আনোয়ারা (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি
প্রকাশ : ১২ আগস্ট ২০২৬ রাত ০৮:৩৬:৩৫
আনোয়ারায় ‘মাদকের ভয়াবহ বিস্তার’ নিয়ে উদ্বেগ
চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় মাদকের ভয়াবহ বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অবাধে বিক্রি হচ্ছে ইয়াবা, গাঁজা, মদসহ নানা ধরনের মাদকদ্রব্য। দিনদুপুরে প্রকাশ্যেই চলছে মাদক বেচাকেনা ও সেবন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদক সহজে পাওয়া যাওয়ায় স্কুল-কলেজপড়ুয়া কিছু শিক্ষার্থীও এর প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছে। অনেকে ক্লাস ফাঁকি দিয়ে বিভিন্ন স্থানে গিয়ে মাদক সেবন করছে। তবে অনেক অভিভাবকই জানেন না, তাদের সন্তান ধীরে ধীরে মাদকের ভয়াবহ ছোবলে বিপথগামী হচ্ছে।
বিশেষ করে কিশোর গ্যাংরা বিভিন্ন স্থানে মাদক সেবনের আস্তানা গড়ে তুলেছে। ফলে এলাকায় চুরি, ছিনতাইসহ নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। মাদকের এমন ভয়াবহ বিস্তারে অতিষ্ঠ ও আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন এলাকার সাধারণ মানুষ।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে ও সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, আনোয়ারা উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ জন বড় মাদক কারবারি সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের মাধ্যমে উপজেলার অন্তত ৪০টি স্পটে ইয়াবা, গাঁজা, মদসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক বিক্রি হচ্ছে বলে স্থানীয়দের দাবি।
মাদক কারবারিরা বিভিন্ন মহলকে ম্যানেজ করে দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় মাদকের একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। কক্সবাজারসহ বিভিন্ন জেলা থেকে নৌপথ ও সড়কপথে আনোয়ারায় মাদক পরিবহন করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
খুচরা ও পাইকারি মাদক কারবারিরা নানা কৌশলে এসব মাদকদ্রব্য আনা-নেওয়া করে থাকে। উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজার, টং দোকান, গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট এবং কিছু বাড়িঘরে মাদক বিক্রি হচ্ছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, একাধিকবার পুলিশের হাতে আটক হওয়া চিহ্নিত মাদক কারবারি ও সেবনকারীদের কেউ কেউ দূর থেকে উঠতি বয়সের তরুণ-তরুণী এবং বয়স্ক নারীদের ব্যবহার করে মাদক পরিবহন করছে। এতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সন্দেহ এড়ানো সহজ হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ উপজেলার একাধিক মাদক কারবারি ও তাদের সহযোগী অতীতে একাধিকবার গ্রেফতার হলেও জামিনে বা কারামুক্ত হয়ে পুনরায় মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। মাদক কারবারিরা বিভিন্ন প্রভাবশালী ও ভদ্রবেশী ব্যক্তিকে চাঁদা দিয়েও ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, উপজেলার প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নের গ্রামে গ্রামে মাদক ব্যবসা ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু ভয়ে অনেকেই এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পান না। অথচ এলাকার অধিকাংশ মানুষই জানেন, কারা মাদক কারবারি এবং কারা সেবনের সঙ্গে জড়িত।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদকবিরোধী অভিযানে অনেক সময় সেবনকারী ও খুচরা বিক্রেতারা গ্রেফতার হলেও মাদক ব্যবসার মূলহোতা ও বড় কারবারিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। তাদের মতে, এভাবে ছোট কারবারিদের গ্রেফতার করা হলেও মাদকের মূল সরবরাহব্যবস্থা বন্ধ হচ্ছে না।
মাদকাসক্তদের অনেকেই মাদকের টাকা জোগাড় করতে পরিবারের সদস্যদের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। মা-বাবা, স্ত্রী-সন্তানকে মারধর করার পাশাপাশি বিভিন্ন বাড়িঘর, দোকানপাট, স্কুল-কলেজ, মসজিদ ও মন্দিরে চুরির ঘটনাতেও মাদকাসক্তদের জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, মাদক কারবারি ও সেবনকারীর সংখ্যা এভাবে বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে সামাজিক ও পারিবারিক অস্থিরতা আরও তীব্র হতে পারে। তাই মাদকের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
আনোয়ারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জুনায়েত চৌধুরী বলেন, মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। মাদকের বিরুদ্ধে কোনো আপোষ নেই। আমরা প্রতিনিয়ত মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে আসছি।
এ বিষয়ে আনোয়ারা সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মাহমুদুল হাসান বলেন,মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। মাদক নির্মূল ও মাদকমুক্ত দেশ গড়ার লক্ষ্যে পুলিশের অভিযান অব্যাহত থাকবে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, শুধু খুচরা বিক্রেতা বা সেবনকারীদের গ্রেফতার নয়, মাদকের মূল কারবারি ও নেপথ্যের পৃষ্ঠপোষকদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে। পাশাপাশি তরুণ সমাজকে মাদক থেকে দূরে রাখতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগ জোরদার করা হবে।