নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৬ জুন ২০২৬ রাত ০৭:৪৭:৫৬
জবাবদিহিতা নিশ্চিতে বাজেট ডেলিভারি ড্যাশবোর্ড চালুসহ ৫ প্রস্তাব
জাতীয় বাজেটকে কার্যকর, জবাবদিহিমূলক এবং ফলপ্রসূ করতে ‘বাজেট ডেলিভারি ড্যাশবোর্ড’ চালুসহ পাঁচটি প্রস্তাব করেছে জাতীয় গণতান্ত্রিক আন্দোলন (এনডিএম)।
শুক্রবার (২৬ জুন) বিকেলে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে এক আলোচনা সভায় এসব প্রস্তাব করা হয়।
সভায় এনডিএমের পক্ষ থেকে বলা হয়, সরকারের উচিত একটি উন্মুক্ত ডিজিটাল ‘বাজেট ডেলিভারি ড্যাশবোর্ড’ চালু করা, যেখানে জনগণ সহজেই জানতে পারবেন— কত টাকা প্রণোদনা বিতরণ হয়েছে, কতটি শিল্পকারখানা পুনরায় চালু হয়েছে, কত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে, কতজন নারী ও তরুণ উদ্যোক্তা ঋণ পেয়েছেন, সৃজনশীল অর্থনীতির কতটি প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে, এডিপির অগ্রগতি কতদূর এবং কোন প্রকল্পে ব্যয় বা সময় বৃদ্ধি পেয়েছে। যে বাজেটের অগ্রগতি জনগণ দেখতে পারে, সেই বাজেটই প্রকৃত অর্থে জবাবদিহিমূলক বাজেট।
এনডিএমের অন্যান্য প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে— শিল্প পুনরুজ্জীবন টাস্কফোর্স গঠন, প্রণোদনা প্যাকেজের সুশাসন নিশ্চিত করা, সৃজনশীল অর্থনীতি বাস্তবায়ন ইউনিট গঠন এবং প্রতিটি সরকারি ব্যয়ের সঙ্গে কর্মসংস্থানের হিসাব যুক্ত করা।
সভায় এসব প্রস্তাব তুলে ধরেন এনডিএমের নির্বাহী সদস্য মো. শাফায়েত হাসান। তিনি বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, বাণিজ্যিক ব্যাংক, ব্যবসায়ী সংগঠন এবং শ্রমিক প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি ‘শিল্প পুনরুজ্জীবন টাস্কফোর্স’ গঠন করা উচিত।
এই টাস্কফোর্সের কাজ সম্পর্কে তিনি বলেন, সম্ভাবনাময় কিন্তু বন্ধ শিল্পকারখানা চিহ্নিত করা, সুস্পষ্ট মানদণ্ডে পুনরুজ্জীবন পরিকল্পনা গ্রহণ, কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা এবং ব্যাংকের ঋণ পুনরুদ্ধার কার্যক্রমকে সমন্বিত করা।
প্রণোদনা প্যাকেজের সুশাসন নিশ্চিত করার প্রস্তাবের বিষয়ে শাফায়েত বলেন, বাজেটের ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা কর্মসূচি যেন কোনোভাবেই অপব্যবহার বা রাজনৈতিক প্রভাবের শিকার না হয়। এজন্য প্রয়োজন সুস্পষ্ট যোগ্যতার মানদণ্ড, স্বাধীন মূল্যায়ন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, উপকারভোগীর তালিকা প্রকাশ এবং ঋণ বিতরণের পর কার্যকর তদারকি। এই তহবিলের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত— উৎপাদন বৃদ্ধি, ঋণখেলাপিদের পুনর্বাসন নয়।
সৃজনশীল অর্থনীতি বাস্তবায়ন ইউনিট গঠনের প্রস্তাবের বিষয়ে তিনি বলেন, এটি ডিজাইনার, শিল্পী, ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাতা, কারুশিল্পী, পর্যটন উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী এবং রপ্তানিকারকদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় করবে। এই ইউনিট ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রতিটি সরকারি ব্যয়ের সঙ্গে কর্মসংস্থানের হিসাব যুক্ত করার প্রস্তাবের বিষয়ে এনডিএমের এই নেতা বলেন, প্রতিটি বড় সরকারি প্রকল্প অনুমোদনের আগে একটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর থাকা উচিত—এই প্রকল্প কতটি মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে এবং কত সময়ের মধ্যে করবে? কারণ বাংলাদেশের মানুষ শেষ পর্যন্ত বাজেটকে বিচার করবে বরাদ্দের পরিমাণ দিয়ে নয়; বরং তাদের জীবনে কী পরিবর্তন এসেছে, সেই বাস্তবতা দিয়ে।
বাজেট ইতিবাচক, বাস্তবায়নে সহযোগিতার আহ্বান
প্রস্তাবিত নতুন বাজেটে কিছু ইতিবাচক দিক রয়েছে, যা দেশের অর্থনীতিকে নতুন গতিপথে নিয়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন সভার আলোচকরা। তবে বাজেট বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জও আছে বলে মনে করেন কেউ কেউ। এ কারণে বাজেট বাস্তবায়নে সবার সহযোগিতা চেয়েছেন সরকারপক্ষের প্রতিনিধিরা।
সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিএনপির সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম বলেন, আমরা সরকার গঠনের পরই বাজেট নিয়ে একটা টেনশনে ছিলাম। কিন্তু বাজেট দেওয়ার পর স্বস্তি বিরাজ করছে। কারণ বাজেট দেওয়ার পর প্রেসক্লাবের সামনে কোনো সভা বা সমাবেশ হয়নি। তাই ধরে নিয়েছি, এটি জনবান্ধব বাজেট। এটি বাস্তবায়ন সম্ভব।
