নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৫ জুলাই ২০২৬ বিকাল ০৪:২৫:০৯
আউয়ালের ‘চাটুকারিতা ক্যারিয়ার’: ২৬ জনকে ডিঙিয়ে প্রধান প্রকৌশলী!
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে যেন নিয়ম-কানুনের বদলে ব্যক্তিগত প্রভাবই হয়ে উঠেছে পদায়ন ও পদোন্নতির নিয়ামক। অধিদপ্তরের বর্তমান প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্বপ্রাপ্ত মো. আব্দুল আউয়ালের অবিশ্বাস্য উত্থান ঘিরে উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। অভিযোগ রয়েছে, ২৬ জন জ্যেষ্ঠ ও যোগ্য কর্মকর্তাকে ডিঙিয়ে তিনি অধিদপ্তরের সর্বোচ্চ পদে রুটিন দায়িত্ব পেয়েছেন। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে গুরুত্বপূর্ণ পদে তার এই ‘উল্কাগতি’ নিয়ে বিস্মিত অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
অধিদপ্তরের নথি অনুযায়ী, আব্দুল আউয়াল ১৯৯৮ সালের ৫ মার্চ একটি প্রকল্পে যোগদান করেন। ২০০৬ সালের ১ জুলাই প্রকল্প থেকে রাজস্ব খাতে আত্মীকৃত হওয়ার পর ২০১৩ সালে সরকারি কর্মকমিশনের মাধ্যমে তার চাকরি নিয়মিত হয়। জ্যেষ্ঠতার হিসাবে তার আগে অন্তত ২৬ জন কর্মকর্তা থাকলেও গত বছরের ১৭ নভেম্বর তাদের পাশ কাটিয়ে তাকে প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্ব দেওয়া হয়। নিয়মিতকরণের তারিখ ও জ্যেষ্ঠতা বিবেচনায় এমন সিদ্ধান্ত অধিদপ্তরের ইতিহাসে নজিরবিহীন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহলের ঘনিষ্ঠতা ব্যবহার করে আব্দুল আউয়াল একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পেয়েছেন। তৎকালীন স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের সহযোগিতায় নরসিংদী থেকে নিজ জেলা ময়মনসিংহে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে বদলি হন তিনি। পরবর্তী সময়ে সিলেট সার্কেলে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্ব পালন করেও বিশেষ প্রভাব খাটিয়ে আবারও ময়মনসিংহ সার্কেলে ফিরে আসেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সরকারি কর্মকর্তাদের নিজ জেলায় দীর্ঘদিন পদায়নের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ থাকলেও তার ক্ষেত্রে তা কার্যকর হয়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও আব্দুল আউয়ালের প্রভাব কমেনি। বরং স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মো. রেজাউল মাকছুদ জাহেদীর সঙ্গে একই জেলার পরিচয়কে কাজে লাগিয়ে তিনি আবারও ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন। অভিযোগ রয়েছে, তার প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্ব পাওয়ার প্রক্রিয়ায় প্রশাসনিক প্রভাব ও আর্থিক লেনদেন ভূমিকা রেখেছে।
আব্দুল আউয়ালের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই টেন্ডার বাণিজ্য, কমিশন গ্রহণ, ঠিকাদারি ব্যবসায় পরোক্ষ সম্পৃক্ততা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কথিত এক ‘ভাতিজা’কে সামনে রেখে তিনি ঠিকাদারি ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন। তার প্রভাব ব্যবহার করে হুমায়ুন কবীর নামে এক ব্যক্তি ‘নূর ট্রেডার্স’সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ময়মনসিংহের ফুলপুরসহ বিভিন্ন উপজেলায় কাজ করছেন বলে সূত্রের দাবি। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, কাগজে ঠিকাদার অন্য কেউ হলেও দরপত্র, কাজের অনুমোদন ও বিল উত্তোলনের পুরো প্রক্রিয়ায় আব্দুল আউয়ালের প্রভাব রয়েছে।
নরসিংদীতে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে প্রায় ১ কোটি ২৭ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে তদন্ত কমিটি গঠনের কথাও জানা যায়। এ ছাড়া এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়নে বাস্তবায়িত নরসিংদী পৌরসভার সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট ও পাইপলাইন নির্মাণ প্রকল্পে অনিয়ম ও অদক্ষতার অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ কাজ শেষ করা যায়নি। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর বিশেষ টিম গঠন করে অসম্পূর্ণ কাজ শেষ করতে হয়।
নরসিংদী ও কিশোরগঞ্জে দায়িত্ব পালনকালে দরপত্রের কাগজপত্রে কারসাজি ও ক্রয় প্রক্রিয়ায় সরাসরি হস্তক্ষেপের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এসব বিষয়ে অডিট আপত্তি এবং ত্রিপক্ষীয় সভায় আলোচনা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
