জলাবদ্ধতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ভাসমান কৃষিতে বিপ্লব
বর্ষার জমাট পানিতে যখন আশপাশের ফসলি জমি তলিয়ে থাকে, জলজ উদ্ভিদের কারণে যেখানে সাধারণ কৃষিকাজ একেবারেই অসম্ভব ঠিক সেখানেই নতুন জীবনের সন্ধান পেয়েছেন পিরোজপুরের কৃষকরা। জলার ওপর কচুরিপানা জমিয়ে বিশেষ পদ্ধতিতে তৈরি করা ‘ধাপ’ বা ভাসমান বেডে ফলানো হচ্ছে দেশি-বিদেশি নানা জাতের সবজি ও চারা। জেলার নাজিরপুর ও নেছারাবাদ উপজেলার শত শত একর জলমহাল জুড়ে এখন শুধু সবুজের সমারোহ। ঐতিহ্যবাহী এই ‘ভাসমান সবজি চারা চাষ’কে কেন্দ্র করে পিরোজপুরে প্রতি বছর লেনদেন হচ্ছে কোটি কোটি টাকা, যাতে পুরুষের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ঘুরছে গ্রামীণ নারীদের ভাগ্যচাকাও।যেখানে পানির ওপর হাসে সমৃদ্ধি: পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার দেউলবাড়ী দোবরা, কলারদোয়ানিয়া,মালীখালী এবং নেছারাবাদ উপজেলার বলদিয়া ইউনিয়নের গ্রামগুলো এখন ভাসমান কৃষির প্রাণকেন্দ্র। এলাকাগুলোতে বিস্তীর্ণ জলাশয়ে চোখ মেললেই দেখা মিলবে সারি সারি ভাসমান বেডের।বেড তৈরির কৌশল: বর্ষার শুরুতে খাল বা বিলের জমে থাকা কচুরিপানা একত্র করে পচানো হয়। কয়েক স্তরে জমাট বেঁধে তৈরি করা হয় ২ থেকে ৩ ফুট পুরু এবং ৫০ থেকে ১০০ ফুট লম্বা ভাসমান বেড বা ‘ধাপ’।বীজ ও সবজি উৎপাদন: এসব ধাপে মূলত শসা, লাউ, মিষ্টি কুমড়া, বরবটি, করলা, টমেটো, চালকুমড়া ও বেগুনের বীজ রোপণ করে চারা তৈরি করা হয়। এ ছাড়া ধাপে সরাসরি লালশাক, পালংশাক, ডাঁটাশাক ও পুঁইশাকও ফলানো হয়।কোটি টাকার বাণিজ্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি মৌসুমে ভাসমান বেডে বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় এক কোটি সবজির চারা উৎপাদিত হয়। এসব চারা বিক্রি করে প্রায় ১০ কোটি টাকা আয় হয়। জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত এই মৌসুমজুড়ে এখান থেকে কোটি কোটি টাকার সবজি চারা ও তাজা সবজি সরবরাহ করা হয় দেশের বিভিন্ন জেলায়। দক্ষিণাঞ্চলের অন্যান্য জেলা তো বটেই, এমনকি দেশের উত্তরাঞ্চল থেকেও কৃষকরা এখানে আসেন চারা কিনতে। বর্তমানে এই পেশার সঙ্গে প্রায় ছয় হাজার কৃষক সরাসরি জড়িত রয়েছেন।ঐতিহাসিক পটভূমি ও জাতিসংঘের বৈশ্বিক স্বীকৃতি: পিরোজপুরের স্থানীয় কৃষকদের এই ভাসমান চাষাবাদের ইতিহাস প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো। শত বছরের এই মেধা ও উদ্ভাবনী শক্তি আজ আর কেবল স্থানীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই, বরং পেয়েছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলা করে পানির ওপর ফসল ফলানোর এই ভাসমান কৃষি পদ্ধতিকে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) ২০১৫ সালে ‘গ্লোবাল ইম্পর্ট্যান্ট এগ্রিকালচারাল হেরিটেজ সিস্টেম’ (GIAHS) বা ‘বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী কৃষি পদ্ধতি’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। পিরোজপুরের নাজিরপুর ও নেছারাবাদের এই পদ্ধতি আজ বিশ্বের জলবায়ু ঝুঁকিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য এক অনুকরণীয় মডেল।