এক যুগেও ফেরেননি ৭ জন
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : ৩০ আগস্ট ২০২৬ রাত ০৭:৩৩:২৯
২৪১ নেতাকর্মীর গুমের বিচার দাবি ছাত্রশিবিরের
আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের গুমের শিকার ২৪১ জন নেতাকর্মীর ন্যায়বিচার এবং এখনও নিখোঁজ সাত ছাত্রনেতার সন্ধানের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি ।
আজ (৩০ আগস্ট) দুপুর ২টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানায় তারা। “গুম ও নিপীড়নের খতিয়ান: ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণ ও গুম প্রতিরোধে কার্যকর সংস্কারের দাবি” শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন- কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক আজিজুর রহমান আজাদ, প্রচার সম্পাদক ও ডাকসু জিএস এস এম ফরহাদ, দাওয়াহ সম্পাদক হাফেজ আবু মুসা, তথ্য ও মানবাধিকার সম্পাদক তানজির হোছাইন জুয়েল, ছাত্রকল্যাণ সম্পাদক রেজাউল করিম শাকিল, আন্তর্জাতিক সম্পাদক আসিফ আব্দুল্লাহ, স্পোর্টস সম্পাদক মুশফিকুর রহমান এবং শিল্প ও সংস্কৃতি সম্পাদক জাকির হোসাইন।
এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন গুমের শিকার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থী আল মুকাদ্দাসের পিতা মাওলানা আব্দুল হালিম, গুমের শিকার হাফেজ জাকির হোসেনের ভাই জিয়াউর রহমান, গুমের শিকার রেজওয়ান হোসেনের বড় ভাই রিপন হোসেন, গুম করে ক্রসফায়ারে নিহত মহিদুল ইসলামের ভাই শহিদুল ইসলাম এবং গুম করে পায়ে গুলি করে পঙ্গু করে দেওয়া ছাত্রশিবিরের জয়পুরহাট জেলার সাবেক সভাপতি আবু যর গিফারীসহ গুম ও নির্যাতনের শিকার পরিবারের সদস্য ও ভুক্তভোগীরা।
লিখিত বক্তব্যে কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম বলেন, ২০০৯ সালে পতিত স্বৈরাচারী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই রাজনৈতিক ভিন্নমত দমনে ‘গুম’ বা ‘এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স’ এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে একটি সুপরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে প্রয়োগ করা হয়। গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি), ডি জি এফ আই, র্যাব ও সিটিটিসিসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় বিশেষায়িত বাহিনীকে ব্যবহার করে এসব গুমের ঘটনা ঘটানো হতো বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
গুম বিষয়ক তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিগত শাসনামলে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে গুমের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের ২৪১ জন নেতাকর্মী ছিলেন। এটি রাজনৈতিক পরিচয় থাকা মোট ভুক্তভোগীর ২৫ দশমিক ৪২ শতাংশ, অর্থাৎ এক-চতুর্থাংশেরও বেশি।
এই পরিসংখ্যানটি মূলত গুম কমিশনে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়ের করা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। তবে উল্লেখ করা আবশ্যক যে, বিগত দেড় দশকে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের ওপর চালানো প্রকৃত গুমের ঘটনা সাত শতাধিক। পৈশাচিক নির্যাতনের কারণে চরমভাবে ট্রমাটাইজড (মানসিকভাবে বিপর্যস্ত) হওয়া এবং ভীতি ও নিরাপত্তার কারণে দেশের বাইরে চলে যাওয়া বিপুল সংখ্যক গুম ফেরত জনশক্তির তথ্য এখনো পুরোপুরি হালনাগাদ করা সম্ভব হয়নি, যার কারণে প্রকৃত সংখ্যাটি কমিশনের রিপোর্টের চেয়েও অনেক বেশি বলে উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, তৎকালীন নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত বছরগুলোতে ১৪ হাজার ৮২৬টি রাজনৈতিক ও মিথ্যা মামলায় ছাত্রশিবিরের ১৭ হাজার ৪৬৩ জন নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তবে প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি বলে তিনি দাবি করেন।
কেন্দ্রীয় সভাপতি তাঁর বক্তব্যে গত দেড় দশকে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার আব্দুল্লাহ ওমর নাসিব শাহাদাত, ইবনুল ইসলাম পারভেজ, আনিসুর রহমান, আল মাহমুদ, আবু জর গিফারী, শামীম মাহমুদ, হাফেজ মো. জসিম উদ্দীন জিহাদ, মহিউদ্দিন সোহান এবং মো. মাইদুল ইসলামের ওপর রাষ্ট্রীয় বাহিনীর চালানো নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরেন।
