নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১ জুলাই ২০২৬ দুপুর ১২:১৩:২৩
হলি আর্টিজানে নৃশংস হামলার ১০ বছর: শেষ হয়নি বিচার, শঙ্কা বিরজমান
রাজধানীর গুলশানে হোলি আর্টিজান বেকারিতে সংঘটিত দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে নৃশংস ও ভয়াবহ জঙ্গি হামলার ১০ বছর পূর্ণ হলো আজ। ২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে রাজধানীর গুলশানে হোলি আর্টিজান বেকারিতে হামলা চালায় একদল সশস্ত্র জঙ্গি । সেখানে তারা দেশি-বিদেশি অতিথিদের জিম্মি করে। পরে কুপিয়ে ও গুলি করে ২২ জনকে হত্যা করে ।
এ হামলার মামলা বিচারের দুই ধাপ ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এখন অপেক্ষায় রয়েছে শেষ ধাপের।
রাষ্ট্রপক্ষ বলেছে, হলি আর্টিজান হামলা শুধু বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি নৃশংস ঘটনা নয়; এ হামলায় বহু বিদেশি নাগরিকও নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। সুতরাং এ বিচারটির সঙ্গে শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় না, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও এর গুরুত্ব আছে। আমরা সে বিষয়টি বিবেচনায় রেখে আমরা উদ্যোগী হব।
২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টে হামলা চালায় নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন নব্য জেএমবির (আত্মঘাতী) সদস্যরা। দেশের ইতিহাসে অন্যতম নৃশংস এ হামলায় ৯ ইতালীয়, ৭ জাপানি, এক ভারতীয়, এক বাংলাদেশি-আমেরিকান দ্বৈত নাগরিক ও দুজন বাংলাদেশিসহ মোট ২০ জনকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় সন্ত্রাসীদের ছোড়া গ্রেনেডের আঘাতে প্রাণ হারান বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সালাউদ্দিন আহমেদ ও সহকারী পুলিশ কমিশনার রবিউল ইসলাম।
হামলার পর জিম্মি অবস্থার অবসানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে বিমান বাহিনী, নৌ বাহিনী, পুলিশ, র্যাব এবং সোয়াটের যৌথ অভিযানে কমান্ডো অভিযান ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’ এ নিহত হন পাঁচ জঙ্গি। তারা হলেন- মীর সামেহ মোবাশ্বের, রোহান ইবনে ইমতিয়াজ ওরফে মামুন, নিবরাস ইসলাম, খায়রুল ইসলাম পায়েল ও শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল।
ছাড়া বিভিন্ন সময়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের সময় নিহত হয়েছেন নব্য জেএমবির আরও ৮ সদস্য। তাদের অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আবুল হাসনাত রেজা করিমও অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পান।
এ ঘটনার মামলায় ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মজিবুর রহমান একজনকে খালাস দিয়ে সাতজনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন। বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন- জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজীব গান্ধী, আসলাম হোসেন ওরফে র্যাশ, আব্দুস সবুর খান, রাকিবুল হাসান রিগ্যান, হাদিসুর রহমান, শরিফুল ইসলাম ওরফে খালেদ ও মামুনুর রশিদ। খালাস পেয়েছেন মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজান।
পরে মৃত্যুদণ্ডাদেশ অনুমোদনের ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে আসে। আর কারাবন্দি আসামিরা আপিল করেন।
২০২৩ সালের ৩০ অক্টোবর বিচারিক আদালতের মৃত্যুদণ্ডাদেশের পরিবর্তে সাতজনকে আমৃত্যু কারাদণ্ডাদেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। সেই রায়ের রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি ২০২৫ সালের ১৭ জুন সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। এরপর আসামিরা আপিল বিভাগে আপিল করেন। যেটি শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।
অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, আমাদের দেশের যেকোনো মামলা শুনানি নিষ্পত্তি করার ক্ষেত্রে নানা রকম প্রতিবন্ধকতার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে যে আপিল বিভাগে বর্তমানে পাঁচ জন বিচারপতি আছেন এবং মামলার যে চাপ এই বিচারটির সঙ্গে শুধুমাত্র বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় না আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলেও এর একটা গুরুত্ব আছে। তো সে বিষয়টি বিবেচনা রেখে আমরা উদ্যোগী হব।
বিভিন্ন সময় তৌহিদী জনতার নামে মব তৈরি এবং সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক জঙ্গী গোষ্ঠীর পতাকার সঙ্গে মিল থাকা পতাকা নিয়ে মিছিল ভাবাচ্ছে বিশ্লেষকদের।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) নাঈম আশফাক চৌধুরী বলেন, ছোট ঘটনা বড় ঘটনার পূর্বাভাস দেয় কিনা? আমি বলব ইয়েস দেয়। সুতরাং এই ঘটনাগুলোকে হালকাভাবে নেয়ার কোনো অবকাশ নেই। ডটগুলোকে জোড়া দিতে হবে, দিয়ে কারা এর সঙ্গে সম্পৃক্ত, কারা করছে, এটা কি দেশের ভেতরে যারা আছে তারা করছে? নাকি দেশের বাইরের যারা আছে তারা তাদের ইন্ধনে দেশে যারা আছে তাদের মাধ্যমে এই কাজটা করছে? এই লিংক পুরোটাকে বের করতে হবে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে হলি আর্টিজান পরবর্তী সময়ে মাঠ পর্যায়ে উগ্রবাদীদের তৎপরতা নস্যাৎ করতে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটের পুলিশ সুপার মাহফুজুল আলম রাসেল বলেন, যেখানেই যেটা হোক না কেন আমরা প্রথমেই দেখি সেটা আমাদের আইনের আওতাভুক্ত কিনা এবং আমাদের মনিটরিং এর একটা ব্যবস্থা রয়েছে। আমরা আমাদের কার্যক্রম যাতে সুক্ষ্মভাবে সুন্দরভাবে আমরা সম্পন্ন করতে পারি সেজন্য আমরা সর্বদা কর্মরত আছি।