হানিফ উদ্দিন সাকিব, হাতিয়া (নোয়াখালী) প্রতিনিধি
প্রকাশ : ২ নভেম্বর ২০২৬ রাত ০৬:৩০:৩২
হাসপাতাল নেই, চিকিৎসার পথে মৃত্যুর মিছিল নিঝুম দ্বীপে
সুন্দরবনের পর দেশের অন্যতম বৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি নোয়াখালীর জেলার বিছিন্ন দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার নিঝুম দ্বীপ। ক্রমবর্ধমান জনবসতির এই দ্বীপে প্রায় ৪০ হাজার মানুষের বসবাস হলেও তাদের জন্য এখনো গড়ে ওঠেনি একটি পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল। ফলে দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থার কারণে জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হলে চরম দুর্ভোগে পড়তে হয় স্থানীয়দের।
বিশেষ করে প্রসূতি ও গর্ভবতী নারীদের জন্য পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। জটিল প্রসবকালীন পরিস্থিতিতে দ্রুত চিকিৎসা না পেয়ে অনেক নারীকে উপজেলা কিংবা জেলা সদরের হাসপাতালে নেওয়ার পথে মৃত্যুর মুখে পড়তে হয়। সড়কপথের পাশাপাশি দীর্ঘ জলপথ পাড়ি দিতে গিয়ে সংকটাপন্ন রোগীর অবস্থার আরও অবনতি ঘটে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, চিকিৎসার অভাবে পথে রোগী মৃত্যুর ঘটনা নিঝুম দ্বীপবাসীর কাছে নতুন কোনো বিষয় নয়।
নিঝুম দ্বীপ থেকে হাতিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যেতে প্রায় ৪০ কিলোমিটার সড়ক ও জলপথ পাড়ি দিতে হয়। অন্যদিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য জেলা সদরে যেতে হয় প্রায় ১১০ কিলোমিটার পথ। ভাঙাচোরা সড়ক, অনুন্নত নৌ যোগাযোগ এবং জরুরি সময়ে দ্রুত পরিবহনের অভাবের কারণে সংকটাপন্ন রোগীদের জন্য এই দীর্ঘ পথ অনেক সময় প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে।
নিঝুম দ্বীপ ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র রয়েছে একটি সাইক্লোন শেল্টার ভবনে। কিন্তু সেখানে নেই কোনো মেডিকেল অফিসার। নেই পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা ও উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসারও। ফলে বিপুলসংখ্যক মানুষের জন্য কার্যকর চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না।
স্থানীয়রা জানান , কয়েক বছর আগে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর ইউএসএআইডির সহযোগিতায় ‘মা-মণি’ প্রকল্পের মাধ্যমে কিছু সেবা দেওয়া হতো। বর্তমানে ইউএনএফপিএর সহযোগিতায় একজন মিডওয়াইফের মাধ্যমে সীমিত পরিসরে স্বাভাবিক প্রসবের সেবা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম, সরকারি অক্সিজেন, গ্লাভসসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক সুবিধার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় জটিল রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয় না।
সম্প্রতি ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা না পেয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠানো হয় রোকসানা নামে এক অন্তঃসত্ত্বা নারীকে। দীর্ঘ পথ ও দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থার কারণে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য জেলা সদরে নেওয়ার পথে ট্রলারে তাঁর মৃত্যু হয় বলে স্থানীয়রা জানান।
রোকসানার মতো আরও কত নারী চিকিৎসার অভাবে পথে প্রাণ হারিয়েছেন, তার সঠিক হিসাব নেই বলে দাবি স্থানীয়দের।
কমিউনিটি ক্লিনিকেও সংকট
নিঝুম দ্বীপে সাধারণ মানুষের প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য রয়েছে তিনটি কমিউনিটি ক্লিনিক। তবে সেখানেও রয়েছে নানা সংকট।
স্থানীয়দের অভিযোগ, চিকিৎসাসামগ্রী ও ওষুধের ঘাটতির পাশাপাশি ক্লিনিকগুলোর অবকাঠামোগত অবস্থাও নাজুক।
