নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৭ আগস্ট ২০২৬ রাত ১১:২৬:৫৯
প্রকৌশলীদের মেধার যথাযথ মূল্যায়ন করতে হবে: রিজভী
দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদদের মেধা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট মো. রুহুল কবির রিজভী।
তিনি বলেছেন, উচ্চশিক্ষিত ও দক্ষ ব্যক্তিদের উচ্চপর্যায়ে কাজ করার সুযোগ পাওয়াই একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রের স্বাভাবিক প্রত্যাশা। কিন্তু বাংলাদেশে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারদের মেধা, যোগ্যতা ও পেশাগত দক্ষতার যথাযথ মূল্যায়ন হচ্ছে না। একই সঙ্গে প্রকৌশলীদের চাকরির সুযোগও দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে। এই অবস্থার পরিবর্তন জরুরি।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) ‘প্রকৌশলী অধিকার দিবস’ উপলক্ষে আয়োজিত ‘জাতীয় প্রকৌশলী সম্মেলন-২০২৬’-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশ (আইইবি)-এর সার্বিক সহযোগিতায় প্রকৌশলী অধিকার আন্দোলন এ সম্মেলনের আয়োজন করে।
রিজভী বলেন, ‘একটি দেশকে উন্নত করতে হলে সেই দেশের প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদদের গুরুত্ব বাড়াতে হবে।’ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উন্নয়নের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, চীন একটি উন্নয়নশীল দেশ থেকে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। এর পেছনে দেশটির প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে।
পরিকল্পিত অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ও গবেষণায় প্রকৌশলীদের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে রিজভী বলেন, এসব ক্ষেত্রে দক্ষ প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদদের কাজে লাগানো ছাড়া একটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন সম্ভব নয়।
‘মেরিটোক্রেসি, মবোক্রেসি নয়’
বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে হলে মেধাভিত্তিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন বিএনপির এই নেতা। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশকেও এগিয়ে নিতে হলে মেরিটোক্রেসি বা মেধাভিত্তিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে। মেধার পরিবর্তে মবোক্রেসি বা জনতার চাপ ও প্রভাবনির্ভর ব্যবস্থা বাড়তে দেওয়া যাবে না।’
তাঁর মতে, একজন প্রকৌশলীকে তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা, দক্ষতা ও কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে দায়িত্ব ও পদ দিতে হবে। যোগ্যতার পরিবর্তে অন্য কোনো বিবেচনায় দায়িত্ব বণ্টন করা হলে তা শুধু প্রকৌশলীদের জন্য বৈষম্য তৈরি করবে না, দেশের উন্নয়ন ব্যবস্থাকেও দুর্বল করবে।
দেশের বড় প্রকল্পগুলোতে প্রকৌশলীদের আরও বেশি সম্পৃক্ত করার আহ্বান জানিয়ে রিজভী বলেন, বাংলাদেশের প্রকৌশলীদের সক্ষমতার বড় প্রমাণ তিস্তা ব্যারেজ নির্মাণে তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। এটি প্রমাণ করে যে দেশের প্রকৌশলীরা বড় ও জটিল জাতীয় প্রকল্প বাস্তবায়নে সক্ষম।
‘তাই তাঁদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনায় আরও বেশি সম্পৃক্ত করতে হবে’—বলেন তিনি।
গবেষণা ও উদ্ভাবনে জোর
দেশের প্রতিটি খাতে গবেষণা ও উদ্ভাবনের সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন রিজভী। তিনি বলেন, শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই উন্নয়ন নিশ্চিত হবে না। টেকসই উন্নয়নের জন্য গবেষণা, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে হবে।
বাংলাদেশকে উন্নত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত করতে হলে প্রকৌশলীদের মেধা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
রিজভী বলেন, ‘মেধার যথাযথ মূল্যায়ন, প্রকৌশলীদের সুযোগ বৃদ্ধি এবং গবেষণাভিত্তিক উন্নয়ন—এই তিনটির সমন্বয়েই বাংলাদেশকে টেকসইভাবে উন্নতির পথে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।’
প্রকৌশলীদের অধিকার নিয়ে যা বললেন অন্যরা
