নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : ৫ মে ২০২৬ দুপুর ০২:৫০:৪৬
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার তাগিদ
দেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ক্রমবর্ধমান চাহিদা, আমদানি-নির্ভরতা এবং বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখনই নীতিগত সংস্কার, জবাবদিহি এবং বিকল্প উৎসে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি।
ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশ (আইইবি) আয়োজিত ‘বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তা শীর্ষক সুপারিশমালা প্রণয়ন’ বিষয়ক এক কর্মশালায় এসব কথা বলা হয়। সোমবার (৪ মে) বিকেলে ঢাকার রমনায় আইইবি সদর দপ্তরের কাউন্সিল হলে এ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আইইবির ভাইস-প্রেসিডেন্ট (একাডেমিক ও আন্তর্জাতিক) প্রকৌশলী খান মনজুর মোরশেদ। তিনি বলেন, জ্বালানি খাতে পরিকল্পনাহীন সিদ্ধান্তের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। বিশেষ করে নর্থ পাওয়ার স্টেশন স্থাপনের ক্ষেত্রে যথাযথ জ্বালানি সমীক্ষা ও সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়া অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। “এ ধরনের প্রকল্প জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত,” বলেন তিনি।
স্বাগত বক্তব্যে আইইবির সম্মানী সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী মো. সাব্বির মোস্তফা খান বলেন, বর্তমানে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশই গ্যাসনির্ভর, যা প্রায় ৫০-৫৫ শতাংশ। তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনও উল্লেখযোগ্য হারে রয়েছে। কিন্তু দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে সরবরাহ কমে আসায় এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে, যা ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা এখন ২৫ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও গড় চাহিদা ১৪ থেকে ১৬ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে ওঠানামা করে। এর ফলে সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও জ্বালানি ঘাটতির কারণে অনেক কেন্দ্র পূর্ণ উৎপাদনে যেতে পারে না। “রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে, তবে জ্বালানি (ইউরেনিয়াম) আমদানিনির্ভর হওয়ায় এটিও সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত নয়,” বলেন তিনি।
কর্মশালায় উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে মালয়েশিয়াভিত্তিক প্রফেসর ড. এম শহিদুল ইসলাম বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা ৩০ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যেতে পারে। এই চাহিদা পূরণে শুধু প্রচলিত জ্বালানির ওপর নির্ভর করলে ঝুঁকি বাড়বে। তিনি জ্বালানি মিশ্রণে নবায়নযোগ্য শক্তির অংশ কমপক্ষে ২০ শতাংশে উন্নীত করার সুপারিশ করেন।
বুয়েটের কেমিকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ইকবাল হোসাইন বলেন, এলএনজি আমদানির ব্যয় গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দামের অস্থিরতার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে এবং ভর্তুকির চাপও বাড়ছে। অন্যদিকে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির উৎপাদন সীমিত হওয়ায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনও প্রত্যাশিত হারে বাড়ানো যাচ্ছে না।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামো শক্তিশালী করা জরুরি। বর্তমানে সিস্টেম লস গড়ে ৭-৮ শতাংশের মধ্যে থাকলেও তা আরও কমিয়ে আনা সম্ভব হলে বছরে বড় অঙ্কের বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে।
কর্মশালায় বক্তারা বলেন, দেশের জ্বালানি খাতে বর্তমানে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে—দেশীয় জ্বালানির ঘাটতি, আমদানিনির্ভরতা এবং মূল্য অস্থিরতা। এ পরিস্থিতিতে সৌর, বায়ু ও জলবিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য উৎসে বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি জ্বালানি দক্ষতা উন্নয়নেও গুরুত্ব দিতে হবে।
তারা আরও বলেন, সরকারি ও বেসরকারি খাতে সমন্বয়হীনতা দূর করা, প্রকল্প গ্রহণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নীতি বাস্তবায়ন ছাড়া টেকসই সমাধান সম্ভব নয়।
কর্মশালায় আরও বক্তব্য দেন বুয়েটের অধ্যাপক ড. আমান উদ্দিন, নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী হাসিবুল হাসান, বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানির মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী জাফর সাদিকসহ জ্বালানি খাতের সংশ্লিষ্টরা। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন আইইবির ভাইস-প্রেসিডেন্ট (এইচআরডি) প্রকৌশলী শেখ আল আমিন।
অনুষ্ঠানে আইইবির কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের সদস্য, বিভিন্ন প্রকৌশল সংগঠনের প্রতিনিধি এবং জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত ছিলেন।