বাবুল আকতার, ভাঙ্গুড়া (পাবনা) প্রতিনিধি
প্রকাশ : ৩০ জুন ২০২৬ রাত ০৬:০১:০২
অশ্রুসিক্ত বিদায়ে সম্মানিত হলেন প্রবীণ শিক্ষক মাওলানা মনিরুজ্জামান
দীর্ঘ ৪০ বছরের বর্ণাঢ্য শিক্ষকতা জীবনের অবসান ঘটিয়ে অবসরে গেলেন পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলার দুধবাড়িয়া দাখিল মাদ্রাসার প্রবীণ শিক্ষক মাওলানা মনিরুজ্জামান। তাঁর অবসর উপলক্ষে আয়োজিত বিদায়ী সংবর্ধনা ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান পরিণত হয় এক আবেগঘন মিলনমেলায়। শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতায় অনুষ্ঠানের বিভিন্ন মুহূর্তে উপস্থিত শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অতিথিদের চোখে অশ্রু দেখা যায়।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) সকাল ১০টায় দুধবাড়িয়া দাখিল মাদ্রাসার মিলনায়তনে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতিতে প্রাঙ্গণ মুখরিত হয়ে ওঠে। বহু বছর পর প্রিয় শিক্ষকের সঙ্গে দেখা করে স্মৃতিচারণায় মেতে ওঠেন তাঁর অসংখ্য শিক্ষার্থী।
পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন আব্দুল মতিন এবং সঞ্চালনা করেন ক্রীড়া শিক্ষক শামসুজ্জামান বাবু।
স্বাগত বক্তব্যে মাদ্রাসার সুপার আব্দুল জব্বার বলেন, “একজন শিক্ষক শুধু পাঠদান করেন না, তিনি একটি প্রজন্ম গড়ে তোলেন। মাওলানা মনিরুজ্জামান দীর্ঘ চার দশক ধরে নিষ্ঠা, সততা ও আন্তরিকতার সঙ্গে সেই দায়িত্ব পালন করেছেন।”
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন সহকারী সুপার মাওলানা মেহেদী হাসান, ইংরেজি শিক্ষক সাইফুল ইসলাম, কৃষি শিক্ষক হাফিজুর রহমান, গণিত শিক্ষক আক্কাস, আনিসুর রহমান, আরবি শিক্ষক আমেনা ও খোদেজা, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আব্দুর রাজ্জাক, তৌহিদুল ইসলাম, আবু বকর সিদ্দিক, নুরুল ইসলাম, প্রাক্তন শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান, বাইজিদসহ অনেকে।
বক্তারা বলেন, মাওলানা মনিরুজ্জামানের হাতে গড়ে ওঠা অসংখ্য শিক্ষার্থী আজ দেশের বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক, সাংবাদিক, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও সমাজসেবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। শিক্ষাদানের পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি এবং প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে অর্থ সংগ্রহেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
তারা আরও বলেন, একজন আদর্শ শিক্ষক সমাজের সবচেয়ে বড় সম্পদ। কর্ম, চরিত্র ও আত্মনিবেদনের মাধ্যমে মাওলানা মনিরুজ্জামান সেই মর্যাদা অর্জন করেছেন। তাঁর মতো শিক্ষকেরা আগামী প্রজন্মের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবেন।
অনুষ্ঠানের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্ত আসে, যখন প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা তাঁদের প্রিয় শিক্ষকের হাতে সম্মাননা স্মারক ও উপহার তুলে দেন। এ সময় উপস্থিত অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
সম্মাননা গ্রহণ করে অশ্রুসিক্ত নয়নে মাওলানা মনিরুজ্জামান বলেন, “আমি কোনোদিন ভাবিনি, আমার শিক্ষার্থীরা আমাকে এতটা ভালোবাসবে। আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন তোমাদের ভালোবাসা ও দোয়া।”
স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে প্রাক্তন শিক্ষার্থীরাও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। কেউ তাঁর কঠোর শাসনের কথা, আবার কেউ পিতৃতুল্য স্নেহ, মমতা ও আদর্শিক শিক্ষার কথা তুলে ধরেন।
দীর্ঘ ৪০ বছরের শিক্ষকতা জীবনে মাওলানা মনিরুজ্জামান শুধু কুরআন, আরবি ও ফিকাহ শিক্ষা দেননি; তিনি গড়ে তুলেছেন অসংখ্য সৎ, আদর্শবান ও নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ। তাঁর অবসরের মধ্য দিয়ে দুধবাড়িয়া দাখিল মাদ্রাসার একটি গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটলেও তাঁর শিক্ষা, আদর্শ ও অবদান শিক্ষার্থী ও শুভানুধ্যায়ীদের হৃদয়ে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবে।