আশ্বাসে ভরসা পাচ্ছেন না কাচাড়িপাড়ার মানুষ। তাদের দাবি, জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন ঠেকাতে হবে, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে এবং তিস্তার স্থায়ী নদীশাসন প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। তা না হলে কাচাড়িপাড়ার আরও অসংখ্য বসতবাড়ি, কৃষিজমি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা তিস্তার করাল গ্রাসে হারিয়ে যাবে—এমন আশঙ্কাই এখন এলাকাবাসীর।