রুহুল আমিন কিবরিয়া বগুড়া জেলা প্রতিনিধি
প্রকাশ : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ রাত ০৬:০৫:৪৭
স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও হয়নি জয়শিং ফেরিঘাটে সেতু
বগুড়ার ধুনট উপজেলার নিমগাছি ইউনিয়নের জয়শিং ফেরিঘাটে বাঙালি নদীর ওপর সেতু নির্মাণের দাবি দীর্ঘদিনের। স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও সেই দাবি পূরণ হয়নি। ফলে প্রতিদিন নদী পারাপারে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন ধুনট, নিমগাছি, চিকাশী,কালারপাড়া, সোনাহাটা, জয়সিং, মাজবাড়ি, ধামাচামা,সাতবেকি, ঝিনায়,নাংলু,ফরিদপুর, পিড়াপাট, বাগবাড়ি ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকার হাজারো মানুষ। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে ফেরিঘাটকেন্দ্রিক ভোগান্তি চরম আকার ধারণ করে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, জয়শিং ফেরিঘাট দিয়ে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ ও যানবাহন বাঙালি নদী পারাপার করে। কিন্তু সেতু না থাকায় যাত্রীদের ফেরির জন্য অপেক্ষা করতে হয়। কখনো নদীতে পানি বৃদ্ধি, বৈরী আবহাওয়া কিংবা ফেরি চলাচলে বিঘ্ন ঘটলে দীর্ঘ সময় আটকে থাকতে হয় দুই পাড়ের মানুষকে।
রোগী নিয়ে বিপাকে স্বজনরা
সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েন গুরুতর অসুস্থ রোগী ও তাদের স্বজনরা। স্থানীয়দের অভিযোগ, জরুরি রোগী নিয়ে ফেরিঘাটে এসে ফেরির অপেক্ষায় থাকতে হয়। অনেক সময় নদী পার হতে বিলম্ব হওয়ায় চিকিৎসার জন্য বগুড়া শহর বা ধুনট উপজেলা সদরে পৌঁছাতে অতিরিক্ত সময় লাগে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, জয়শিং ফেরিঘাটে সেতু নির্মাণ হলে জরুরি রোগী পরিবহন, অ্যাম্বুলেন্স চলাচল এবং চিকিৎসাসেবা গ্রহণ অনেক সহজ হবে।
কৃষকের উৎপাদিত পণ্যেও বাড়ছে খরচ
এ অঞ্চলের মানুষের বড় একটি অংশ কৃষিনির্ভর। ধান, সবজি, মাছসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য উৎপাদনের পর তা বগুড়া, ধুনট ও আশপাশের বাজারে নেওয়া হয়। ফেরিঘাট পারাপারে সময় ও অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয় যুক্ত হওয়ায় কৃষকরা ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
তাদের ভাষ্য, সেতু নির্মাণ হলে কৃষিপণ্য দ্রুত বাজারজাত করা সম্ভব হবে। এতে একদিকে পরিবহন খরচ কমবে, অন্যদিকে কৃষকরাও পণ্যের ভালো দাম পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
শিক্ষার্থী ও চাকরিজীবীদের প্রতিদিনের ভোগান্তি
জয়শিং ফেরিঘাটের ওপর নির্ভরশীল এলাকার অনেক শিক্ষার্থী প্রতিদিন স্কুল-কলেজ ও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করেন। ফেরির জন্য অপেক্ষা করতে গিয়ে অনেক সময় তাদের ক্লাসে পৌঁছাতে দেরি হয়।
একইভাবে চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে প্রতিদিন নদী পারাপারে সময় ব্যয় করতে হয়। স্থানীয়দের মতে, সেতু না থাকায় শুধু যাতায়াতের সমস্যা নয়, মানুষের কর্মঘণ্টাও নষ্ট হচ্ছে।
বাণিজ্যেও প্রভাব
