কবরস্থানও এখন মেঘনার গ্রাসে, আতঙ্কে স্বজনরা
হানিফ উদ্দিন সাকিব, হাতিয়া (নোয়াখালী) প্রতিনিধি
প্রকাশ : ৩ নভেম্বর ২০২৬ দুপুর ০১:৩২:৪৯
জীবিতের ঘর, মৃতের কবর—সবই মেঘনার ভাঙনে
একদিকে বসতভিটা, অন্যদিকে কবরস্থান। মাঝখানে মাত্র কয়েক হাত মাটি। সেই মাটিটুকুও ধীরে ধীরে কেড়ে নিচ্ছে মেঘনা নদী। নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার চরঈশ্বর ইউনিয়নের আফাজিয়া এলাকায় নদীভাঙন এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, জীবিত মানুষের ঘরবাড়ির পাশাপাশি মৃত স্বজনদের শেষ ঠিকানাও পড়েছে ঝুঁকিতে।
কবরস্থানের পাশের মাটি সরে গেছে। কোথাও দেখা দিয়েছে ফাটল। নদী আর একটু এগিয়ে এলেই মেঘনার স্রোতে বিলীন হয়ে যেতে পারে কবরগুলো। এ নিয়ে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্কে রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চরঈশ্বর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের আফাজিয়া বাজার জামে মসজিদের সামনের কবরস্থানে কয়েক বছর আগে স্থানীয় বাসিন্দা মাস্টার তমুক মিয়াসহ বেশ কয়েকজনকে দাফন করা হয়। তখন কবরস্থানটি নদী থেকে কিছুটা দূরে ছিল। কিন্তু গত কয়েক বছরে নদীর অব্যাহত ভাঙনে তীরের মাটি সরে যেতে যেতে কবরস্থানটিও চলে এসেছে মেঘনার একেবারে কিনারায়।
কবরস্থানের আশপাশে গেলেই চোখে পড়ে ভাঙনের ভয়াবহ চিহ্ন। কোথাও নদীর তীর ধসে পড়েছে, কোথাও কবরের পাশের মাটি নরম হয়ে গেছে। প্রতিদিন নদীর গতিপথ ও পানির ওঠানামার দিকে তাকিয়ে থাকছেন স্বজনরা। তাঁদের আশঙ্কা, ভাঙন ঠেকানো না গেলে একসময় কবরগুলোর অস্তিত্বও থাকবে না।
স্থানীয় বাসিন্দা নিপু খিলজি খবরের কাগজকে বলেন, হাতিয়ায় নদীভাঙন নতুন কোনো ঘটনা নয়। বছরের পর বছর ধরে মানুষ ঘরবাড়ি, জমিজমা হারাচ্ছেন। কিন্তু কবরস্থান ভাঙনের মুখে পড়ায় কষ্টটা অন্যরকম। জীবিত অবস্থায় বসতভিটা হারানোর পর এখন মৃত স্বজনদের কবরও হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আফাজিয়া বাজার জামে মসজিদের দায়েমি মুসল্লি আজিজ মিয়া খবরের কাগজকে বলেন, মানুষ মারা যাওয়ার পর কবরই তাঁর শেষ ঠিকানা। স্বজনকে দাফন করার পর মনে করি, অন্তত এই জায়গাটুকু থাকবে। কিন্তু নদী যদি সেই কবরও নিয়ে যায়, তাহলে কষ্টটা আরও বেশি। ঘর হারানোর কষ্ট সহ্য করা যায়, কিন্তু বাবা-মা কিংবা স্বজনের কবর নদীতে বিলীন হতে দেখা আরও বেদনাদায়ক।
স্থানীয়রা জানান, জোয়ারের সময় নদীর পানি বাড়লে কবরস্থান নিয়ে তাঁদের আতঙ্কও বেড়ে যায়। নদীর তীর থেকে মাটি সরে যাওয়ার দৃশ্য দেখে অনেকে কবরস্থানে গিয়ে স্বজনদের কবর দেখে আসেন। তাঁদের আশঙ্কা, ভাঙন অব্যাহত থাকলে একসময় কোনো কোনো কবরের চিহ্নও মুছে যেতে পারে।
স্থানীয় মানুষের কাছে কবরস্থান শুধু কয়েক হাত মাটি নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পরিবার, স্মৃতি ও প্রজন্মের সম্পর্ক। বাবা-মা, ভাই-বোন, সন্তান কিংবা স্বজনের কবর জিয়ারত করতে প্রতিনিয়ত সেখানে যান মানুষ। ঈদ কিংবা পারিবারিক বিশেষ দিনেও অনেকে কবরস্থানে গিয়ে দোয়া করেন। সেই শেষ আশ্রয়টিই যখন নদীর কিনারায় চলে আসে, তখন মানুষের উদ্বেগ শুধু মাটি হারানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।
হাতিয়ার বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মেঘনার ভাঙনে বসতভিটা, কৃষিজমি, রাস্তা ও বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক পরিবার একাধিকবার ঘর সরিয়ে অন্যত্র বসতি গড়েছে। স্থানীয়দের ভাষায়, “ঘর হারালে নতুন করে ঘর তোলা যায়, কিন্তু নদীতে হারিয়ে যাওয়া কবরস্থান আর ফিরে পাওয়া যায় না।
এ কারণে নদীভাঙনকে শুধু ভূমি হারানোর সমস্যা হিসেবে দেখতে চান না স্থানীয়রা। তাঁদের মতে, এর সঙ্গে মানুষের সামাজিক ও পারিবারিক অস্তিত্বও জড়িয়ে আছে। বিশেষ করে কবরস্থান ঝুঁকিতে পড়ায় বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ভাঙনপ্রবণ এলাকাগুলোতে স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিবছরই নতুন করে ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। তাঁরা দ্রুত ঝুঁকিপূর্ণ কবরস্থানগুলো চিহ্নিত করে সুরক্ষার ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি মেঘনার ভাঙন রোধে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই প্রকল্প বাস্তবায়নেরও দাবি তাঁদের।
স্থানীয়দের প্রশ্ন—জীবিত মানুষের ঘরবাড়ি যদি মেঘনা কেড়ে নেয়, সেটি অবশ্যই বেদনাদায়ক। কিন্তু মৃত্যুর পরও যদি মানুষের শেষ ঠিকানাটুকু নিরাপদ না থাকে, তাহলে এই নদীভাঙনের কাছে মানুষের অসহায়ত্বের সীমা কোথায়?
মেঘনার ভাঙন তাই হাতিয়ার মানুষের কাছে এখন শুধু ঘর কিংবা জমি হারানোর গল্প নয়। জীবিতের ঘরের পাশেই মৃতের কবরও দাঁড়িয়ে আছে একই অনিশ্চয়তার সামনে। নদীর ভাঙন থামানো না গেলে হয়তো একদিন মানুষের বসতভিটার মতোই মেঘনার বুকে হারিয়ে যাবে বহু প্রিয়জনের শেষ ঠিকানাও।