ছুরি-চাপাতি হাতে মহড়া, হত্যা-চাঁদাবাজি-মাদক-ছিনতাইয়ে জড়াচ্ছে কিশোররা; পেছনে প্রভাবশালী পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ
রুহুল আমিন কিবরিয়া, বগুড়া জেলা প্রতিনিধি
প্রকাশ : ৮ অক্টোবর ২০২৬ দুপুর ১২:৩৭:২৮
বগুড়ায় কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য, পাঁচ মাসে ৩৯ খুন
বগুড়ার শহর ও আশপাশের এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য দিন দিন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। ছুরি-চাপাতি হাতে মহড়া, বেপরোয়া মোটরসাইকেল শোডাউন, মাদক কারবার, ছিনতাই, চাঁদাবাজি থেকে শুরু করে হত্যাকাণ্ড—অপরাধের প্রায় সব ক্ষেত্রেই জড়িয়ে পড়ছে অপ্রাপ্তবয়স্করা। আর তাদের আড়ালে সক্রিয় রয়েছে বড় অপরাধচক্র ও প্রভাবশালী পৃষ্ঠপোষকরা—এমন অভিযোগও রয়েছে।
পুলিশের তথ্য বলছে, ২০২১ সাল থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত সাড়ে পাঁচ বছরে বগুড়ায় ৫৩০টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে শুধু চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসেই প্রাণ গেছে ৩৯ জনের। একই সময়ে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে গুরুতর আহত হয়েছেন অন্তত ১০০ জন।
গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, বগুড়া শহরে সক্রিয় রয়েছে অন্তত ১৫টি কিশোর গ্যাং। এসব গ্যাংয়ের নেতৃত্বে রয়েছেন ৪০ থেকে ৫০ জন চিহ্নিত ব্যক্তি। হত্যা, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি ও ছিনতাইসহ নানা অপরাধে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, জলেশ্বরীতলা, জেলা শিল্পকলা একাডেমি, পুরোনো শিল্পকলা একাডেমি, মহিলা ক্লাব, মুক্তির ফুলবাড়ী, সেউজগাড়ী রেল কলোনি বধ্যভূমি, সুবিল ব্রিজ, ফুলবাড়ী নদীর ঘাট, উপশহর, কলোনি, মালতীনগর স্টাফ কোয়ার্টার ও রহমাননগর এলাকায় এসব গ্যাংয়ের তৎপরতা বেশি।
অপ্রাপ্তবয়স্কদের আইনি সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে কিশোরদের অপরাধে ব্যবহার করছে মূল অপরাধীরা—এমন অভিযোগও রয়েছে। কোনো সদস্য গ্রেপ্তার হলে জামিনের ব্যবস্থা থেকে শুরু করে কারাগারে বিশেষ সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রেও প্রভাবশালীদের ভূমিকার অভিযোগ উঠেছে। ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়েও দ্রুত আবার অপরাধে ফিরছে অনেকে।
একের পর এক সহিংস ঘটনা
গত মে মাসে নিজ বাসার পার্কিং এলাকায় ছুরিকাঘাতের শিকার হন ব্যবসায়ী ফারান তানভীর। এর আগে ১৭ এপ্রিল শাকপালা পার্কে সংঘর্ষের জেরে নিহত হন স্কুলশিক্ষার্থী সামিউল সিয়াম।
২০২৫ সালে কালীতলা মোড়ে দায়িত্ব পালনকালে ফুলবাড়ী ফাঁড়ির এসআই আব্দুর রহমান ও এএসআই আহম্মদ আলীকে কুপিয়ে গুরুতর আহত করার অভিযোগ ওঠে গ্যাং সদস্যদের বিরুদ্ধে। ২০২০ সালে জলেশ্বরীতলায় প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয় রশিদুল ইসলামকে। এসব ঘটনায় জড়িতদের মধ্যেও কিশোর ছিল বলে জানা যায়।
অভিযানে মিলছে অস্ত্র, মাদক
কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে বগুড়ায় নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে জেলা পুলিশ ও এসআরবি-১২। উদ্ধার হচ্ছে দেশীয় অস্ত্র ও মাদক; গ্রেপ্তারও হচ্ছে গ্যাং সদস্যরা।
চলতি বছরের আগস্টে শাজাহানপুরের শাবরুল এলাকায় অভিযান চালিয়ে ‘জালাল গ্রুপের’ ১১ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তাদের কাছ থেকে চাপাতি, বার্মিজ চাকু, বল্লম, ইয়াবা ও মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়। গ্রেপ্তারদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠের বয়স ছিল মাত্র ১৪ বছর।
চলতি মাসে দুটি মোটরসাইকেল শোডাউন ঘিরেও এলাকায় নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
এ ছাড়া চলতি বছর বগুড়া মহানগরীর নূরানী মোড় এলাকা থেকে ধারালো চাকুসহ আউলিয়া (১৯) ও রাহাত (১৯) নামে দুই যুবককে গ্রেপ্তার করে র্যাব।
২০২৪ সালে গাবতলীর পীরগাছায় পিকনিকের বাসে তল্লাশি চালিয়ে বার্মিজ চাকুসহ নয় কিশোরকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০২৫ সালের জুনে বগুড়া শহরের বৃন্দাবন ধুমারগড় এলাকা থেকে কিশোর গ্যাং লিডার ও চিহ্নিত ছিনতাইকারী সিফাতকে (১৯) গ্রেপ্তার করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তোশকের নিচ থেকে একটি বড় ধারালো ছোরা উদ্ধার করা হয়।
পেছনে কারা?
বিশেষজ্ঞদের মতে, পারিবারিক তদারকির অভাব, সামাজিক অবক্ষয়, আইনের যথাযথ প্রয়োগের ঘাটতি এবং বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে অপরাধীদের পেছনে প্রভাবশালী মহলের পৃষ্ঠপোষকতা থাকলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
বগুড়া জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) রাইয়ান আলম বলেন, কিশোর অপরাধ দমনে দেশজুড়ে জিরো টলারেন্স নীতি নেওয়া হয়েছে। গ্যাংকে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের তালিকা করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সুশাসনের জন্য প্রচারাভিযান—সুপ্রের সম্পাদক কেজিএম ফারুক বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনিয়মিত শিক্ষার্থীদের তথ্য শিক্ষা অফিসে পাঠানো হলে ঝুঁকিপূর্ণ কিশোরদের শনাক্ত করা সহজ হবে। এতে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা কমানো সম্ভব।
পুলিশ জানিয়েছে, অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি ধারাবাহিক অভিযান চলছে।
গত ৫ অক্টোবর জেলা প্রশাসকের সভাকক্ষে জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কমিউনিটি পুলিশের সভায়ও কিশোর অপরাধসহ বিভিন্ন অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কমিউনিটি পুলিশিং জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বগুড়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আতোয়ার রহমান বলেন, বিভিন্ন অপরাধে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। কোনো অপরাধীকেই ছাড় দেওয়া হবে না।