নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১১ জুলাই ২০২৬ দুপুর ০২:৪২:৩২
উন্নয়ন প্রকল্পে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও প্রকৌশলীদের সিদ্ধান্তের গুরুত্ব বাড়ানোর আহ্বান: প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম
উন্নয়ন প্রকল্পের পরিকল্পনা, নকশা ও বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে প্রকৌশলীদের সক্রিয় ভূমিকা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।
তিনি বলেন, প্রকৌশল-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে প্রকৌশলীদের নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে এবং প্রকৌশলগত সিদ্ধান্ত প্রকৌশলীদের হাতেই থাকা উচিত। এতে উন্নয়ন প্রকল্পের গুণগত মান বাড়বে, সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত হবে এবং টেকসই জাতীয় উন্নয়ন বাস্তবায়ন সহজ হবে।
১১ জুলাই শনিবার সকালে রাজধানীর রমনায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশ (আইইবি) সদর দপ্তরের শহীদ প্রকৌশলী ভবনের কাউন্সিল হলে ‘Inauguration of APMCE2026 & Success and Failure of Projects from Project Management Viewpoint: Bangladesh and International Context’ শীর্ষক সেমিনারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। আইইবির পুরকৌশল বিভাগ এ সেমিনারের আয়োজন করে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, গবেষণার ফলাফল সরকার নীতিনির্ধারণ ও উন্নয়ন পরিকল্পনায় কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারে। এজন্য গবেষণালব্ধ সুপারিশ বাস্তবায়নে সরকারের সক্রিয় সহযোগিতা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, বর্তমানে অনেক প্রকৌশলী উচ্চশিক্ষা শেষ করে প্রকৌশল পেশার পরিবর্তে প্রশাসনিক পেশায় বেশি আগ্রহী হচ্ছেন। এতে দেশ দক্ষ প্রকৌশলী হারাচ্ছে, যদিও একজন প্রকৌশলী তৈরি করতে সরকারের দীর্ঘ সময় ও বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়।
তিনি বলেন, উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ ও উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরির সময় সম্ভাব্যতা, রক্ষণাবেক্ষণ, পরিবেশগত প্রভাব এবং ভবিষ্যৎ প্রয়োজন বিবেচনায় রেখে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে হবে।
ডিপিপি প্রণয়নের প্রসঙ্গ তুলে মীর শাহে আলম বলেন, অনেক সময় প্রকৌশলীদের প্রস্তুত করা ডিপিপি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানোর পর এমন ব্যক্তিদের মাধ্যমে সংশোধনের জন্য ফেরত আসে, যাঁরা প্রকৌশল পেশার সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। ফলে প্রকৌশলগত বাস্তবতা যথাযথভাবে মূল্যায়িত হয় না। এ কারণে পরিকল্পনা কমিশনে প্রকৌশলীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, প্রকৌশলীদের অসংখ্য সাফল্যের তুলনায় ব্যর্থতার ঘটনাই বেশি আলোচিত হয়। অথচ দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রকৌশলীদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে।
স্থপতিদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ভবনের নকশা তৈরির সময় প্রাকৃতিক আলো ও বায়ু চলাচলের বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া উচিত। এতে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব ও স্বাস্থ্যসম্মত ভবন নির্মাণ সম্ভব হবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (ডুয়েট) উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইকবাল বলেন, উন্নয়ন প্রকল্পে স্বল্পমেয়াদি চিন্তার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। একটি প্রকল্প শুধু নির্মাণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর স্থায়িত্ব, রক্ষণাবেক্ষণ, অর্থনৈতিক কার্যকারিতা, পরিবেশগত প্রভাব এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রয়োজনও বিবেচনায় নিতে হবে।
তিনি বলেন, আইইবি ও ডুয়েটের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ ধরনের আয়োজন গবেষণা, জ্ঞান বিনিময় এবং জাতীয় উন্নয়নে কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে শিল্প ও একাডেমিয়ার মধ্যে আরও শক্তিশালী সমন্বয় গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
স্বাগত বক্তব্যে আইইবির সম্মানী সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী মো. সাব্বির মোস্তফা খান বলেন, দেশের অধিকাংশ ভবন এখনও আধুনিক ভূমিকম্প-সহনশীল মানদণ্ড অনুযায়ী নির্মিত নয়।
বাংলাদেশ ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল হওয়ায় ভবিষ্যতের অবকাঠামো নির্মাণে ভূমিকম্প-সহনশীল প্রযুক্তিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে জাপানের অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তি অনুসরণের পরামর্শ দেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, বড় কেন্দ্রীয় পানি সরবরাহ ব্যবস্থার পাশাপাশি স্থানীয় চাহিদাভিত্তিক ছোট পরিসরের পানি সরবরাহ ব্যবস্থাও গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতের যানবাহনের চাপ ও নগরায়ণ বিবেচনায় রেখে নতুন সড়ক নির্মাণের ক্ষেত্রে ন্যূনতম চার লেনের পরিকল্পনা নেওয়া উচিত। এতে ভবিষ্যতে বারবার সড়ক প্রশস্ত করার প্রয়োজন কমবে এবং সরকারি অর্থের সাশ্রয় হবে।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) নির্বাহী প্রকৌশলী ও আইইবির পুরকৌশল বিভাগের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম (খোকা)।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন আইইবির সভাপতি ও রাজউকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোহাম্মদ রিয়াজুল ইসলাম (রিজু) এবং ডুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী মো. আবু তায়েব।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন আইইবির পুরকৌশল বিভাগের ভাইস-চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. আয়নুল কবির। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বিভাগের সম্পাদক প্রকৌশলী নেসার উদ্দিন।
এ ছাড়া আইইবির কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের সদস্য, বিভিন্ন প্রকৌশল বিভাগের নেতৃবৃন্দ, প্রকৌশল চ্যাপ্টারের প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলীরা অনুষ্ঠানে অংশ নেন।