২০১৭ সালে সিলেট সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্ব পালনকালে ‘কুলাউড়া ও গোলাপগঞ্জ পৌরসভার পানি সরবরাহ ও পরিবেশগত স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়ন’ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হন আব্দুল আউয়াল। অভিযোগ রয়েছে, তার অদক্ষতা ও অদূরদর্শিতার কারণে প্রকল্পটির কার্যক্রম শুরুতেই স্থবির হয়ে পড়ে। পরামর্শক নিয়োগেও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
ময়মনসিংহে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর প্রভাব বিস্তার, বদলির ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়, স্বজনপ্রীতি ও প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ ওঠে। বিভিন্ন উপজেলায় কর্মরত মেকানিকদের বদলির ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় এবং পেনশন ও পিআরএলের কাগজপত্র অনুমোদনের ক্ষেত্রে ১ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
তার দায়িত্বকালে ময়মনসিংহের বিভিন্ন পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ময়মনসিংহ সদর উপজেলার গ্রামীণ পানি সরবরাহ উন্নয়ন প্রকল্পে প্রায় শত কোটি টাকা ব্যয় হলেও কাজের গুণগতমান ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়ন নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। ত্রিশাল উপজেলার স্যানিটেশন সুবিধা সম্প্রসারণ প্রকল্পেও প্রায় ১৮ কোটি টাকা ব্যয়ের বিপরীতে কাজের অগ্রগতি ও মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
গৌরীপুর পৌরসভায় পানি সরবরাহের দুটি প্রকল্পে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা ব্যয় হলেও শহরবাসীর পানির সংকট কাটেনি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। প্রকল্পের প্রথম ধাপে ২ কোটি ৭ লাখ ১৩ হাজার ৫৯০ টাকা এবং দ্বিতীয় ধাপে ২ কোটি ৮৬ লাখ ৭ হাজার ৯২০ টাকা ব্যয় করা হয়। অথচ এত বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও পানি সরবরাহ ব্যবস্থা কার্যকর না হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে প্রকল্পের বাস্তবতা ও অর্থ ব্যয় নিয়ে।
সম্প্রতি নোয়াখালীতে প্রায় ৫ কোটি ৫৫ লাখ টাকা মূল্যের নির্মাণসামগ্রী মাত্র ১৮ লাখ ৮৫ হাজার টাকায় বিক্রির অভিযোগও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, ডানিডা অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন একটি প্রকল্পের বিপুল পরিমাণ পাইপ ও নির্মাণসামগ্রী গোপনীয়ভাবে নিলামে বিক্রি করা হয়। অধিকাংশ ঠিকাদার নিলামের খবর না জানায় প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের সুযোগ তৈরি হয়নি। পরে মেসার্স শাহনাজ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে এসব মালামাল নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করা হয় বলে অভিযোগ।
নোয়াখালীর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাইফুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তিনি নিজে কোনো নিলাম দেননি এবং নিলাম প্রক্রিয়া ঢাকা থেকে পরিচালিত হয়েছে। এই বক্তব্যের পর নিলাম প্রক্রিয়ার প্রকৃত নিয়ন্ত্রক কারা ছিলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, পছন্দের জুনিয়র কর্মকর্তাদের নিয়মবহির্ভূতভাবে নির্বাহী প্রকৌশলী ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
আব্দুল আউয়ালের বিরুদ্ধে বেতন নির্ধারণ ও গ্রেড সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগও উঠেছে। ১৯৯৮ সালে প্রকল্পে যোগদানের পর ২০০৬ সালে রাজস্ব খাতে আসার আগেই বিভিন্ন সময়ে উচ্চতর গ্রেডে বেতন উত্তোলনের বিষয়টি যাচাইয়ের দাবি উঠেছে। অভিযোগকারীদের মতে, তার বেতন নির্ধারণ, জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতির পুরো প্রক্রিয়া নিরপেক্ষভাবে অডিট করা প্রয়োজন।
অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, একজন জুনিয়র কর্মকর্তাকে নিয়মিত জ্যেষ্ঠতা ও যোগ্যতার তালিকা পাশ কাটিয়ে শীর্ষ পদে বসানো হলে তা শুধু ব্যক্তিগত সুবিধার বিষয় নয়; এর প্রভাব পড়ে পুরো প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর। তাদের অভিযোগ, আব্দুল আউয়ালের প্রভাব বিস্তারের কারণে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে।
অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়া, জ্যেষ্ঠতা তালিকা, গোয়েন্দা মূল্যায়ন প্রতিবেদন, নরসিংদীর প্রকল্প, ময়মনসিংহের পানি ও স্যানিটেশন প্রকল্প, নোয়াখালীর নিলাম এবং সাম্প্রতিক পদোন্নতি প্রক্রিয়া তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।