প্রযুক্তি গ্রহণে উৎপাদন ব্যয় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে, দরকার সরকারি সহায়তা: প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৬ মে ২০২৬ রাত ০৯:৫০:৫৬
‘ন্যানোটেকনোলজি ছাড়া টেকসই টেক্সটাইল শিল্প গড়া কঠিন’
বাংলাদেশের টেক্সটাইল শিল্পকে টেকসই, পরিবেশবান্ধব এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষম রাখতে ন্যানোটেকনোলজির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব। তিনি বলেছেন, টেক্সটাইল ওয়েট প্রসেসিং খাতে অতিরিক্ত পানি ও রাসায়নিক ব্যবহারের কারণে পরিবেশ ও পানিসম্পদের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হচ্ছে। এই সংকট মোকাবিলায় ন্যানোটেকনোলজি গুরুত্বপূর্ণ সমাধান হতে পারে। তবে এই প্রযুক্তি চালু করতে প্রাথমিক পর্যায়ে উৎপাদন ব্যয় প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে, তাই সরকারকে শিল্পখাতের পাশে দাঁড়াতে হবে।
শনিবার (১৬ মে) বিকেলে রাজধানীর রমনায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশ (আইইবি) সদর দপ্তরের কাউন্সিল হলে আয়োজিত ‘সাসটেইনেবল টেক্সটাইল ওয়েট প্রসেসিং থ্রু ন্যানোটেকনোলজি: ইন্ডাস্ট্রিয়াল অপরচুনিটিজ অ্যান্ড চ্যালেঞ্জেস’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। আইইবির টেক্সটাইলকৌশল বিভাগ এ সেমিনারের আয়োজন করে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের টেক্সটাইল শিল্প শুধু পোশাক উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শিল্পায়নে এ খাতের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে উৎপাদনের দিক থেকে বাংলাদেশের টেক্সটাইল শিল্প বিশ্বের দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে, যা দেশের জন্য গৌরবের বিষয়।
তবে তিনি বলেন, টেক্সটাইল খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো অতিরিক্ত পানি ব্যবহার। বিশেষ করে ডাইং, ওয়াশিং ও ফিনিশিং প্রক্রিয়ায় বিপুল পরিমাণ পানি ব্যবহৃত হয়, যা পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। “ন্যানোটেকনোলজির ব্যবহার বাড়ানো গেলে পানির অপচয় কমবে, রাসায়নিক ব্যবহার হ্রাস পাবে এবং উৎপাদন আরও পরিবেশবান্ধব হবে,” বলেন তিনি।
হাবিবুর রশিদ হাবিব আরও বলেন, প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে প্রকৌশলীদের শুধু চাকরির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; গবেষণা ও উদ্ভাবনের প্রতি আরও মনোযোগী হতে হবে। কারণ গবেষণা ও নতুন প্রযুক্তি উন্নয়নের মাধ্যমেই শিল্পখাত আধুনিক ও প্রতিযোগিতামূলক হবে।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন আইইবির টেক্সটাইলকৌশল বিভাগের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মহিউদ্দিন আহমেদ সেলিম।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রকৌশলী সানজিদা ইসলাম তুলি বলেন, দেশের টেক্সটাইল শিল্পে বিপুল পরিমাণ পানি ও রাসায়নিক ব্যবহারের কারণে পরিবেশ দূষণের ঝুঁকি বাড়ছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন, পানি পুনর্ব্যবহার এবং গ্রীন এনার্জির ব্যবহার বাড়ানোর মাধ্যমে টেক্সটাইল শিল্পকে আরও পরিবেশবান্ধব করা সম্ভব বলে তিনি মত দেন।
এসোসিয়েশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ (অ্যাব)-এর আহ্বায়ক প্রকৌশলী শাহরিন ইসলাম তুহিন বলেন, উন্নত দেশগুলো টেক্সটাইল খাতের আয়ের একটি বড় অংশ গবেষণা ও উন্নয়নে ব্যয় করায় তারা নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও উৎপাদন ব্যয় কমাতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশেও আধুনিক টেক্সটাইল গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
আইইবির প্রেসিডেন্ট ও রাজউকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোহাম্মদ রিয়াজুল ইসলাম (রিজু) বলেন, টেক্সটাইল খাতকে গবেষণাভিত্তিক শিল্পে রূপান্তর করতে প্রথম ধাপে বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক গবেষণা কেন্দ্র গড়ে তোলা প্রয়োজন। পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়ে একটি আধুনিক টেক্সটাইল গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার দাবি জানান তিনি।
বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব টেক্সটাইলের (বুটেক্স) উপাচার্য অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী মো. জুলহাস উদ্দিন বলেন, টেক্সটাইল শিল্পের রাসায়নিকযুক্ত বর্জ্য যথাযথভাবে পরিশোধন ছাড়া পরিবেশে ফেলা হলে তা নদী, খাল ও ভূগর্ভস্থ পানির জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর বর্জ্য পরিশোধন ব্যবস্থা (ইটিপি) নিশ্চিত করা জরুরি বলেও তিনি মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে তিনি স্মরণ করেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উদ্যোগেই দেশে ১৯৭৮ সালে টেক্সটাইল বিষয়ে স্নাতক শিক্ষা কার্যক্রম চালুর ভিত্তি তৈরি হয়েছিল।
স্বাগত বক্তব্যে আইইবির সম্মানী সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী মো. সাব্বির মোস্তফা খান বলেন, দেশের টেক্সটাইল খাত বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করলেও সুতা, কাপড়, কেমিক্যাল ও যন্ত্রাংশ আমদানির কারণে সেই আয়ের বড় অংশ বিদেশে চলে যাচ্ছে। তাই কাঁচামাল উৎপাদনে দেশীয় সক্ষমতা বাড়াতে গবেষণা ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের বিকল্প নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বুটেক্সের ওয়েট প্রসেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী ইমানা শাহরিন তানিয়া। তিনি বলেন, ওয়েট প্রসেসিং খাতে অতিরিক্ত পানি, জ্বালানি ও রাসায়নিক ব্যবহার কমিয়ে পরিবেশবান্ধব উৎপাদন নিশ্চিত করতে ন্যানোটেকনোলজি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন প্রকৌশলী মো. মুস্তফা-ই-জামান, সম্পাদক, টেক্সটাইলকৌশল বিভাগ, আইইবি। শেষে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন বিভাগের ভাইস চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. সায়েদুর রহমান।