নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : ৫ মার্চ ২০২৬ বিকাল ০৩:০৫:১৮
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ ৮ সপ্তাহ স্থায়ী হতে পারে: মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী
ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংঘাত আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে। নিজেদের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির হত্যার প্রতিশোধ নিতে এবং ইসলামী শাসন ব্যবস্থাকে বাঁচাতে মরিয়া হয়ে লড়ছে ইরান। ৬ দিন ধরে চলমান হামলা-পাল্টা হামলায় রীতিমতো যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে পুরো মধ্যপ্রাচ্য। যতটা সহজে ইরানকে নাস্তানাবুদ করা যাবে বলে ভেবেছিল ওয়াশিংটন, তা এরই মধ্যে ভুল প্রমাণ করে দিয়েছে ইরান। সহসা এই যুদ্ধ শেষ হচ্ছে বলেই এখন মনে হচ্ছে। এ অবস্থায় ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ ৮ সপ্তাহ পর্যন্তও স্থায়ী হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ।
দ্য গার্ডিয়ানের এক খবরে বলা হয়েছে, বুধবার (৪ মার্চ) এক সংবাদ সম্মেলনে
পিট হেগসেথ বলেন, কয়েক দিনের মধ্যেই ইরানের আকাশসীমার ওপর পূর্ণ ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী
নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে যুক্তরাষ্ট্র। তার ভাষায়, ইরান মার্কিন সামরিক শক্তির সঙ্গে
পাল্লা দিয়ে টিকে থাকতে পারবে না ও তাদের সামরিক সক্ষমতা প্রতি ঘণ্টায় ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, আমরা চার সপ্তাহ বলতে পারি, কিন্তু
তা ছয়ও হতে পারে, আটও হতে পারে; এমনকি তিন সপ্তাহ পর্যন্তও চলতে পারে। তবে, শেষ পর্যন্ত
গতি ও সময়সীমা আমরা নির্ধারণ করবো।
ইরানের বিরুদ্ধে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি (শনিবার) শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের
যৌথ সামরিক অভিযানে এরই মধ্যে ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধে চালানো অভিযানের তুলনায় দ্বিগুণ
আকাশশক্তি প্রয়োগ করা হয়েছে বলে দাবি করেন হেগসেথ। একইসঙ্গে তিনি বলেন, এবারের সামরিক
অভিযান ইসরায়েলের আগের ১২ দিনের যুদ্ধে ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযানের চেয়ে সাত
গুণ বেশি তীব্র।
ওয়াশিংটনে এই সংবাদ সম্মেলনে হেগসেথের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন মার্কিন
জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন।
হেগসেথ বলেন, আমরা এখন কেবল শুরু করেছি। আমরা গতি কমাচ্ছি না, বরং বাড়াচ্ছি।
তিনি আরও দাবি করেন, ইরানের শাসকগোষ্ঠী শেষ হয়ে গেছে ও তারা সেটা জানে, অথবা খুব শিগগিরই
বুঝতে পারবে।
আর জেনারেল ড্যান কেইন দাবি করেন, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরানের
ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ৮৬ শতাংশ কমে গেছে। এছাড়া তাদের নৌবাহিনীর বড় অংশ
ধ্বংস হয়ে গেছে ও উচ্চপর্যায়ের নেতৃত্ব হয় নিহত হয়েছে, নয়তো আত্মগোপনে রয়েছে। এসব অগ্রগতির
ফলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের দক্ষিণ উপকূলজুড়ে আকাশে শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে।
এখন মার্কিন বাহিনী ধীরে ধীরে স্থলভাগের গভীরে অভিযান বিস্তৃত করবে এবং ক্রমশ ইরানের
অভ্যন্তরে আরও গভীরে হামলা চালাবে।
তবে, আগের দিনই মার্কিন আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার এক বৈঠকে ইরানের
প্রতিরোধ হামলার মুখে নিজেদের দূর্বলতার কথা স্বীকার করেছিলেন ড্যান কেইন। ওই বৈঠকে
আইনপ্রণেতাদের তিনি জানান, ইরান বর্তমানে হাজার হাজার একবার ব্যবহারযোগ্য আত্মঘাতী
ড্রোন মোতায়েন করেছে। মার্কিন বাহিনীর অধিকাংশ ড্রোন ধ্বংস করার সক্ষমতা থাকলেও ঝাঁকে
ঝাঁকে আসা এসব ড্রোনের সবকটি ঠেকানো হয়তো সম্ভব হবে না।
উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে বর্তমানে নিজেদের স্বল্পমূল্যের
‘শাহেদ’ ড্রোন ব্যবহার করছে ইরান। অত্যন্ত নিচ দিয়ে ও ধীরগতিতে ওড়ার কারণে এসব ড্রোন
সাধারণ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতে ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের চেয়েও বেশি
কার্যকর বলে মনে করা হচ্ছে।
মার্কিন প্রশাসনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয়বহুল
প্যাট্রিয়ট ও থাড ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রগুলো নিঃশেষ করে ফেলাই ইরানের কৌশল।
এদিকে কংগ্রেসের শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সদস্যরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন,
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যবান ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের
মজুদ দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। জেনারেল কেইন ব্যক্তিগতভাবে এই উদ্বেগের সঙ্গে একমত হলেও
প্রকাশ্যে আশ্বস্ত করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পর্যাপ্ত অস্ত্র মজুদ রয়েছে। তার ভাষায়,
‘প্রতিরক্ষা ও পাল্টা হামলা উভয় ক্ষেত্রেই আমাদের কাছে পর্যাপ্ত নিখুঁত অস্ত্রশস্ত্র
রয়েছে।’
তবে, বাস্তবতা হলো, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে আকাশচুম্বী খরচের মুখে
পড়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক প্রাথমিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী,
যুদ্ধের প্রথম কয়েক দিন প্রতিদিন প্রায় ২০০ কোটি ডলার ব্যয় করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
এ অবস্থায় ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের স্থলবাহিনী পাঠানো হতে পারে কি না,
এমন প্রশ্ন এড়িয়ে যান হেগসেথ। এটিকে তিনি ‘নীতিনির্ধারকদের বিষয়’ বলে উল্লেখ করেন।
তাছাড়া অভিযান কখন শেষ হবে, সেই সময়সীমা নিয়েও স্পষ্ট কিছু বলতে পারেননি তিনি।