শামীম আহমেদ জয়, মতলব উত্তর প্রতিনিধি
প্রকাশ : ১৪ মার্চ ২০২৬ রাত ০৮:৪১:২৪
মতলবে কৃষকের মৃত্যুকে পুঁজি করে মিথ্যা মামলা ও ইভটিজিংয়ের নাটক!
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ঘটনার সূত্রপাত জাকির হোসেনের ছোট ভাই হোসেনকে ঘিরে। হোসেন জনৈক ফাহিমের শ্বশুরের কাছ থেকে একটি মোবাইল ফোন কেনেন, যার টাকা দীর্ঘদিন ধরে পরিশোধ করছিলেন না। গত ৮ ফেব্রুয়ারি দুপুরে পাওনা টাকা চাইতে গেলে তিনি টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানান এবং উল্টো দুর্ব্যবহার করেন।
এ ঘটনার জেরে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি নিশ্চিন্তপুর বাজারে ইফতারের পর সালাউদ্দিনের দোকানের সামনে মেহেদী, সাফিন ও পারভেজের সঙ্গে হোসেনের বাকবিতণ্ডা হয়। এ সময় জাকির হোসেন মধ্যস্থতা করতে এলে দুই পক্ষের মধ্যে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে হাতাহাতি হয়। পরে স্থানীয় লোকজন দ্রুত বিষয়টি মীমাংসা করে দেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, সেখানে কোনো গুরুতর মারামারি বা জখমের ঘটনা ঘটেনি।
সেদিন রাত ৮টা ৩৫ মিনিটে জাকির হোসেন মতলব উত্তর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স-এর জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নেন। হাসপাতালের রেজিস্টারে উল্লেখ রয়েছে, তার পায়ে সামান্য আঘাত ছিল এবং প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাকে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
এদিকে স্থানীয়দের ভাষ্য, রমজান মাসে স্কুল বন্ধ থাকা সত্ত্বেও ‘স্কুলে যাওয়া-আসার পথে ইভটিজিং’ অভিযোগটি কীভাবে উঠল—তা নিয়ে এলাকায় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তুচ্ছ পাওনা টাকার ঘটনাকে আড়াল করতে এবং প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে হোসেন তার ভাতিজিকে (জাকিরের মেয়েকে) সামনে এনে থানায় ইভটিজিংয়ের মামলা করেন।
এ বিষয়ে নিশ্চিন্তপুর উচ্চ বিদ্যালয়-এর প্রধান শিক্ষক মো. আরিফ উল্লাহ বলেন, ইভটিজিং সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ তার কাছে আসেনি। তাছাড়া রমজান মাসে স্কুল বন্ধ থাকায় এ ধরনের ঘটনার সুযোগও ছিল না।
পারিবারিক ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার কয়েকদিন পর জাকির হোসেন নিশ্চিন্তপুর পূর্ব বাজারে একটি দোকান থেকে এক বস্তা সার কিনে নিজেই মাথায় করে বাড়ি নিয়ে যান। বাড়িতে পৌঁছানোর পর তিনি ঘাড় ও মাথায় তীব্র ব্যথা অনুভব করেন।
পরে স্বজনরা তাকে আবার মতলব উত্তর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স-এ নিয়ে গেলে চিকিৎসক জানান, অতিরিক্ত পরিশ্রম বা চাপের কারণে তিনি ব্রেইন স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছেন। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে প্রথমে কুমিল্লার একটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং সেখান থেকে পরে ঢাকায় পাঠানো হয়। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-এ চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার (৩ মার্চ) তার মৃত্যু হয়। চিকিৎসা সংক্রান্ত নথিতেও মৃত্যুর কারণ ব্রেইন স্ট্রোক উল্লেখ রয়েছে।
এলাকাবাসীর দাবি, জাকির হোসেনের স্বাভাবিক মৃত্যুকে পুঁজি করে একটি কুচক্রী মহল রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার চেষ্টা করছে। নিশ্চিন্তপুর স্কুলের জমি সংক্রান্ত পুরনো বিরোধের জেরে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয় এমন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ইভটিজিং ও হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে একই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া দুটি মামলার তথ্যে বড় ধরনের অসংগতি রয়েছে বলে স্থানীয়রা দাবি করেছেন। প্রথম মামলায় অভিযুক্ত ছয়জনের মধ্যে যিনি প্রধান আসামি ছিলেন, দ্বিতীয় মামলায় তাকে ১১ নম্বর আসামি করা হয়েছে—যা মামলার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
কৃষক জাকির হোসেনের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে মতলব উত্তর থানা-এ দায়ের করা হত্যা মামলায় মতলব উত্তর উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক মনছুর আলম ইমনসহ কয়েকজন ব্যবসায়ীর নাম আসামি তালিকায় রয়েছে। এছাড়া ইভটিজিংয়ের অভিযোগে আয়নুল কবির ফটিক ও তার ছেলে সাফিন শিকদারকেও আসামি করা হয়েছে। এলাকাবাসীর প্রশ্ন, বাবা ও ছেলে কীভাবে একই ঘটনায় স্কুলপড়ুয়া মেয়েকে উত্ত্যক্ত করার অভিযোগে জড়িত হতে পারেন।
এলাকাবাসীর দাবি, প্রকৃত ঘটনা তদন্ত করে নিরীহ ছাত্র, প্রবাসী ও ব্যবসায়ীদের হয়রানি বন্ধ করা হোক এবং যারা মিথ্যা মামলা ও গুজব ছড়িয়ে এলাকায় বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে তাদের আইনের আওতায় আনা হোক।
এ বিষয়ে মামলার বাদী জসিম মিয়াজী বলেন, “আমার ভাইকে হত্যা করা হয়েছে। আমরা এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।”
অন্যদিকে মোহাম্মদ কামরুল হাসান বলেন, নিহতের বড় ভাই জসিম মিয়াজী বাদী হয়ে থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্ত শেষে ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করা হবে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।