নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৭ জুলাই ২০২৬ বিকাল ০৩:৫৭:৫০
জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড: ষড়যন্ত্রের জাল উন্মোচনে জাতীয় তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে সংঘটিত এক সামরিক অভ্যুত্থানে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ ৪৫ বছর পর, ঘটনার অন্যতম পলাতক আসামি মেজর (অব.) মোজাফফরের গ্রেপ্তারের খবর দেশের রাজনৈতিক ও সামরিক ইতিহাসে এক নতুন চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। দীর্ঘ সাড়ে চার দশক ধরে অমীমাংসিত থাকা এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত সত্য, নেপথ্যের কুশীলব এবং দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের জাল উন্মোচনের লক্ষ্যে এখন একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ‘জাতীয় তদন্ত কমিশন’ গঠনের দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে। সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছেন, ইতিহাসের এই অন্ধকার অধ্যায়ের রহস্যভেদে মেজর মোজাফফরের গ্রেপ্তার একটি ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি করেছে।
ঐতিহাসিক তথ্য ও নথিপত্র অনুযায়ী, ১৯৮১ সালের মে মাসের শেষ সপ্তাহে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে বৈঠক করতে চট্টগ্রামে যান। ৩০ মে ভোরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সেনাবাহিনীর একটি দলের অতর্কিত হামলায় তিনি নিহত হন। ঘটনার পর সরকারি বিবৃতিতে ‘বিপ্লবী পরিষদ’ নামক একটি গোষ্ঠীর কথা উল্লেখ করা হলেও, হত্যাকাণ্ডের মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে রাষ্ট্রপতির মরদেহ গোপনে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় দাফন করাসহ নানা ঘটনা সে সময় গভীর রহস্যের জন্ম দেয়। পরবর্তী সময়ে তড়িঘড়ি করে একটি সামরিক আদালতে বিচার সম্পন্ন করে কিছু কর্মকর্তার সাজা কার্যকর করা হলেও, অভ্যুত্থানে সরাসরি অংশ নেওয়া মেজর খালেদ ও মেজর মোজাফফর দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। ফলে এই হত্যাকাণ্ডের অন্তর্নিহিত সত্য ও প্রকৃত রাজনৈতিক উদ্দেশ্য (মোটিভ) চিরকালই আড়ালে থেকে যায়।
দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে পলাতক থাকা মেজর মোজাফফরের গ্রেপ্তার এখন সেই বহুপ্রতীক্ষিত সত্য উদ্ঘাটনের পথ প্রশস্ত করেছে। নির্ভরযোগ্য সূত্রের গুঞ্জন অনুযায়ী, এই দীর্ঘ সময়ে তিনি প্রতিবেশী দেশ ভারতে ‘জয় ব্যানার্জি’ ছদ্মনাম ধারণ করে দেশটির একটি গোয়েন্দা সংস্থার আশ্রয়ে আত্মগোপনে ছিলেন। এই তথ্যটি যদি সত্য হয়, তবে জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পেছনে কোনো শক্তিশালী বিদেশি শক্তির ইন্ধন বা প্রত্যক্ষ প্রভাব ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে, দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক ঘটনা হওয়া সত্ত্বেও আজ পর্যন্ত এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বেসামরিক আদালতে কোনো নিয়মিত হত্যা মামলা দায়ের না হওয়া দেশের সাধারণ জনগণের মনে দীর্ঘদিনের এক বিরাট কৌতূহল ও প্রশ্ন হিসেবে রয়ে গেছে।
এই বাস্তবতায় দেশের বিশিষ্ট নাগরিক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো ইতিহাসের সবচেয়ে সংবেদনশীল ঘটনার সত্য অনুসন্ধান করা। আর এই উদ্দেশ্য সফল করতে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একজন নিরপেক্ষ বিচারপতির নেতৃত্বে অতিসত্বর একটি ‘জাতীয় পর্যায়ের তদন্ত কমিশন’ গঠন করা জরুরি। এই কমিশনে সশস্ত্র বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (NSI), প্রতিরক্ষা ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ পুলিশের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করে একটি সমন্বিত তদন্ত চালানো আবশ্যক। একই সঙ্গে, দেশের ইতিহাসের স্বার্থে কমিশনের অনুসন্ধান শেষ না হওয়া পর্যন্ত বর্তমানে আটক মেজর মোজাফফরের বিরুদ্ধে কোনো তড়িঘড়ি বিচারিক প্রক্রিয়া বা দণ্ড কার্যকর না করার জন্য জোরালো সুপারিশ করা হচ্ছে, যেন তাঁর কাছ থেকে সর্বোচ্চ তথ্য ও জবানবন্দি সংগ্রহ করা সম্ভব হয়।