ইরান ইন্টারন্যাশনালের বিশ্লেষণ
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৯ আগস্ট ২০২৬ দুপুর ০২:০০:২০
জীবিকা নির্বাহের খরচ চালাতে কবর বিক্রি করছেন ইরানিরা!
ইরানে বেঁচে থাকার পাশাপাশি এখন মারা যাওয়াও সাধারণ মানুষের সাধ্যের বাইরে চলে গেছে। বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রমের পুরো মজুরি দিয়েও মিলছে না একটি কবর। জীবনযাত্রার তীব্র সংকটে পড়ে অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে স্বজন বা নিজেদের জন্য তুলে রাখা কবর বিক্রি করে দিচ্ছে, আবার অনেকে কোনোমতে বিনামূল্যে দাফনের আশায় মৃতদেহ নিয়ে ছুটে যাচ্ছেন প্রত্যন্ত গ্রামে।
রাজধানী তেহরানের বিখ্যাত ‘বেহেশত-ই জোহরা’ কবরস্থানে বর্তমানে তিন স্তরের একটি প্রাইভেট কবরের দাম চাওয়া হচ্ছে ৩ হাজার কোটি রিয়াল, যা প্রায় ১৫ হাজার ডলারের সমান। অথচ ২০২৬ সালে সরকারের বেঁধে দেওয়া মূল্য মাত্র ৩৪৭ কোটি রিয়াল বা ১,৭৪০ ডলার। অর্থাৎ, মূল বাজারে সরকারি হারের চেয়ে সাড়ে আট গুণেরও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে একেকটি কবর।
ইরানের বর্তমান সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ১৬৬ কোটি রিয়ালের মতো, যা ডলারে রূপান্তর করলে দাঁড়ায় মাত্র ৮৩ ডলারে। সেই হিসেবে একজন সাধারণ শ্রমিক ১৫ বছর ধরে এক রিয়ালও খরচ না করে জমানো পুরো টাকা দিয়েও একটি প্রাইভেট কবর কিনতে পারবেন না, এমনকি সরকারি রেটে কিনতে গেলেও তাদের প্রায় ২১ মাসের পুরো বেতন শেষ হয়ে যাবে। এই আকাশচুম্বী মূল্যের দাপট কেবল রাজধানীতেই সীমাবদ্ধ নয়। ইরানের কেরমানশাহের ‘বাগ-ই ফেরদৌস’ কবরস্থানে একেকটি কবরের দাম হাঁকা হচ্ছে ৩ হাজার ৪০০ কোটি রিয়াল, কেরমানে দুই স্তরের প্লট বিক্রি হচ্ছে ২০০০ কোটি রিয়ালে এবং কারাজ ও ইয়াজদে সাধারণ এক টুকরো প্লটের দাম চাওয়া হচ্ছে ১ হাজার কোটি রিয়াল।
অন্যদিকে, মাশহাদের ‘বেহেশত-ই রেজা’য় পারিবারিক সমাধিগুলোর দাম ১৮০০ কোটি রিয়াল পর্যন্ত উঠেছে এবং পবিত্র স্থান ইমাম রেজার মাজারে দাফনের খরচ ১৪০০ কোটি রিয়ালে গিয়ে ঠেকেছে।
তবে শুধু কবরের জায়গা কেনাই শেষ কথা নয়, শেষ বিদায়ের সামগ্রিক আয়োজনও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। মৃতদেহ পরিবহণ, গোসল, কাফনের কাপড়, অ্যাম্বুলেন্স, এপিটাফ, মসজিদ ভাড়া, ফুল এবং কুলখানির আপ্যায়ন মিলিয়ে তেহরানের সরকারি হিসাবেই ১০০ জন অতিথির একটি সাধারণ অনুষ্ঠানে খরচ হয় ১২০ থেকে ১৮০ কোটি রিয়াল। খরচ সামলাতে না পেরে বাধ্য হয়ে অনেক পরিবার চিরাচরিত ৩য় বা ৭ম দিনের আনুষ্ঠানিকতা বাদ দিচ্ছে।
গত চার বছরে রিয়ালের অঙ্কে সরকারি ফি প্রায় চারগুণ বাড়লেও মুদ্রাস্ফীতির কারণে ডলারে এর মান প্রায় একই রয়ে গেছে, কিন্তু মূল সংকট তৈরি করেছে আয়ের মারাত্মক পতন। এক দশক আগে যেখানে ইরানের সর্বনিম্ন মজুরি ছিল ২৩০ ডলারের বেশি, তা এখন নেমে এসেছে মাত্র ৮৩ ডলারে।
সঙ্গে সরকারি কম দাম এবং খোলা বাজারের বিশাল ব্যবধানকে কাজে লাগিয়ে গড়ে উঠেছে দালাল চক্র। পরিস্থিতি সামলাতে কর্তৃপক্ষ প্রতি জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে একটির বেশি কবর কেনায় নিষেধাজ্ঞা জারি করলেও গোপন কেনাবেচা থামেনি। অনেকের কাছে কবরের প্লটটি এখন স্মৃতি বা শেষ ঠিকানার বদলে আর্থিক সম্পদে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে চলতে না পেরে অনেকে জীবিত স্বজন বা নিজের শেষ নিঃশ্বাসের জন্য রাখা জমি বিক্রি করে দিচ্ছেন কেবল সংসারের তাৎক্ষণিক চাহিদা মেটাতে। এমনকি দেনা শোধ করতে না পেরে আদালতের পরোয়ানায় স্বজনদের কবর নিলামে ওঠার মতো ঘটনাও ঘটছে।
শহরের এই চড়া খরচের কারণে মৃতদেহ নিয়ে গ্রামে যাওয়ার এক নতুন প্রবণতা দেখা দিয়েছে, যাকে বলা যায় ‘মৃতদেহের অভিবাসন’। মাশহাদ ও গোরগানের পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোতে শহরের মানুষ গিয়ে ফ্রিতে স্বজনদের দাফন করায় ক্ষুব্ধ হয়ে অনেক গ্রামের বাসিন্দারা গোরস্থানের চারপাশে বেড়া দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
অর্থনৈতিক এই চাপের সঙ্গে যোগ হয়েছে রাজনৈতিক নিপীড়নও; আন্দোলনে নিহত বা মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের লাশ স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া কিংবা দাফনের স্থান জানিয়ে দেওয়ার বিনিময়ে কোটি কোটি রিয়াল দাবি করছে নিরাপত্তা সংস্থাগুলো।
বর্তমান ইরানে মৃত্যু মানে আর শুধুই শোক প্রকাশ নয়, তা রূপ নিয়েছে এক অমানবিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটে, যেখানে জীবিত থাকার তাগিদ কেড়ে নিচ্ছে শান্তিপূর্ণভাবে চিরনিদ্রায় শায়িত হওয়ার অধিকারটুকুও।