নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ দুপুর ০২:১৫:৫৩
সম্পত্তির অধিকার রক্ষার আইন নিয়ে জামায়াতের সমালোচনার জবাব চিফ হুইপের
মা-বাবার সম্পত্তির অধিকার ও তাদের ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে সরকারের নেওয়া উদ্যোগের বিরোধিতা করে শরিয়া আইনের দোহাই দেওয়া হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি।
তিনি বলেছেন, মা-বাবাকে সম্মান ও সুরক্ষা দেওয়ার বিষয়টি ইসলামেও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বলা হয়েছে। অথচ এ বিষয়ে আইন করার উদ্যোগের বিরোধিতা করা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (১১ সেপ্টেম্বর) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন শেষে আয়োজিত প্রেস কনফারেন্সে তিনি এসব কথা বলেন।
চিফ হুইপ বলেন, ‘শরিয়া আইন চালু হবে’ এমন কোনো কথা সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়নি। শরিয়া আইনের দোহাই দিয়ে যারা এই আইনের বিরোধিতা করছেন, তাদের নিজেদের অবস্থানও পরিষ্কার করা উচিত। দেশের অনেক মা-বাবা বৃদ্ধাশ্রমে থাকছেন। কেউ কেউ অসুস্থ মা-বাবাকে ঘরে আটকে রাখছেন, সম্পত্তি নেওয়ার চেষ্টা করছেন কিংবা তাদের খোঁজখবর রাখছেন না। তাদের জীবনের শেষ সময়ে নিরাপত্তা ও সম্মান নিশ্চিত করার জন্যই এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি প্রশ্ন করেন বলেন,‘এই আইন করে তারেক রহমানের কী লাভ হবে? এখানে ব্যক্তিগতভাবে কারও কী লাভ হবে? দেশের সাধারণ মানুষের মা-বাবাকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্যই তো এই উদ্যোগ।’
শরিয়া আইনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বাংলাদেশে ফৌজদারি আইনসহ বিভিন্ন আইন প্রচলিত রয়েছে। চুরি করলে শরিয়া আইনে হাত কাটার বিধান থাকলেও বাংলাদেশে সেই আইন প্রয়োগ করা হয় না। তাহলে প্রচলিত আইনের অধীনে যারা আইন পেশায় যুক্ত, তারা কেন শরিয়া আইনের প্রসঙ্গ তুলে একটি জনকল্যাণমূলক আইনের বিরোধিতা করবেন।
সংসদে পাস হওয়া বিভিন্ন আইন প্রসঙ্গে চিফ হুইপ বলেন, সরকার আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে বিভিন্ন পক্ষের মতামত নিয়েছে। মানবাধিকার, আইনজীবী, বিচারক, সাংবাদিকসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে আইনগুলোকে আরও কার্যকর করার চেষ্টা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা এমনভাবে আইন করতে চাই, যাতে মানবাধিকার কোনোভাবেই লঙ্ঘিত না হয়। সংশ্লিষ্ট সবার মতামত নিয়ে একটি ভালো আইন করার চেষ্টা করেছি।’
দেশের বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সারের সংকট নিয়েও বক্তব্য দেন চিফ হুইপ। তিনি বলেন, একটি নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করতে কয়েক বছর সময় লাগে। তাই সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
সারের সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমানে দেশে প্রায় ১৬ লাখ মেট্রিক টন অতিরিক্ত সার রয়েছে। তবে বিতরণ ব্যবস্থায় নানা ধরনের সমস্যা তৈরি হয়েছে। আগের সরকারের সময়ের প্রায় চার হাজার সার ডিলার এবং বিতরণ ব্যবস্থায় অনিয়মের কারণে সংকট তৈরি হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
কৃষকদের জন্য সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরে চিফ হুইপ বলেন, কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড ও হেলথ কার্ডসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে স্বাবলম্বী করার চেষ্টা চলছে।
বিদ্যুৎ খাতে বিগত সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে তিনি বলেন, প্রয়োজন না থাকলেও অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়েছে। এতে রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে। সরকার এখন এসব ব্যয় কমিয়ে দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
চিফ হুইপ আরও বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিগত সরকারের নেওয়া ঋণের অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে। জনগণের করের টাকা যাতে অপচয় না হয়, সে বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কঠোর অবস্থানে রয়েছেন।
সরকারি ব্যয় কমানোর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী নিজে সরকারি ব্যয় কমানোর চেষ্টা করছেন। সরকারি অর্থের অপচয় বন্ধে মন্ত্রী-এমপিদেরও জবাবদিহির আওতায় আনা হচ্ছে।
দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিয়ে বিরোধী দলের লংমার্চের সমালোচনা করে চিফ হুইপ বলেন, লংমার্চ করে যদি বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সমস্যা সমাধান করা যেত, তাহলে সরকারই সবার আগে লংমার্চ করত। একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করতে কমপক্ষে দুই থেকে আড়াই বছর সময় লাগে। তাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে সমস্যাগুলোর সমাধান করতে হবে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়ে তিনি বলেন, সরকারের কোনো দেশকে শত্রু হিসেবে দেখার নীতি নেই। বাংলাদেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চায় সরকার।