ফেরিঘাটকেন্দ্রিক যোগাযোগব্যবস্থার কারণে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যেও প্রভাব পড়ছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। পণ্যবাহী যানবাহনকে ফেরির ওপর নির্ভর করতে হওয়ায় অনেক সময় পণ্য পরিবহনে বিলম্ব হয়। এতে ব্যবসায়ীদের পরিবহন ব্যয় ও সময় দুটিই বাড়ে।
বিশেষ করে কৃষিপণ্য, মাছ ও দ্রুত নষ্ট হয় এমন পণ্য পরিবহনে এই সমস্যা আরও প্রকট হয়ে ওঠে।
২১ বছর আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০০৫ সালে নিমগাছি ইউনিয়নের সোনাহাটা কলেজ মাঠে এক জনসভায় তৎকালীন বিএনপির সিনিয়র নেতা তারেক রহমান উপস্থিত হন। সে সময় স্থানীয়রা জয়শিং ফেরিঘাটে সেতু নির্মাণের জোরালো দাবি জানান।
জনসভা শেষে তিনি পায়ে হেঁটে জয়শিং ফেরিঘাট এলাকায় যান। স্থানীয়দের নদী পারাপারের দুর্ভোগের কথা শুনে সেখানে একটি লোহার ফেরি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এরপর থেকেই ঘাটটি ‘জয়শিং ফেরিঘাট’ নামে পরিচিতি পায় বলে স্থানীয়রা জানান।
সেসময় দ্রুত সেতু নির্মাণের আশ্বাসও দেওয়া হয়েছিল বলে স্থানীয়দের দাবি। কিন্তু এরপর কেটে গেছে প্রায় ২১ বছর। এখনও সেতুর দেখা মেলেনি।
বাইপাস পরিকল্পনাও বাস্তবায়ন হয়নি
স্থানীয় সূত্রের দাবি, বিএনপি সরকারের সময় বগুড়া শহরের বাইপাস সড়ক থেকে বাগবাড়ি, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের বাড়ির সামনে দিয়ে জয়শিং ফেরিঘাট হয়ে ধুনট ও সিরাজগঞ্জের যমুনা সেতুর সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের একটি বিকল্প যোগাযোগপথের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল।
পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বাগবাড়ি থেকে জয়শিং ফেরিঘাট পর্যন্ত কিছু জমি অধিগ্রহণ এবং সড়ক প্রশস্ত করার কাজও হয়েছিল বলে স্থানীয়রা জানান। তবে পরবর্তী সময়ে সেই পরিকল্পনা আর বাস্তবায়িত হয়নি।
স্থানীয়দের মতে, ওই বিকল্প সড়কপথ ও জয়শিং ফেরিঘাটে সেতু নির্মাণ করা হলে বগুড়া থেকে ঢাকার দূরত্ব প্রায় ২২০ কিলোমিটার থেকে কমে প্রায় ১৬০ কিলোমিটারে নামিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হতো। এতে প্রায় ৬০ কিলোমিটার পথ কমে যেত।
‘আর কত অপেক্ষা?’
দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের অবসানে এখন জয়শিং ফেরিঘাটে সেতু নির্মাণের দাবি আরও জোরালো হয়েছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, বর্তমান সরকার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করবে এবং দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেবে।
তাদের ভাষ্য, একটি সেতু নির্মাণ হলে শুধু নদী পারাপারের দুর্ভোগই কমবে না—কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও এই অঞ্চলের মানুষের নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলবে।
দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রতিশ্রুতির অপেক্ষায় থাকা স্থানীয়দের এখন একটাই প্রশ্ন—জয়শিং ফেরিঘাটে সেতুর সেই প্রতীক্ষিত নির্মাণকাজ শুরু হবে কবে?
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী, তারেক রহমানের, দেওয়া সে সময়ে পাড়াপারের জন্য লোহার ফেরি থাকলেও কোন এক অজানা কারণে সেটিও নেই কোথাই কিভাবে গায়েব হয়ে গিয়েছে সেটিও জানেনা এলাকাবাসীর।