মৌলভীবাজার প্রতিনিধি
প্রকাশ : ১৪ জুলাই ২০২৬ বিকাল ০৫:২৭:০৬
বন্যপ্রাণীর অকৃত্রিম বন্ধু সিতেশ রঞ্জন দেব আর নেই
সিতেশ রঞ্জন দেবের মৃত্যুতে মৌলভীবাজারসহ দেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ অঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে আহত, অসুস্থ ও বিপন্ন বন্যপ্রাণীর চিকিৎসা, পরিচর্যা এবং পুনর্বাসনে নিরলস কাজ করে তিনি মানুষের কাছে হয়ে উঠেছিলেন নির্বাক প্রাণীর শেষ আশ্রয়স্থল।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, কয়েকদিন ধরে তিনি শ্রীমঙ্গলের রামকৃষ্ণ মিশন রোডস্থ নিজ বাসভবনে অসুস্থ অবস্থায় চিকিৎসাধীন ছিলেন। মঙ্গলবার সকালে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে শ্রীমঙ্গল পলি ক্লিনিকে নেওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
হাসপাতাল থেকে তাঁর মরদেহ শ্রীমঙ্গলের রামকৃষ্ণ মিশন রোডস্থ বাসভবনে নিয়ে আসা হলে শত শত মানুষ শেষ শ্রদ্ধা জানাতে ভিড় করেন। পরে তাঁর মরদেহ নেওয়া হয় বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনে, যেখানে বর্তমানে চিকিৎসাধীন আহত প্রাণীদের সামনে তাঁকে শেষবারের মতো রাখা হয়। সেখানে অসংখ্য মানুষ তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানান। বিকেল ৩টায় মরদেহ নেওয়া হয় শ্রীমঙ্গলের নওয়াগা এলাকার পৈতৃক বাড়িতে। সেখানেও শত শত মানুষের উপস্থিতিতে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে পারিবারিক শ্মশানঘাটে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।
মৃত্যুকালে তিনি তিন ছেলে, চার পুত্রবধূ, চার কন্যা, নাতি-নাতনিসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী, আত্মীয়-স্বজন ও শুভানুধ্যায়ী রেখে গেছেন।
তাঁর মৃত্যুতে মৌলভীবাজার-৪ (শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। শোকবার্তায় তিনি মরহুমের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমান মরদেহে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এছাড়া শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রেসক্লাব, শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাব, শ্রীমঙ্গল চন্দ্রনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণকর্মী এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতারা পৃথক শোকবার্তায় বলেন, তাঁর মৃত্যু দেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আন্দোলনের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ, শ্রীমঙ্গল শাখার সভাপতি ডা. হরিপদ রায় বলেন, “সিতেশ বাবুর মতো মানুষ যুগে যুগে জন্ম নেন না। তিনি নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন নির্বাক প্রাণীদের জন্য। তাঁর চলে যাওয়া শুধু শ্রীমঙ্গলের নয়, পুরো দেশের অপূরণীয় ক্ষতি।”
শ্রীমঙ্গল প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির নেতা জহর তরফদার ও একরামুল কবির বলেন, তাঁর মৃত্যুতে আজ যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন। যে মানুষটির স্নেহ-ভালোবাসায় প্রতিদিন মুখর থাকত উদ্ধার করা অসংখ্য পশু-পাখি, সেই অভিভাবককে হারিয়ে যেন তারাও নিস্তেজ হয়ে পড়েছে।
সিতেশ রঞ্জন দেবের প্রাণীর প্রতি ভালোবাসার শুরু পারিবারিক পরিবেশ থেকেই। তাঁর বাবা স্বাধীনতারও আগে বিভিন্ন বন্যপ্রাণী উদ্ধার করে বাড়িতে লালন-পালন করতেন। সেখান থেকেই প্রাণীর প্রতি তাঁর গভীর মমত্ববোধ গড়ে ওঠে।
পরবর্তীকালে বন উজাড়, আবাসস্থল ধ্বংস এবং মানুষের নিষ্ঠুরতায় বিপন্ন বন্যপ্রাণীর দুর্দশা তাঁকে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে আত্মনিয়োগে অনুপ্রাণিত করে। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি আহত, অসুস্থ ও বিপদগ্রস্ত প্রাণী উদ্ধার, চিকিৎসা এবং সুস্থ করে প্রকৃতিতে ফিরিয়ে দেওয়ার কাজ করে গেছেন।
১৯৯১ সালের জানুয়ারিতে পাত্রখলা চা বাগানে বন্য শুকর তাড়াতে গিয়ে ভারতীয় একটি ভাল্লুকের আক্রমণের শিকার হন তিনি। ওই হামলায় একটি চোখ, নাক, গালের বড় অংশ, মুখের একাংশ ও কয়েকটি দাঁত হারান। দীর্ঘ চিকিৎসা এবং ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে একাধিক প্লাস্টিক সার্জারির পর তিনি নতুন জীবন ফিরে পান।
নিজেই বলতেন, “এটি আমার দ্বিতীয় জীবন।” সেই দ্বিতীয় জীবন তিনি উৎসর্গ করেছিলেন বন্যপ্রাণীর সেবায়।
গত চার দশকে তিনি হাজার হাজার বন্যপ্রাণী উদ্ধার করেছেন। বিদ্যুৎস্পৃষ্ট লজ্জাবতী বানর, অজগর, মেছোবাঘ, গন্ধগোকুল, চশমা পরা হনুমান, বন্য শুকর, ঈগল, তক্ষক এবং বিভিন্ন প্রজাতির সাপসহ অসংখ্য প্রাণী তাঁর সেবায় নতুন জীবন পেয়েছে।
শ্রীমঙ্গলে তাঁর বাড়ি একসময় মানুষের কাছে ‘মিনি চিড়িয়াখানা’ নামে পরিচিতি পেলেও সেটি ছিল মূলত আহত ও অসহায় বন্যপ্রাণীর একটি সেবাকেন্দ্র।
প্রাণীদের খাবার, চিকিৎসা ও পরিচর্যার ব্যয় মেটাতে তাঁকে নিজের মাছের খামারের আয়ের ওপর নির্ভর করতে হতো। আর্থিক সংকট সত্ত্বেও তিনি কখনো প্রাণীদের সেবা বন্ধ করেননি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমানের পরামর্শে ২০১১ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন। এরপর তাঁর কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হয়। চিকিৎসা শেষে অসংখ্য বন্যপ্রাণী লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক আবাসস্থলে অবমুক্ত করা হয়।
বন্যপ্রাণীর খাদ্য নিশ্চিত করতে তিনি রাস্তার পাশে, পাহাড়ি ছড়ার ধারে এবং বিভিন্ন বনাঞ্চলে হাজার হাজার ফলজ ও বনজ গাছ রোপণ করেন। পাশাপাশি বনজ বাস্তুতন্ত্র রক্ষায় পাহাড়ি ছড়ায় কাঁকড়া, শামুক ও বিভিন্ন জলজ প্রাণীও অবমুক্ত করতেন।
সিতেশ রঞ্জন দেবের মৃত্যুতে শুধু একটি পরিবার নয়, শোকাহত সমগ্র প্রকৃতিপ্রেমী সমাজ। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে তাঁর অবদান দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর জীবন ও কর্ম ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় অনুপ্রাণিত করবে।