বিএনপির সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য মানসুরা আক্তার বলেন, এটি সর্ববৃহৎ বাজেট। এই বাজেটের ত্রুটি বিরোধী দলের নেতারাও ধরতে পারেননি। এটি সিপিডির সম্মানিত ফেলো অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যও স্বাগত জানিয়েছেন। বাজেট বাস্তবায়নের আগে এটি সবচেয়ে বড় অর্জন।
তিনি বলেন, বাজেটে শুধু আয় ও ব্যয় দেখার বিষয় নয়; মানুষের পাশে দাঁড়ানোর বিষয়টিও দেখতে হবে। এই বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক উন্নয়নসহ সবকিছুই অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। হাতে হাত রেখে কাজ করার বিষয়গুলোও এই বাজেটে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
আরেক সংসদ সদস্য (সংরক্ষিত নারী) ব্যারিস্টার জহরত আদিব চৌধুরী বলেন, আমি আইনি পেশায় ছিলাম, তাই ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধি ছিলাম। তাদের দুঃখ-কষ্ট কিছুটা হলেও বুঝি। তবে এবার ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যবসাবান্ধব বাজেট হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আমি বিশ্লেষণ করে বলছি, কথার কথা বলছি না। আসলেই এটি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও শক্তিশালী বাজেট। এখন এটি বাস্তবায়নে সবাইকে নিজ নিজ জায়গা থেকে সহযোগিতা করতে হবে।
ইউএনডিপির জাতীয় পরামর্শক এস এম জিয়াউল হক বলেন, আসলে বাজেটে কী চাই, আমরা কিছু নীতিনির্ধারণী বিষয় দেখতে চাই। এবারের বাজেটে অনেক অন্তর্ভুক্তি দেখতে পাচ্ছি। কৃষক, নারীদের কার্ডসহ সামাজিক সুরক্ষার বিষয় রয়েছে। এগুলোর সুফল আগামীতে দেখতে পাব।
ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, বাজেটে তিনটি ঘাটতি রয়েছে। একটি বাজেট ঘাটতি, অন্যটি রাজস্ব ঘাটতি। তবে এই দুই ঘাটতি আসলে ভৌতিক ঘাটতি। কারণ যে টাকা বাইরে চলে গেছে, সেটি ধরা হলে ওই ঘাটতির কোনো অস্তিত্ব থাকত না।
তিনি আরও বলেন, তৃতীয় ঘাটতি হলো নৈতিকতা (এথিক্স) ও সুশাসনের (গুড গভর্নেন্স) ঘাটতি। আমাদের এখন একটি ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি হয়েছে। জাতির যে আকাঙ্ক্ষা, সেটি পূরণ করতে হলে এই নৈতিকতা ও সুশাসনের ঘাটতি পূরণ করতে হবে। তাহলে বাজেট বা রাজস্ব ঘাটতিও থাকবে না।
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলাম বলেন, আমরা শেয়ারবাজারের যে পরিবর্তনগুলো চেয়েছিলাম, সেগুলো বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আশা করছি, সামনে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
এনডিএমের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ব্যারিস্টার শাহদুল আজমের সভাপতিত্বে বক্তব্য দেন— ইউথ ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শফিউল আলম, সিকিউরিটি ৩৬০ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আব্দুল মতিন, এনডিপির নেতা হুমায়ুন পারভেজ খান প্রমুখ।
সভায় বক্তারা বলেন, জাতীয় বাজেট কখনোই নিখুঁত হয় না। এই বাজেটও তার ব্যতিক্রম নয়। তবে চাহিদা পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ, উন্নয়ন ব্যয়ের অংশ বৃদ্ধি, উৎপাদনমুখী প্রণোদনা, বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরুজ্জীবনের পরিকল্পনা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহায়তা, কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির প্রতি বিশেষ গুরুত্ব, সৃজনশীল অর্থনীতির নতুন দিগন্ত, ব্যাংকিং খাত সংস্কারের অঙ্গীকার, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষি কার্ড কর্মসূচি এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অধিক জবাবদিহিতা—সব মিলিয়ে এই বাজেট একটি ইতিবাচক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।
বক্তারা আরও বলেন, ঘোষণা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে না; কার্যকর বাস্তবায়নই কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। বরাদ্দ শিল্পকে সচল করে না; সুশাসন, উৎপাদনশীল ঋণ, বাজারে প্রবেশাধিকার এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনাই শিল্পকে পুনর্জীবিত করে। যোগান রপ্তানি বাড়ায় না; উদ্ভাবন, নকশা, প্রযুক্তি, দক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ব্র্যান্ডিং-ই একটি জাতিকে বিশ্ববাজারে প্রতিষ্ঠিত করে। আর ব্যাংকিং খাতেও কেবল বক্তৃতা নয়; স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, কঠোর তদারকি এবং আইনের সমান প্রয়োগই জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে।