জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রধানমন্ত্রী
শাফি উদ্দিন আহমদ, জাতিসংঘ সদর দপ্তর নিউইয়র্ক থেকে
প্রকাশ : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সকাল ০৪:২৫:৪২
মারণাস্ত্র নয়, বিশ্ব বদলাবে কূটনীতি-মানবতায়
মারণাস্ত্র নয়, যুক্তি-তর্ক, কূটনীতি, শিক্ষা ও মানবতাকে বিশ্ব পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে দেখতে চায় বাংলাদেশ। একই সঙ্গে আজকের ডিজিটাল বিভাজন যেন আগামী দিনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিভাজনে পরিণত না হয়—এমন আহ্বানও জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে তিনি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রূপান্তর, ৩১ দফা কর্মসূচি এবং বিশ্বশান্তি থেকে শুরু করে জলবায়ু, রোহিঙ্গা সংকট, অভিবাসন, শিক্ষা ও প্রযুক্তি নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন।
বৃহস্পতিবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যেকোনো সংঘাতের সমাধান আলোচনা, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই হওয়া উচিত। রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তি হতে হবে সমতা, ন্যায্যতা, পারস্পরিক স্বার্থরক্ষা, সম্মান ও মর্যাদা।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ এমন একটি শান্তিময় ও মানবিক বিশ্ব চায়, যেখানে মারণাস্ত্রের পরিবর্তে যুক্তি-তর্ক, কূটনীতি, শিক্ষা ও মানবতা পরিবর্তনের হাতিয়ার হয়ে উঠবে। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধাশীল একটি সমঝোতামূলক বিশ্ব সমাজ প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘকে কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দেখতে চায় বাংলাদেশ।
৩১ দফায় নতুন বাংলাদেশের রূপরেখা
ভাষণে প্রধানমন্ত্রী দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক রূপান্তরের কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, নাগরিকদের ক্ষমতাহীন রেখে কোনো রাষ্ট্র শক্তিশালী হতে পারে না। জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করে সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর ও কল্যাণমূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। তার ভাষণে উঠে আসে ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের আগে জনগণের কাছে দেওয়া ৩১ দফা কর্মসূচির বিষয়টি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার এসব কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে চলেছে।
তারেক রহমান বলেন, জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যের ‘কেউ পিছিয়ে থাকবে না’ নীতির সঙ্গে ৩১ দফা কর্মসূচির ৭৩ শতাংশ কার্যক্রমের সরাসরি এবং ২৭ শতাংশের পরোক্ষ মিল রয়েছে।
অর্থনৈতিক বৈষম্য কমাতে ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার্স কার্ড, স্পোর্টস কার্ড ও ই-হেলথ কার্ডের মতো কর্মসূচির কথা তুলে ধরেন তিনি। পরিবার প্রধান নারীর নামে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়াকে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের একটি মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করে এসব কার্ড সমন্বিত করে ভবিষ্যতে ইউনিভার্সাল কার্ড চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান।
রোহিঙ্গা সংকটে আন্তর্জাতিক সহায়তার আহ্বান
ভাষণে বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘদিনের রোহিঙ্গা সংকটও গুরুত্ব পায়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের সংকটের চূড়ান্ত সমাধানে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃঢ় ও কার্যকর সমর্থন প্রয়োজন।
মিয়ানমারে তাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত জীবন রক্ষাকারী মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দেন।
জলবায়ু ন্যায্যতার দাবি
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশকে বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান তুলনামূলক কম হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি বাংলাদেশকে বহন করতে হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
এ অবস্থায় জলবায়ু ন্যায্যতা, জলবায়ু অর্থায়ন ও অভিযোজন সহায়তার ক্ষেত্রে কপ-৩১ সম্মেলন থেকে আরও জোরালো বৈশ্বিক পদক্ষেপ প্রত্যাশা করেন তিনি।
‘ডিজিটাল বিভাজন যেন এআই বিভাজন না হয়’
প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তির বৈষম্য নিয়ে সতর্কবার্তা। তিনি বলেন, আজকের ডিজিটাল বিভাজন যেন আগামী দিনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিভাজনে পরিণত না হয়। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে সাশ্রয়ী প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দ্রুত সম্প্রসারণের সুফল যাতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগানো যায়, সে জন্য জাতিসংঘের একটি কার্যকর নীতিমালা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
শিক্ষায় ৫ শতাংশ জিডিপির লক্ষ্য
দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নে শিক্ষাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। তার ভাষণে বলা হয়, দেশের ইতিহাসে এবার শিক্ষাখাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে শিক্ষাখাতে জিডিপির ৫ শতাংশ ব্যয় করার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
কারিগরি ও ব্যবহারিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়ে কর্মমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়।
নারী ও তরুণদের এগিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার
নারীর শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরিকে সরকারের অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য নগদ অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণের কথা জানান তিনি। স্নাতক পর্যন্ত নারীদের বিনাবেতনে শিক্ষার সুযোগের কথাও ভাষণে উল্লেখ করা হয়।
ভাষণের শেষাংশে প্রধানমন্ত্রী এমন একটি বাংলাদেশের স্বপ্ন তুলে ধরেন, যেখানে তরুণরা নির্বিঘ্নে নিজেদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ পাবে, নারীরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জীবন পরিচালনা করতে পারবেন এবং শিশুরা নিজেদের সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ পাবে।
তার ভাষায়, সর্বোপরি এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে জনগণ নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ জীবনযাপনের নিশ্চয়তা পাবে। এ লক্ষ্যকে তিনি ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ এবং ‘সবার জন্য বাংলাদেশ’—এই দুই স্লোগানে তুলে ধরেন।
বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের নীতি ও মূল্যবোধের প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে বক্তব্য শেষ করেন প্রধানমন্ত্রী।