জয়নুল আবেদীন, নিউজ এডিটর, চ্যানেল এস
প্রকাশ : ২৩ মে ২০২৬ বিকাল ০৫:০০:০৯
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তির গুঞ্জন: শেখ হাসিনা সত্য বলেছিলো?
২০২৪ সালে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, বাংলাদেশের সেন্টমার্টিন দ্বীপ কারো কাছে ইজারা দিলে তার ক্ষমতায় থাকা সমস্যা হবে না। তবে দেশের সার্বভৌমত্ব বিসর্জন দিয়ে তিনি ক্ষমতায় যেতে চান না। অবশ্য সে সময় শেখ হাসিনার এই বক্তব্য ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দেয় মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর। তবে ৫ আগস্ট গণঅভ্যূত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এক বার্তায় শেখ হাসিনা আবারো একই দাবি করেন। বলেন, সেন্টমার্টিনের সার্বভৌমত্ব হস্তান্তর না করায় যুক্তরাষ্ট্র তাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়েছেন।
সম্প্রতি ভারতের একটি ইংরেজি দৈনিক মেরিন ইনসাইট-এ US Plans To Deploy Warships In
Bangladesh, Closer To India & China ``ভারত ও চীনের কাছাকাছি
বাংলাদেশে যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনের পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র “ এই শিরোনামে একটি প্রতিবেদন
প্রকাশের পর বিষয়টি সামনে আনেন সিনিয়র সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাসুদ কামাল।
তার ভেরিফাইড ফেসবুক পেজ কথা’তে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বিষয়ে
দুটি চুক্তির প্রস্তুতির বিষয়ে তুলে ধরেন। বলেন, এই
চুক্তি দুটির নাম যতটুকু আমরা জেনেছি সেটি হলো, সামরিক তথ্যের সাধারণ নিরাপত্তা
চুক্তি যেটিকে সংক্ষেপে
ইংরেজিতে বলা হচ্ছে GSOMIA- General Security of Military Information Agreement । আরেকটি
হলো অধিগ্রহণ এবং পারস্পরিক সেবা চুক্তি যেটি ACSA- The Acquisition and Cross-Servicing Agreement । এই দুটি চুক্তি স্বাক্ষরের
একদম শেষ পর্যায়ে
আছে বলে আমরা জানতে পেরেছি।
মাসুদ কামালের প্রশ্ন, এই চুক্তিটি হলে কী প্রতিক্রিয়া হতে পারে? কী ঝামেলায় বাংলাদেশ
পড়তে পারে? সে সম্পর্কে একটি ইঙ্গিত কিন্তু মেরিন ইনসাইটের নিউজের মধ্যে দেওয়া আছে। চীন এবং ভারত এটিকে সহজভাবে নাও নিতে পারে। এখন প্রশ্ন হলো চুক্তিতে
কি আছে? তিনি বলেন, আমরা চুক্তির বিষয়টি যদি বোঝার চেষ্টা করি, এই চুক্তিতে যে কথাটা বেসিক্যালি, অনেক কথার ফাঁক দিয়ে যা বলা হয়েছে, মার্কিন যুদ্ধ জাহাজ এবং সামরিক বিমানগুলো বাংলাদেশের
বন্দর এবং বিমানঘাঁটিগুলো
জ্বালানি সংগ্রহ রক্ষণাবেক্ষণ
এবং লজিস্টিক সহায়তার
জন্য ব্যবহার করতে পারবে। আমাদের নৌবন্দর, আমাদের বিমানবন্দর যুক্তরাষ্ট্র
তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী
ব্যবহার করতে পারবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের করা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে সাংবাদিক ও রাজনৈতিক এই বিশ্লেষক বলেন, এই চুক্তি
নিয়ে যখন সকল মহলে আলোচনা-সমালোচনা
চলছে, তখন সরকার ও বিরোধী দলের পক্ষ থেকে কোন উচ্চবাচ্য দেখা যাচ্ছেনা। তিনি আক্ষেপ করে
বলেন, ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা ছাড়া এ বাণিজ্য
চুক্তির বিষয়ে কোন আলোচনা করেনি সরকার ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা। সবাই চুপ, তারা
যেন কেমন একটা ভয় পাচ্ছে। তারা মনে করছে এটা নিয়ে প্রতিবাদ করার কিছু নেই। এরপর নতুন
এ দুটি প্রতিরক্ষা চুক্তি (GSOMIA–ACSA) যদি সই করা
হয়, তাহলে কি শেখ হাসিনা সত্যি হলেন, এমন প্রশ্ন তুলেছেন? অর্থাৎ ২০২৪ এর নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে শেখ হাসিনার
বক্তব্য কি সত্য হলো?