তিনি বলেন, ‘সবার আগে বাংলাদেশ। দেশের স্বার্থ রক্ষা করে যে কাজ করা প্রয়োজন, আমরা সেটিই আগে করব।’
সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা প্রসঙ্গে চিফ হুইপ বলেন, সরকার সংসদকে কার্যকর রাখতে চায়। বিরোধী দলের বক্তব্যকে গুরুত্ব দিয়ে সংসদে আলোচনা ও বিতর্কের পরিবেশ বজায় রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
স্থায়ী কমিটিতে বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্ব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ৩৯টি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি কমিটিতে বিরোধী দলের সদস্যদের তিনজন করে রাখা হয়েছে। আইন ও বিচার, অর্থ, বাণিজ্য, শিল্প, ডাক ও টেলিযোগাযোগ, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক, শ্রম, রেল, মহিলা ও শিশু এবং খাদ্যসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কমিটিতে বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হয়েছে।
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে চিফ হুইপ বলেন, এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট। সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন হলে সংসদের মাধ্যমেই তা করা হবে। বিরোধী দলকে সঙ্গে নিয়ে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
তিনি বলেন, ‘আমরা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করব। এর জন্য যেখানে সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন হবে, সেখানে সংবিধান সংশোধন করেই তা করা হবে। আমরা চাই সবাই একসঙ্গে এসে সংবিধান সংশোধন করি।’
চিফ হুইপ বলেন, সরকার দেশে গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চায়। দেশের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন এবং তাদের স্বাবলম্বী করার জন্য সরকার কাজ করছে। এ কাজে সরকার বিরোধী দলসহ সবার সহযোগিতা চায়।
ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণের বিষয়টি নিয়ে চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেছেন, বাংলাদেশকে ব্রিকসের চেয়ারম্যান হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়। তিনি বলেন, ‘আমরা প্রত্যাশা করেছিলাম, তারা সেই সম্মানটুকু দেখাবে। আমরা সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে চাই।’
তিনি বলেন, বাংলাদেশের কোনো দেশের সঙ্গে শত্রুতা নেই। প্রতিবেশীসহ বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চায় সরকার। তবে যেখানে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ জড়িত, সেখানে সেই স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
এ সময় জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে বিরোধী দলীয় নেতার বক্তব্য প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে চিফ হুইপ বলেন, ‘জুলাই সনদের কোন বিষয় মানা হচ্ছে না, সেটা আপনারা নির্দিষ্ট করে বলেন।’
তিনি বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার। প্রয়োজন হলে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে সনদ বাস্তবায়ন করা হবে এবং এ বিষয়ে সংসদে ঐকমত্যের ভিত্তিতে কাজ করতে চায় সরকার।
সরকারের বিভিন্ন চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) পর্যালোচনা করে দেশের স্বার্থ বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি। তিনি বলেন, ‘আমরা সব ১০১টি এমওইউ নিয়েই আলোচনা করছি। এর ফল আপনারা পাবেন। আর্থিক বিষয়টি সবকিছুর সঙ্গে মিলিয়ে দেখা সম্ভব নয়। আমরা চাই বাংলাদেশের আর্থিক সক্ষমতা শক্তিশালী হোক। সে লক্ষ্যেই কাজ করছি। যেখানে প্রয়োজন মনে হয়েছে, সেখানে চুক্তি বাতিল করা হয়েছে।’
বিরোধী দলের সঙ্গে সরকারের মতপার্থক্য বাড়ছে না দাবি করে চিফ হুইপ বলেন, বরং সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে যোগাযোগ আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। বিরোধী দলীয় নেতার বক্তব্যে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ‘ন্যারেটিভ’ তৈরির চেষ্টা রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের মধ্যে মতপার্থক্য বাড়েনি, বরং আমরা ক্লোজার হয়েছি। বিরোধী দলের নেতার বক্তব্যে ১৯৭১, ১৯৪৭ ও ভাষা আন্দোলনের কথা এসেছে। কিন্তু জিয়াউর রহমান সম্পর্কে একটি শব্দও তিনি উচ্চারণ করেননি। এরপর এরশাদের সময় এবং পরবর্তী আন্দোলনের কথা এসেছে। একটি নির্দিষ্ট ন্যারেটিভ দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। বিষয়টি বুঝতে হবে।’
সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের বিরোধিতা না করে জনস্বার্থে গঠনমূলক সহযোগিতার আহ্বান জানিয়ে চিফ হুইপ বলেন, সরকার দেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ভুল-ত্রুটি সংশোধন করে এগিয়ে যেতে চায়।