শাফি উদ্দিন আহমদ, নিউইয়র্ক থেকে
প্রকাশ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ রাত ১০:৫৬:৪৩
রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান মিয়ানমারেই: তারেক রহমান
রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে, এর সমাধানও মিয়ানমারেই নিহিত—এ মন্তব্য করে দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি স্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ তৈরির আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী এই সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি পাঁচ দফা সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তুলে ধরেছেন তিনি।
বুধবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের সাইড ইভেন্টে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, এখন বাস্তুচ্যুতি ব্যবস্থাপনা করে যাওয়ার সময় নয়; বাস্তুচ্যুতির অবসান ঘটানোর দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে। প্রধানমন্ত্রীর পাঁচ দফা প্রস্তাবের প্রথমটিতে রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অংশীজনদের একটি স্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ তৈরির আহ্বান জানানো হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, মিয়ানমারে চলমান সহিংসতা বন্ধ এবং রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমিতে নিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর মতে, প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ তৈরি না হলে টেকসই সমাধানের পথে অগ্রসর হওয়া কঠিন।
তৃতীয় প্রস্তাবে রোহিঙ্গা ও তাদের আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত ও স্থিতিশীল মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তার পাশাপাশি কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপরও যে চাপ তৈরি হয়েছে, সেটি আন্তর্জাতিক সহযোগিতার আওতায় আনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন তিনি।
চতুর্থ প্রস্তাবে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত গুরুতর অপরাধের জন্য ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বিচারিক ও তদন্ত প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা অব্যাহত রাখার কথাও বলেন তিনি।
পঞ্চম প্রস্তাবে রোহিঙ্গা সংকটকে ঘিরে বাড়তে থাকা আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান জানানো হয়। মানবপাচার, মাদকপাচার, অনলাইন ও ডিজিটাল প্রতারণা এবং অবৈধ অস্ত্র চোরাচালানের মতো অপরাধের বিরুদ্ধে সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ মানবিক কারণে বছরের পর বছর বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। কিন্তু এই সংকটের স্থায়ী সমাধান বাংলাদেশের ভূখণ্ডে তাদের অনির্দিষ্টকাল রেখে দেওয়ার মধ্যে নয়; বরং নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণভাবে তাদের নিজ ভূমিতে ফেরানোর মধ্যেই সমাধান নিহিত।
এর আগে মঙ্গলবার জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার বারহাম সালেহর সঙ্গে বৈঠকেও প্রধানমন্ত্রী একই অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমিতে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের কোনো বিকল্প নেই এবং এ জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
একই দিন জাতিসংঘ মহাসচিবের মিয়ানমারবিষয়ক বিশেষ দূত জুলি বিশপের সঙ্গেও বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে রোহিঙ্গাদের সম্মানজনক প্রত্যাবাসন এবং দীর্ঘস্থায়ী সংকটের টেকসই সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর ভূমিকার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা হয়। নিউইয়র্কে ধারাবাহিক এসব বৈঠক ও উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এবার মূলত তিনটি বার্তা স্পষ্ট করা হয়েছে—রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য একটি কার্যকর রোডম্যাপ, মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি এবং সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও মানবিক সহযোগিতা।
রোহিঙ্গা সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ায় এর প্রভাব এখন শুধু মানবিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই। মানবপাচার, মাদক ও অন্যান্য আন্তঃসীমান্ত অপরাধের বিস্তারসহ আঞ্চলিক নিরাপত্তার ওপরও এর প্রভাব পড়ছে বলে প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেছেন। ফলে সংকটটির দ্রুত সমাধান বাংলাদেশের পাশাপাশি পুরো অঞ্চলের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রধানমন্ত্রীর ৫ দফা প্রস্তাবের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ এবার শুধু মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার আহ্বান নয়, বরং প্রত্যাবাসনকেন্দ্রিক একটি আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার দাবি সামনে এনেছে। আগামীকাল জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণেও রোহিঙ্গা সংকটের এই বার্তা গুরুত্ব পেতে পারে।