একইসঙ্গে তৎকালীন জয়পুরহাট জেলা সভাপতি আবু জর গিফারী ও সেক্রেটারি ওমর আলীর পায়ে গুলি করে স্থায়ীভাবে পঙ্গু করে দেওয়ার ঘটনাও তিনি স্মরণ করেন।
নিখোঁজ সাত ছাত্রনেতার বিষয়ে নূরুল ইসলাম বলেন, ‘২৪-এর ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের পর ইতোমধ্যে দুই বছর পেরিয়ে গেলেও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক অর্থ সম্পাদক মো. ওয়ালীউল্লাহ, সাংস্কৃতিক সম্পাদক আল মুকাদ্দাস, আদাবর থানা সভাপতি হাফেজ জাকির হোসেন, বেনাপোল থানা সেক্রেটারি রেজওয়ান, বান্দরবানের জয়নাল হোসেন, ঝিনাইদহের মু. কামরুজ্জামান এবং কক্সবাজার থেকে গুম হওয়া শফিকুল ইসলামসহ ছাত্রশিবিরের সাতজন নেতাকর্মীর কোনো সন্ধান রাষ্ট্র এখনো দিতে পারেনি। আমরা অবিলম্বে এই সাতজনের বিষয়ে রাষ্ট্রের কাছে সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা এবং তাদের সন্ধান দাবি করছি।’
সংবাদ সম্মেলন থেকে ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে ছয় দফা দাবি পেশ করা হয়।
১. গুম কমিশনে দায়ের করা ছাত্রশিবিরের ২৪১ জন নেতাকর্মীর গুমের ঘটনাসহ সাত শতাধিক গুমের ঘটনা এবং এখনো নিখোঁজ সাত ছাত্রনেতাসহ সাধারণ মানুষ ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের ওপর সংঘটিত প্রতিটি গুমের ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে।
২. বিগত স্বৈরাচারী শাসনামলে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সংঘটিত প্রতিটি গুম ও হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী, নির্দেশদাতা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যেসব কর্মকর্তা ও কমান্ডারের আদেশে এসব অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, তাদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।
৩. এখনো নিখোঁজ থাকা ছাত্রনেতাদের প্রকৃত অবস্থান ও পরিণতি সম্পর্কে রাষ্ট্রকে স্পষ্ট জবাব দিতে হবে। একইসঙ্গে গুমের শিকার ভুক্তভোগী ও শহীদ পরিবারের যথাযথ পুনর্বাসন এবং আর্থিক ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে।
৪. চূড়ান্তভাবে আইন হিসেবে কার্যকর হওয়ার আগে প্রস্তাবিত ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’, ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল’ ও ‘র্যাব সংক্রান্ত বিল’ সংশোধন করে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রকৃত স্বাধীন তদন্তের নিশ্চয়তা দিতে হবে।
৫. তদন্তের দায়িত্ব এমন একটি স্বতন্ত্র ও স্বাধীন সংস্থার হাতে ন্যস্ত করতে হবে, যার নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহিতা অভিযুক্ত হতে পারে এমন যেকোনো বাহিনীর ‘চেইন অব কমান্ড’-এর সম্পূর্ণ বাইরে থাকবে। শুধু এক বাহিনী থেকে অন্য বাহিনীর কাছে তদন্তভার হস্তান্তর করাই যথেষ্ট নয়।
৬. জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগের ক্ষেত্রেও ফৌজদারি কার্যবিধির অনুরূপ ক্ষমতাসম্পন্ন নিজস্ব তদন্ত দল দিয়ে স্বাধীনভাবে তদন্তের পূর্ণ ক্ষমতা দিতে হবে। একইসঙ্গে অভিযোগ সংশ্লিষ্ট বাহিনীর কাছেই ফেরত পাঠানোর বাধ্যবাধকতা সম্পূর্ণ বাতিল করতে হবে।
বক্তব্যের শেষাংশে কেন্দ্রীয় সভাপতি উপস্থিত সাংবাদিকদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ‘গুম হওয়া এই সাতটি পরিবার আজও তাদের প্রিয় সন্তানের প্রতীক্ষায় চোখের জল ফেলছে। আল মুকাদ্দাস কিংবা মো. ওয়ালীউল্লাহর মায়েরা আজও ব্যাকুল হৃদয়ে দরজার দিকে তাকিয়ে থাকেন। আমরা চাই, আপনাদের ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে এই মজলুম পরিবারগুলোর দীর্ঘশ্বাস ও আর্তনাদ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছাক, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।’
সংবাদ সম্মেলনে গুম ও নির্যাতনের শিকার পরিবারের সদস্য এবং আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারী নেতাকর্মীরা তাঁদের দুঃসহ স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তাঁরা গুম, নির্যাতন ও হামলার শিকার হওয়ার বিভিন্ন ঘটনা বর্ণনা করে এসব ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, দায়ীদের বিচার এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর যথাযথ পুনর্বাসন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান।