নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ বিকাল ০৩:৫৮:১৪
চুরির নাটক থেকে ধর্ষণের মামলা টুঙ্গিপাড়ায় কিশোরীর সন্তান প্রসব ও আসল পিতা নিয়ে ঘনীভূত রহস্য
তদন্তে জানা গেছে, গত বছরের ৫ ডিসেম্বর সকালে কিশোরীর নানা ইউনুস বেপারী তাঁর ভায়রা মশিউল ইসলাম সোহাগের কাছে অভিযোগ করেন, ঘর থেকে ভাঙারি তামা ও পিতল চুরি হয়েছে। চোর হিসেবে তিনি প্রতিবেশী সাগর শেখের (২১) নাম উল্লেখ করেন। তবে দুপুর গড়াতেই চুরির অভিযোগ পাল্টে যায় এবং সাগরের বিরুদ্ধে নাতনিকে ধর্ষণের অভিযোগ তোলেন ইউনুস।
মশিউল ইসলাম সোহাগ বলেন, ‘ইউনুস প্রথমে চুরির কথা বললেও পরে একেক সময় একেক কথা বলতে থাকেন। বিকেলের দিকে হঠাৎ ধর্ষণের গল্প সাজানো হয়।’
গত ৭ ডিসেম্বর টুঙ্গিপাড়া থানায় দায়ের করা মামলায় (মামলা নং ৫) অভিযোগ করা হয়, ৫ ডিসেম্বর রাতে সাগর শেখ টিনের বেড়া কেটে ঘরে ঢুকে কিশোরীকে ধর্ষণ করেন। অথচ ৯ ডিসেম্বর করা ডাক্তারি পরীক্ষায় চিকিৎসকরা নিশ্চিত করেন, কিশোরী তখন ২৪ সপ্তাহের (৬ মাস) অন্তঃসত্ত্বা। মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা হওয়া চিকিৎসাবিজ্ঞানে অসম্ভব। এতে স্পষ্ট হয় যে, কিশোরী আগে থেকেই অন্তঃসত্ত্বা ছিল।
স্থানীয় সূত্র ও স্বজনদের দাবি, ওই কিশোরী গত ছয় মাস ধরে তার নানার বাড়িতেই থাকছিল। সেখানে নানা ও নাতনি একই বিছানায় ও একই লেপের নিচে ঘুমানোর তথ্যও উঠে এসেছে। সাগর শেখের পরিবারের দাবি, নানা-নাতনির এই ‘অস্বাভাবিক’ ঘনিষ্ঠতা ধামাচাপা দিতেই সাগরকে বলির পাঁঠা বানানো হয়েছে। সাংবাদিকরা এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে ইউনুস বেপারী চড়াও হন এবং কিশোরীর মাকে সরিয়ে নেন।
মামলা করার মাত্র পাঁচ দিন পর তড়িঘড়ি করে কিশোরীকে তার খালাতো ভাই রাকিবের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয়। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি রাতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সন্তান প্রসবের সময় হাসপাতালের নথিতে স্বামীর নাম লেখা হয় ‘জাকির’। এই জাকিরের পরিচয় দিতে পারেনি পরিবার। আবার বিয়ের আড়াই মাসের মাথায় পূর্ণাঙ্গ সন্তান প্রসব করায় রাকিবের পিতৃত্বের দাবিও প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।
অভিযোগ উঠেছে, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি একটি সালিশে ৬০ হাজার টাকা ও ২ শতাংশ জমির বিনিময়ে মামলা তুলে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন ইউনুস বেপারী। এদিকে সন্তান প্রসবের পরদিনই (২৫ ফেব্রুয়ারি) ভোরে নবজাতককে নিয়ে হাসপাতাল থেকে পালিয়ে যান কিশোরী ও তার মা।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, নবজাতকটিকে বিক্রি করার উদ্দেশ্যে তারা আত্মগোপন করেছেন। এ বিষয়ে ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য রুঙ্গু খান বলেন, ‘এলাকায় এমন ঘটনা ঘটেছে বলে আমার জানা নেই। কোনো পক্ষই আমাকে কিছু জানায়নি।’
সাগর শেখের পরিবার পুলিশের বিরুদ্ধে তড়িঘড়ি করে ব্যবস্থা নেওয়ার অভিযোগ তুলেছে। তবে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা (আইও) জানান, মামলাটি স্পর্শকাতর। তিনি বলেন, ‘আমরা ডিএনএ পরীক্ষার জন্য নমুনা সিআইডিতে পাঠিয়েছি। কিশোরী আদালতে জবানবন্দিতে রাকিবের সঙ্গে সম্পর্কের কথা বলেছে। প্রয়োজনে রাকিব ও তার নানার ডিএনএ পরীক্ষা করা হবে। আইনি প্রক্রিয়ায় আপস করার কোনো সুযোগ নেই।’
১৩ বছরের এক কিশোরীর ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চয়তার মুখে। একদিকে সাগর শেখ কারাগারে ন্যায়বিচারের অপেক্ষায়, অন্যদিকে আসল অপরাধী এখনো আড়ালে। এই রহস্যের জট খুলতে এখন ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্টের দিকেই তাকিয়ে সবাই।