অনুন্নত যোগাযোগব্যবস্থা এবং বিভিন্ন সভা-সেমিনার ও প্রশিক্ষণের কারণে কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডারদের (সিএইচসিপি) নিয়মিত উপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ফলে জ্বর, সর্দি-কাশি কিংবা অন্যান্য সাধারণ অসুস্থতার চিকিৎসার জন্যও অনেককে স্থানীয় ফার্মেসি কিংবা কবিরাজি চিকিৎসার ওপর নির্ভর করতে হয়।
নিঝুম দ্বীপ ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রে জনবল সংকটের বিষয়ে নোয়াখালী জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপপরিচালক এ কে এম আমিনুল ইসলাম বলেন, নিঝুম দ্বীপ ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রে প্রয়োজনীয় জনবলের অনুমোদন নেই। তাঁর হাতেও নতুন জনবল দেওয়ার এখতিয়ার নেই। কেন্দ্রীয়ভাবে জনবলের অনুমোদন হলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।
স্থানীয়দের মতে, দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত নিঝুম দ্বীপের মানুষের জন্য একটি হাসপাতাল এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং মৌলিক প্রয়োজন। একটি এলাকার মানুষকে পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত রেখে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
নিঝুম দ্বীপে আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ৩০ শয্যাবিশিষ্ট একটি হাসপাতাল স্থাপনের দাবিতে বিভিন্ন সময় মানববন্ধন ও নানা কর্মসূচি পালন করেছেন স্থানীয়রা।
সাবেক ইউপি প্রশাসনিক সদস্য তাজুল ইসলাম বলেন, নিঝুম দ্বীপ থেকে উপজেলা ও জেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দূরত্ব অনেক বেশি। বিশেষ করে দরিদ্র ও অসহায় গর্ভবতী নারীদের চিকিৎসার জন্য এত দূরের পথ পাড়ি দেওয়া অত্যন্ত কষ্টকর। মানুষের জীবন রক্ষায় এখানে অন্তত ৩০ শয্যার একটি হাসপাতাল জরুরি।
নামার বাজারের সভাপতি আবুল কালাম আজাদ বলেন, মৎস্য পেশার সঙ্গে জড়িত দ্বীপের মানুষ সরকারি চিকিৎসাসেবা থেকে অনেকটাই বঞ্চিত। গুরুতর অসুস্থ রোগীকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার সময় যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তা অত্যন্ত অমানবিক। অনেক সময় চোখের সামনে রোগীর মৃত্যু দেখেও অসহায় হয়ে থাকতে হয়। নিঝুম দ্বীপে একটি হাসপাতাল হলে এখানকার হাজার হাজার মানুষ উপকৃত হবে।
নিঝুম দ্বীপে একটি পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের কথা ২০২৪ সালে জানিয়েছিলেন নোয়াখালীর তৎকালীন সিভিল সার্জন ডা. মাসুম ইফতেখার। সে সময় স্বাস্থ্য বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নিঝুম দ্বীপ পরিদর্শনও করেছিলেন বলে জানা যায়।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, সেই উদ্যোগের বাস্তব প্রতিফলন এখনো দেখা যায়নি। ফলে দীর্ঘদিন ধরে একটি পূর্ণাঙ্গ হাসপাতালের প্রত্যাশায় রয়েছেন দ্বীপের বাসিন্দারা।
এ বিষয়ে নোয়াখালী জেলা সিভিল সার্জন ডা. আনোয়ার হোসেন বলেন, নিঝুম দ্বীপের মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পাক এটি আমরাও চাই। দ্বীপবাসীর স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে কী কী করা প্রয়োজন, সে বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হবে।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে নিঝুম দ্বীপ দেশের পর্যটন মানচিত্রে গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে নিলেও এখানকার মানুষের মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা এখনো অনিশ্চিত। প্রায় ৪০ হাজার মানুষের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল না থাকায় প্রতিদিনই ঝুঁকি নিয়ে চিকিৎসাসেবা নিতে হচ্ছে তাদের।