নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : ৭ জুলাই ২০২৬ রাত ০৭:১৭:২৫
জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরকে তামাকমুক্ত ঘোষণা
জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় এবং পরোক্ষ ধূমপানের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে অধূমপায়ীদের রক্ষায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরকে জাতীয় নির্দেশনা অনুযায়ী সম্পূর্ণ ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহারমুক্ত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (৭ জুলাই) কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত ‘কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরকে শতভাগ ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহারমুক্ত ঘোষণা বিষয়ক মতবিনিময় সভা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে এ ঘোষণা দেন অধিদপ্তরের পরিচালক (হর্টিকালচার উইং) ড. মো. হজরত আলী।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, ধূমপানের ক্ষতি শুধু ধূমপায়ীর নয়, অধূমপায়ীর জন্যও সমান ঝুঁকিপূর্ণ। একইভাবে, ধোঁয়াবিহীন তামাকজাত দ্রব্যও মুখগহ্বরের ক্যানসারসহ নানা জটিল রোগের কারণ এবং সামগ্রিকভাবে জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। তাই আজ থেকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সকল কার্যালয় প্রাঙ্গনে সিগারেট, বিড়ি, জর্দা, গুল, সাদাপাতাসহ সব ধরনের তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার, বিক্রয় ও প্রচার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে। কর্মকর্তা-কর্মচারী ও আগত সেবাগ্রহীতাদের পরোক্ষ ধূমপানের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে সুরক্ষিত রাখতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সভায় স্বাগত বক্তব্যে ডব়্প-এর প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও এএইচএম নোমান বলেন, বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তামাক ব্যবহারকারী দেশ। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে তামাক ব্যবহারের হার সর্বোচ্চ, যা ৩৫ দশমিক ৩ শতাংশ। তুলনামূলকভাবে ভারতে এ হার ২৮ দশমিক ৬ শতাংশ এবং পাকিস্তানে ১৯ দশমিক ১ শতাংশ। তাই তামাক নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
মূল প্রবন্ধে ডব়্প তামাক নিয়ন্ত্রণ প্রকল্প সমন্বয়কারী জেবা আফরোজা বলেন, গ্যাটস ২০১৭ এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৩ কোটি ৮৪ লক্ষ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ প্রতিদিন কর্মক্ষেত্রসহ পাবলিক প্লেস ও পাবলিক পরিবহনে পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হয়। প্রাপ্তবয়স্কদের প্রায় ৪২.৭% আচ্ছাদিত কর্মক্ষেত্রে পরোক্ষ ধূমপানের শিকার। এছাড়াও, ৬১ হাজারেরও বেশি শিশু (১৫ বছরের নিচে) পরোক্ষ ধূমপানের কারণে সৃষ্ট রোগে ভুগছে। জন হপকিংস বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তামাক খাত থেকে সরকারের রাজস্ব আয় ছিল প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা। বিপরীতে তামাক ব্যবহারের কারণে মৃত্যু, স্বাস্থ্যহানি ও পরিবেশগত ক্ষতির আর্থিক মূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা, যা প্রাপ্ত রাজস্বের দ্বিগুণেরও বেশি। এছাড়াও, তামাক চাষে বিপুল পরিমাণ আবাদযোগ্য জমি ব্যবহৃত হয়, যা খাদ্য ও অন্যান্য লাভজনক ফসল উৎপাদনের সুযোগ কমিয়ে দেয়। তামাক চাষে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার মাটির উর্বরতা ও উৎপাদনশীলতা হ্রাস করে এবং পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অথচ একই জমিতে বিকল্প লাভজনক ফসল চাষের মাধ্যমে কৃষক অধিক আয় করতে পারেন এবং একই সঙ্গে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায়ও ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব।
তিনি যোগ করেন, তামাকের ব্যবহার জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি এবং পরিবেশের জন্য ক্রমবর্ধমান হুমকি হয়ে উঠেছে। এই গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের এ উদ্যোগ একটি অনুসরণযোগ্য উদাহরণ।
সভাপতির বক্তব্যে অধিদপ্তরের ক্রপস উইং-এর পরিচালক ড. সালমা লাইজু বলেন, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর তামাকমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। দেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত অধিদপ্তরের প্রায় ৬০০টি কার্যালয়ে কর্মরত প্রায় ৮৬ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং প্রতিদিন সেবা নিতে আসা অসংখ্য কৃষক ও সেবাগ্রহীতা এই উদ্যোগের মাধ্যমে তামাক ও পরোক্ষ ধূমপানের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে অধিকতর সুরক্ষা পাবেন। আমাদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় তামাক নিয়ন্ত্রণের এই জাতীয় উদ্যোগ আরও শক্তিশালী হবে বলে আমরা আশাবাদ ব্যক্ত করি।
সভা শেষে অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহারবিরোধী গণবিজ্ঞপ্তি, সাইনবোর্ড এবং স্টিকার স্থাপনা করা হয়।