আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ রাত ০৯:৩৮:২৩
ইরানের স্কুল ও ক্রীড়া কেন্দ্রে মার্কিন হামলা যুদ্ধাপরাধের শামিল : জাতিসংঘ
ইরান যুদ্ধে গত ফেব্রুয়ারিতে দেশটির মিনাব শহরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও লামের্দ শহরের একটি ক্রীড়া কেন্দ্রে মার্কিন বাহিনীর হামলায় দেড় শতাধিক মানুষের প্রাণহানির বিষয়টিতে বিশ্বাস করার মতো যুক্তসঙ্গত কারণ রয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। ওই ঘটনা তদন্ত করে ইরান বিষয়ক জাতিসংঘের একটি সত্যানুসন্ধানী মিশন জানিয়েছে, এ ঘটনাগুলো যুদ্ধাপরাধের শামিল।
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সরকারবিরোধী আন্দোলনের ওপর প্রাণঘাতী দমন-পীড়ন চালিয়ে ইরানি কর্তৃপক্ষও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায় এড়াতে পারে না। খবর দ্য গার্ডিয়ানের।
জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদে পেশ করার জন্য প্রস্তুত করা এই স্বাধীন আন্তর্জাতিক সত্যানুসন্ধানী মিশনের প্রতিবেদনে, গত ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধে মার্কিন বাহিনীর আচরণ এবং আগের বছরের ডিসেম্বরের শেষদিকে দেশজুড়ে শুরু হওয়া অসন্তোষ মোকাবিলায় ইরানি সরকারের পদক্ষেপ পর্যালোচনা করা হয়েছে।
মার্কিন কর্মকর্তারা এর আগে বলেছিলেন, সশস্ত্র সংঘাতের আইন মেনেই তাদের সামরিক অভিযান পরিচালিত হয়, আর অন্যদিকে ইরানও সুসংগঠিতভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ধারাবাহিকভাবে প্রত্যাখ্যান করে আসছে।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, মিনাব শহরের শাজারাহ তাইয়্যেবা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলার পেছনে মার্কিন বাহিনী দায়ী ছিল—এমনটি বিশ্বাস করার যুক্তিসঙ্গত কারণ তারা পেয়েছেন। ইরানি কর্মকর্তাদের মতে, ওই হামলায় আনুমানিক ১২০ জন শিশু শিক্ষার্থীসহ ১৫০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়।
জাতিসংঘ মিশন সিদ্ধান্ত টেনে বলেছে যে, এটি ছিল বেসামরিক মানুষের মৃত্যু ও অবকাঠামোর ক্ষতিসাধনকারী একটি নির্বিচার হামলা, যা আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে যুদ্ধাপরাধের শামিল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই স্থানে ইরানের একজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কমান্ডার উপস্থিত আছেন—এমন গোয়েন্দা তথ্যের ওপর নির্ভর করেছিল যুক্তরাষ্ট্র; তবে হামলা চালানোর আগে তারা সেই তথ্য যথাযথভাবে যাচাই করতে ব্যর্থ হয়। তদন্তকারীরা জানান, লক্ষ্যবস্তুর তথ্য হালনাগাদ না করা এবং ভবনটি কোনো সামরিক কেন্দ্র কি না তা নিশ্চিত না হওয়া নিছক অবহেলার চেয়েও বেশি কিছু।
প্রতিবেদনে মিশন বলেছে, বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার চরম ঝুঁকি এবং সেরকমটা ঘটার সম্ভাবনা সম্পর্কে সচেতন থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র বেপরোয়াভাবে বিদ্যালয়ের ভবনটিতে সরাসরি বিমান হামলা চালায়।
গত জুনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘটনাটি নিয়ে একটি তদন্তের কথা উল্লেখ করে দাবি করেছিলেন যে, ফেব্রুয়ারিতে ইরানে মেয়েদের একটি স্কুলে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে হামলা চালায়নি। এ বিষয়ে রয়টার্স খবর প্রকাশ করে বলেছিল যে, প্রাথমিক এক অভ্যন্তরীণ মার্কিন সামরিক তদন্তে দেখা গেছে দক্ষিণ ইরানের মিনাবে ঘটা প্রাণঘাতী ওই হামলায় ‘সম্ভবত’ মার্কিন বাহিনীই দায়ী ছিল।
পেন্টাগন পরে তদন্ত প্রক্রিয়াটি উচ্চপর্যায়ে পাঠালেও এখন পর্যন্ত এর কোনো প্রাথমিক তথ্য প্রকাশ করেনি।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, মেয়েদের স্কুলটি স্পষ্টভাবে শনাক্তযোগ্য একটি বেসামরিক প্রতিষ্ঠান ছিল এবং এটি কোনো সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছিল এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, ইরানের লামের্দ শহরের একটি স্পোর্টস সেন্টার বা ক্রীড়া কেন্দ্রে চালানো হামলার ক্ষেত্রেও বিশেষজ্ঞরা একই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, এই হামলায় কাছের আবাসিক ভবন ও একটি স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ২২ জন বেসামরিক লোক নিহত ও আহত হন। এতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে এটি একটি নির্বিচার হামলা ছিল এবং সে কারণে এটি যুদ্ধাপরাধ।
তবে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) মার্চ মাসে এক বিবৃতিতে জানিয়েছিল, সেদিন মার্কিন বাহিনী লামের্দ শহরে কোনো হামলা চালায়নি।
জাতিসংঘের মিশন তাদের তদন্তে আরও পেয়েছে যে, গত বছরের ডিসেম্বরের শেষদিকে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভের সময় সাধারণ নাগরিকদের ওপর ব্যাপক ও পদ্ধতিগতভাবে হামলা চালায় ইরানি কর্তৃপক্ষ। এতে ছিল বেআইনি হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন, নির্বিচারে আটক, গুম এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর চরম বিধিনিষেধ আরোপের মতো ঘটনার প্রমাণ।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, ১৯৭৯ সালের বিপ্লবে শিয়া ইসলামি আলেমরা ক্ষমতায় আসার পর সবচেয়ে বড় এই দমন-পীড়নের সময় নিহতদের মধ্যে সাধারণ পথচারীরাও ছিলেন। অন্যদিকে, তেহরান এর জন্য নির্বাসিত বিরোধী দল এবং বিদেশি শত্রু অর্থাৎ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল-সমর্থিত ‘সন্ত্রাসী ও দাঙ্গাবাজদের’ দায়ী করেছে।
জাতিসংঘের তদন্ত সংস্থাটি জানিয়েছে, ইরানে সরকার বিরোধী বিক্ষোভে সরকারি বাহিনীর দমনপীড়নের বিষয়ে তারা স্বাধীনভাবে মৃতের সংখ্যা যাচাই করতে পারেনি, তবে তারা বিশ্বাস করে যে, নিহতের সংখ্যা সরকারি পরিসংখ্যানের চেয়ে বহু গুণ বেশি। সরকারি হিসাবে বলা হয়েছিল ৩ হাজার ৩৮ জন নিহত ও ২৫ হাজার মানুষ আহত হয়েছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ড, ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন করা এবং মৃত্যুদণ্ডের রায় ব্যবহারসহ এই বিক্ষোভ মোকাবিলায় সরকারের গ্রহণ করা পদক্ষেপগুলো আগের যেকোনো সময়ের সরকারের বিরোধিতার ‘মুখ বন্ধে’র ধরনের চেয়ে অনেক বেশি আক্রমণাত্মক ছিল।