সম্মেলনে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে অ্যাসোসিয়েশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশের (এ্যাব) আহ্বায়ক প্রকৌশলী শাহরিন ইসলাম তুহিন প্রকৌশলীদের ন্যায্য অধিকার, পেশাগত মর্যাদা ও বৈষম্য দূর করার দাবির প্রতি সমর্থন জানান।
তিনি বলেন, দেশের উন্নয়ন ও সমস্যা সমাধানে শুধু আলোচনা নয়, সমস্যার কারণ চিহ্নিত করে বাস্তবভিত্তিক ও টেকসই সমাধান বের করতে হবে। বিশেষ করে বিসিএস পরীক্ষায় প্রকৌশলীদের জন্য নির্ধারিত পদ দিন দিন কমে যাওয়া উদ্বেগজনক। প্রশাসন ও উন্নয়ন ব্যবস্থায় প্রকৌশলীদের দক্ষতা ও জ্ঞান কাজে লাগাতে তাঁদের উপযুক্ত পদ ও সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সম্মেলনে সভাপতির বক্তব্যে প্রকৌশলী অধিকার আন্দোলনের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও আইইবির প্রেসিডেন্ট প্রকৌশলী মোহাম্মদ রিয়াজুল ইসলাম (রিজু) বলেন, গত এক বছরে প্রকৌশলীদের অধিকার আদায়ে বিভিন্ন কর্মসূচি ও দাবি উত্থাপন করা হলেও তাঁদের প্রত্যাশিত অধিকার ও মর্যাদা এখনো পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
তিনি বলেন, বিশ্ব এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন, রোবটিক্স, বিগ ডাটা ও ডিজিটাল প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের মধ্য দিয়ে উচ্চপ্রযুক্তির যুগে প্রবেশ করেছে। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশকেও এসব প্রযুক্তি গ্রহণ ও ব্যবহারে দক্ষ হতে হবে।
দেশের বড় উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর পরিকল্পনা, নকশা, বাস্তবায়ন ও তদারকিতে যোগ্য প্রকৌশলীদের সম্পৃক্ত করার ওপর জোর দিয়ে রিয়াজুল ইসলাম বলেন, এতে প্রকল্পের মান, সময় ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, যথাযথ মূল্যায়ন, কর্মসংস্থান, গবেষণা ও নেতৃত্বের সুযোগ না থাকায় মেধাবী প্রকৌশলীদের অনেকে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। এ মেধা পাচার বন্ধে দেশে প্রকৌশলীদের জন্য মেধা ও যোগ্যতাভিত্তিক সুযোগ তৈরি করতে হবে।
সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রকৌশলী অধিকার আন্দোলনের সভাপতি প্রকৌশলী এম ওয়ালি উল্লাহ। তিনি দাবি করেন, সহকারী প্রকৌশলী পদে ৬৭ শতাংশ নিয়োগের বিধান থাকলেও বাস্তবে মাত্র ৩৩ শতাংশ নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। বাকি পদগুলো পদোন্নতি কিংবা অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রদানের মাধ্যমে পূরণ করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, একজন বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার ১০ম গ্রেডের উপসহকারী প্রকৌশলী পদে আবেদন করার সুযোগ পাচ্ছেন না, অথচ অন্যান্য পদে আবেদন করতে পারছেন। এ ধরনের বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা প্রকৌশলীদের পেশাগত অধিকার ও মর্যাদার সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ।
বিসিএসে প্রকৌশলীদের জন্য নির্ধারিত পদ কমে যাওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরে তিনি মেধা, যোগ্যতা ও ন্যায়ের ভিত্তিতে নিয়োগ নিশ্চিত করার দাবি জানান।
সম্মেলনে আইইবির ভাইস প্রেসিডেন্ট (একাডেমিক ও আন্তর্জাতিক) প্রকৌশলী খান মনজুর মোরশেদ, ভাইস প্রেসিডেন্ট (প্রশাসন ও অর্থ) প্রকৌশলী এ টি এম তানবীর-উল হাসান (তমাল), সম্মানী সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী মো. সাব্বির মোস্তফা খান, সম্মানী সম্পাদক (ঢাকা কেন্দ্র) প্রকৌশলী কে এম আসাদুজ্জামান, ভাইস চেয়ারম্যান (একাডেমিক ও এইচআরডি) প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আল মামুন, কেন্দ্রীয় কাউন্সিল সদস্য প্রকৌশলী রবিউল আলম উজ্জ্বলসহ অন্যরা বক্তব্য দেন।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন আইইবির সম্মানী সাধারণ সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত) প্রকৌশলী মুহাম্মদ আহসানুল রাসেল। এতে আইইবির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ, কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের সদস্য এবং বিভিন্ন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।