এদিকে চ্যানেল এস টেলিভিশনের সংলাপ অনুষ্ঠানে মাসুদ কামালের এমন বক্তব্যের সাথে সহমত পোষন করেন সিনিয়র সাংবাদিক মনজুরুল আলম পান্না। বলেন, শেখ হাসিনা যুক্তরাষ্ট্র কেন্দ্রিক যা যা বলেছিলেন তা অক্ষরে অক্ষরে সত্যি হচ্ছে। তিনি বলেন, শেখ হাসিনা ২৪ এর নির্বাচনের আগে দুই তিনবার বলেছিলেন, চট্টগ্রামে একটি অংশে খ্রীষ্টান রাজ্য গড়তে চায় একটি রাষ্ট্র। সেন্টমার্টিন দ্বীপে ঘাঁটি গাড়তে চায় যুক্তরাষ্ট্র। এছাড়া জিসোমিয়া ও আকসা চুক্তি নিয়ে যা যা বলেছিলেন তা আজ সত্যি হতে চলেছে। কিন্তু সে সময় আওয়ামী লীগের মন্ত্রী, এমপি ও শীর্ষ নেতাদের দুর্নীতি, নির্বাচন ব্যবস্থার অবনতির কারণে শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা ছিলো তলানিতে। তাই শেখ হাসিনার এই বক্তব্যকে নিয়ে জনগণ হাসাহাসি করেছে। তার বক্তব্যকে অবিশ্বাস্য মনে হতো। কিন্তু শেখ হাসিনার সে সময়কার বক্তব্য যে, বাস্তবসম্মত তা এখন প্রমানিত হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত জিসোমিয়া ও আকসা চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোন চূড়ান্ত মন্তব্য কিংবা সুস্পষ্ট আনুষ্ঠানিক কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি। যদিও এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউনুস সরকারের করা বাণিজ্য চুক্তিটি যাচাই বাছাই করার কথা বলেছিলেন বাণিজ্য মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মোক্তাদির। পরবর্তীতে তিনিই বলেন রাষ্ট্রের সম্পাদিত চুক্তি ইচ্ছামতো বাতিল করা যায় না। এ চুক্তি নিয়ে উদ্বেগের কিছু নেই জানিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্য চুক্তিকে পারস্পরিক স্বার্থে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এই চুক্তি নিয়ে আলোচনা সমালোচনার মধ্যেই আবার সরকার যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১৪টি বোয়িং কেনার সিদ্ধান্ত নেয়। বোয়িং কেনার বিষয়ে ১ মে মার্কিন কোম্পানী বোয়িং এর সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। ১৪টি বোয়িং বিমান কিনতে খরচ পড়বে ৪৫ হাজার কোটি টাকা। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির এক নম্বরে ছিলো এসব বোয়িং কেনার শর্ত। আর সেটাই সরকার পূরণ করে প্রমান করেছে এ বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে সরকারের বক্তব্য পরিষ্কার।
জিসোমিয়া ও আকসা চুক্তি নিয়ে বর্তমান সরকার কতটা অগ্রসর হয়েছে তা জানা যায়নি।
তবে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এ দুটি চুক্তি নিয়ে বেশ আলোচনা হয়েছিলো। ২৪ এর নির্বাচনের
আগে চুক্তি দুটি সই করার ব্যাপারে সরকারকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রস্তাবও দেয়া
হয়েছিলো বলে তখন জানিয়েছিলেন তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেন। যদিও সাংবাদিকদের
প্রশ্নের জবাবে এই চুক্তিকে বিলাসিতা উল্লেখ করে নির্বাচনের আগে চুক্তি করার ইচ্ছা
তার সরকারের নেই বলে জানান তিনি। এখন বর্তমান বিএনপি সরকার সেই দুটি চুক্তি সম্পন্ন
করবে কিনা তা হয়তো সময় বলে দেবে। আর যদি করতেই
হয়, চুক্তিগুলো স্বাক্ষর করার আগে দেশীয় বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ও জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।