শফিকুজ্জামান সোহেল গঙ্গাচড়া,রংপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ : ১৩ মে ২০২৬ দুপুর ০১:৪৪:২৭
তিস্তা নিয়ে বড় অগ্রগতির আশা, চীন সফরে নজর উত্তরের মানুষের
উত্তরের মানুষের কাছে তিস্তা শুধু একটি নদী নয়, এটি জীবন-জীবিকা, কৃষি ও টিকে থাকার প্রতীক। বছরের পর বছর শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট আর বর্ষায় আকস্মিক বন্যার দুর্ভোগে বিপর্যস্ত তিস্তাপারের জনজীবন। এমন বাস্তবতায় বহু আলোচিত তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে আবারও আশার আলো দেখছেন উত্তরাঞ্চলের মানুষ।
সম্প্রতি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর চীন সফর এবং আগামী জুনে প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য বেইজিং সফরকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনায় এসেছে তিস্তা মহাপরিকল্পনা। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা কাটিয়ে এবার প্রকল্প বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি হবে।
জানা গেছে, ২০১৬ সালের পর টানা তিন বছর তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে সমীক্ষা চালায় চীনের প্রতিষ্ঠান পাওয়ার চায়না কনস্ট্রাকশন। শুরু থেকেই প্রকল্পে অর্থায়নের আগ্রহ দেখিয়ে আসছে দেশটি। তবে ভারতের আপত্তির কারণে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার এ বিষয়ে এগোতে পারেনি। পরে সরকারিভাবে জানানো হয়, তিস্তা প্রকল্পে ভারত কাজ করবে।
কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আবারও চীনের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ায়। চলতি বছরের জানুয়ারিতে সাবেক পানিসম্পদ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনকে সঙ্গে নিয়ে তিস্তা অববাহিকা পরিদর্শন করেন। পরে বিএনপি সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতে চীনের রাষ্ট্রদূত জানান, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে বেইজিং প্রস্তুত রয়েছে।
এসব কূটনৈতিক তৎপরতায় আশাবাদী হলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু বিদেশি অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি নয়, এখন প্রয়োজন বাস্তবায়নের সুস্পষ্ট রূপরেখা।
‘তিস্তা বাঁচাও, নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদ’-এর সাধারণ সম্পাদক শফিয়ার রহমান বলেন, নির্বাচনের আগে বর্তমান সরকার তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছিল। তিস্তাপারের মানুষ এখন সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তব রূপ দেখতে চায়।
তিনি বলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর চীন সফর এবং প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য সফরকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। সবাই দ্রুত প্রকল্পের কাজ শুরুর অপেক্ষায় রয়েছে।
সংগঠনটির সভাপতি নজরুল ইসলাম হক্কানী বলেন, আগামী জুনে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর তিস্তা মহাপরিকল্পনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে কোনো অর্থনৈতিক চুক্তি হবে কি না, সেটি এখন সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।
এদিকে রিভারাইন পিপলের পরিচালক ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. তুহিন ওয়াদুদ মনে করেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে বিদেশি অর্থায়নের জন্য বসে থাকার প্রয়োজন নেই।
তিনি বলেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে লক্ষ কোটি টাকার প্রয়োজন নেই। সরকার চাইলে পাঁচ বছর ধরে প্রতি বছর দুই হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েও ধাপে ধাপে কাজ এগিয়ে নিতে পারে। এখন আর প্রতিশ্রুতি নয়, প্রয়োজন দৃশ্যমান উদ্যোগ।
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিনের দুর্বল পররাষ্ট্রনীতির কারণেই তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি ঝুলে আছে। এবারও যদি বাস্তবায়নে বাধা আসে, তাহলে আন্তর্জাতিক আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব বলেছেন, “জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত বর্তমান সরকার অতি অল্প সময়ের মধ্যে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু করবে। চীন এই প্রকল্পে অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তা দেবে।”
তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী শীঘ্রই চীন সফর করবেন এবং এই সফরের মাধ্যমে তিস্তা মহাপরিকল্পনায় বড় ধরনের অগ্রগতি হবে।
তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, উত্তরবঙ্গের মানুষের দীর্ঘদিনের এই দাবি দ্রুতই বাস্তবায়িত হবে।
তিস্তাপাড়ের মানুষের অভিযোগ, শুষ্ক মৌসুমে ভারত একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করায় নদী প্রায় মৃতপ্রায় হয়ে পড়ে। আবার বর্ষায় অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দেওয়ায় আকস্মিক বন্যায় প্লাবিত হয় বিস্তীর্ণ জনপদ। এতে কৃষি, জীবিকা ও পরিবেশ—সব ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
স্থানীয়দের মতে, তিস্তা মহাপরিকল্পনা এখন শুধু একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়, এটি উত্তরাঞ্চলের মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার দাবি। তাই রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও কূটনৈতিক আলোচনার বাইরে গিয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ দেখতে চায় তিস্তাপারের মানুষ।