নারী শক্তির জাগরণ ঘরে বসেই আত্মনির্ভরশীলতা: পিরোজপুরের এই ভাসমান কৃষি বিপ্লবের নেপথ্যে বড় অবদান রাখছেন স্থানীয় নারীরা। পুরুষ সদস্যরা যখন জলাশয়ে ধাপ তৈরি ও যাতায়াতের কাজে ব্যস্ত থাকেন, নারীরা তখন ঘরে বসে চারা তৈরির প্রস্তুতি নেন।বিড়া তৈরি: কচুরিপানা, দুলালীলতা, শ্যাওলা, টেপপানা, গুঁড়িপানা ইত্যাদি জলজ উদ্ভিদের সঙ্গে খড়কুটা দিয়ে ছোট ছোট গোলাকার ‘বিড়া’ বা দোলনা তৈরি করেন নারীরা। এর ভেতরে মাটি ও পচাপাতা দিয়ে বীজের অঙ্কুরোদগম ঘটানো হয়।পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণ: বীজ ফুটলে তা যত্নে বড় করে তোলা, পোকা-মাকড় দূর করা এবং ধাপে বসানোর উপযোগী করার মূল দায়িত্ব পালন করেন পরিবারের নারী ও কিশোরীরা।আর্থিক স্বাধীনতা: ২০০৫ সাল থেকে নেছারাবাদের বলদিয়া ইউনিয়নের গগন গ্রামের কৃষক জাকির হোসেনের স্ত্রী নুরজাহান বেগমের মতো অনেক নারী উদ্যোক্তা এখন এলাকার অসহায় নারীদের নিয়ে কাজ করছেন। এ কাজের মাধ্যমে গ্রামের হাজার হাজার নারী নিজেদের স্বাবলম্বী করে তুলেছেন। পরিবারের বাড়তি আয়ের পাশাপাশি নিজেদের হাতখরচ ও সন্তানদের পড়াশোনার খরচ তারা নিজেরাই বহন করছেন।কৃষি দপ্তরের সহযোগিতা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা: পিরোজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সৌমিত্র সরকার জানান, নাজিরপুর ও নেছারাবাদে ভাসমান বেডে উৎপাদিত সবজির চারা খুলনা, যশোর, ঢাকা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাচ্ছে। কৃষি অফিস থেকে এই পেশার সঙ্গে জড়িত কৃষকদের নিয়মিত প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।তবে স্থানীয় কৃষকদের মতে, ভাসমান কৃষিকে আরও লাভজনক করতে কিছু সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। হিমাগার ও পরিবহন সুব্যবস্থা সহজে চারা ও পচনশীল সবজি দূর-দূরান্তে পরিবহনের জন্য দ্রুত যোগাযোগ ও সংরক্ষণব্যবস্থা জোরদার করা। সহজ শর্তে ঋণ প্রদান মৌসুমে কৃষকদের মূলধনের সংকট কাটাতে স্বল্প সুদে বা সুদমুক্ত কৃষি ঋণের ব্যবস্থা করা। প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ আধুনিক উপায়ে বীজ সংরক্ষণ ও প্রাকৃতিক কীটনাশক ব্যবহারের ওপর কৃষকদের আরও উন্নত প্রশিক্ষণ দেওয়া।পানির ওপর কৃষকদের এই অক্লান্ত পরিশ্রম আর নারীদের স্বাবলম্বী হওয়ার গল্প প্রমাণ করে পরিবেশ যতোই প্রতিকূল হোক না কেন, মানুষের ইচ্ছাশক্তির কাছে তা নতি স্বীকার করতে বাধ্য। পিরোজপুরের নাজিরপুর আর নেছারাবাদ জলে ভেসে থাকা প্রতিটি সবুজ চারা যেন একেকটি রূপালি স্বপ্ন, যা প্রতিদিন নতুন করে বদলে দিচ্ছে গ্রামীণ বাংলাদেশকে।