নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২২ মার্চ ২০২৬ দুপুর ০২:৪১:০২
কেমন ছিলো একাত্তরের সেই ভয়াল দিনের ঈদ
বাংলার আকাশে সেদিন উৎসবের রং নয়, ছড়িয়ে ছিল বারুদের ধোঁয়া। শহরের বাতাসে সেমাইয়ের গন্ধের চেয়ে বেশি ভেসে বেড়াচ্ছিল লাশের গন্ধ। ঢাকার রাস্তায় ছিলনা ঈদের নামাজের ঢল, ছিল অস্বাভাবিক নীরবতা। এই শহর যেন সেদিন নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিল। কোথাও কোথাও ঈদের নামাজের জন্য মানুষ জড়ো হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সেই ভিড়ে ছিল না উৎসবের স্বতঃস্ফূর্ত উচ্ছ্বাস। অনেকের চোখে ছিল ক্লান্তি, অনেকের মুখে ছিল গভীর চিন্তার ছাপ। সেবার ঈদে বহু ঘরের পুরুষ মানুষ ঘরেই ছিলনা। কেউ যুদ্ধের ময়দানে, কেউ বন্দী, কেউ বা নিখোঁজ। কত পরিবার জানেই না তাদের প্রিয়জন বেঁচে আছেন কি না। ঈদের সকালে তাই অনেক মায়েরা দরজার দিকে তাকিয়ে ছিলেন, হয়তো আজই হঠাৎ ফিরে আসবে হারিয়ে যাওয়া ছেলে। এদিকে দেশের ভেতরে যুদ্ধ চললেও দেশের বাইরে তখন ছিল আরেক ভিন্ন বাস্তবতা। লাখো মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছিল ভারতের সীমান্তবর্তী শরণার্থী।অনেক শরণার্থী শিবিরে মানুষ খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে ঈদের নামাজ পড়েছিল। কারও গায়ে পুরোনো কাপড়, কারও পায়ে জুতা নেই। কিন্তু নামাজ শেষে যখন দোয়ার সময় এলো, হাজারো হাত একসাথে উঠেছিল, একটি মাত্র প্রার্থনায়। তা হল ‘বাংলাদেশের জন্ম।‘
‘একাত্তরের দিনগুলি’ বইতে শহীদ জননী জাহানারা ইমাম ২০ নভেম্বর ১৯৭১ তারিখে ডায়েরিতে বেদনামাখা কথাগুলো লিখেছেন।
তিনি আরও লেখেন, ঈদের দিনেও যুদ্ধ থেমে থাকেনি। দেশের বিভিন্ন সীমান্তে মুক্তিযোদ্ধারা তখনও লড়াই করে যাচ্ছেন। উত্তরের সীমান্ত অঞ্চলে পাটগ্রাম সাব-সেক্টরে ক্যাপ্টেন মতিউর রহমান-এর নেতৃত্বে সেদিন মুক্তিযোদ্ধারা বোরখাতা এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর একটি শক্ত ঘাঁটির ওপর আক্রমণ চালান। কুমিল্লার রাজনগর এলাকাতেও সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়। সেখানে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর আক্রমণ চালিয়ে দুই সৈন্যকে হত্যা করে এবং কয়েকজন রাজাকারকে বন্দী করে। ঈদের দিন রাতে যশোরে গরীবপুর গ্রাম দখল করে নেওয়া হয়, এবং পরদিন পাকিস্তানি বাহিনী পাল্টা আক্রমণ চালায়। এই সংঘর্ষ পরে ইতিহাসে পরিচিত হয় ‘ব্যাটেল অব গরীবপুর’ নামে। ইতিহাসও যেন সেই প্রতিজ্ঞার জবাব দিতে দেরি করেনি। ঈদের মাত্র কয়েক সপ্তাহ পর, ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনতার সূর্যোদয় দেখেছিল।
১৯৭১ সালের নভেম্বরে মানুষ কেঁদেছে, কিন্তু বিজয়ের স্বপ্নও দেখেছে। এরকম এক মিশ্র অনুভূতির সময় হাজির হয়েছে ঈদ। কেমন ছিলো আমাদের সে সময়ে বৃহত্তর জনগোষ্ঠী মুসলিমদের ঈদ? অজানা অধ্যায় নিয়ে ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখি- “আজ ঈদ। ঈদের কোন আয়োজন নেই আমাদের বাসায়। কারো জামাকাপড় কেনা হয়নি। দরজা-জানালার পর্দা কাচা হয়নি। ঘরের ঝুল ঝাড়া হয়নি। বাসায় ঘরের টেবিলে রাখা হয়নি আতরদান। শরীফ, জামী ঈদের নামাজও পড়তে যায়নি। কিন্তু, আমি ভোরে উঠে ঈদের সেমাই, জর্দা রেঁধেছি। যদি রুমীর সহযোদ্ধা কেউ আজ আসে এ বাড়িতে? বাবা-মা-ভাই-বোন, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন কোন গেরিলা যদি রাতের অন্ধকারে আসে এ বাড়িতে? তাদেরকে খাওয়ানোর জন্য আমি রেঁধেছি পোলাও কোর্মা, কোপ্তা কাবাব। তারা কেউ এলে আমি চুপিচুপি নিজের হাতে বেড়ে খাওয়াবো। তাদের জামায় লাগিয়ে দেবার জন্য একশিশি আতরও আমি কিনে লুকিয়ে রেখেছি।”
মুক্তিযুদ্ধে ঈদ পালন করেননি মুক্তিযোদ্ধারা বরং দেশ স্বাধীন করে ‘বিজয়ের ঈদ-উৎসব’ পালনের প্রতিজ্ঞা করেছিলেন। ১৯৭১ সালে ঈদুল ফিতর ছিলো ২০ নভেম্বর। দিনটি ছিলো শনিবার। সারাদেশে চলছে সশস্ত্র যুদ্ধ। সমগ্র জাতিই তখন যুদ্ধে শামিল। এরকম ঈদ মনে হয় জাতির জীবনে আর কখনো আসেনি। আতঙ্ক, দেশ স্বাধীন করার সংকল্প, শরণার্থী শিবিরে অনিশ্চিত জীবন– এসব কিছু ঘিরেছিলো প্রতিটি মানুষের মন। রণাঙ্গনে ঈদের দিনেও পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধ সশস্ত্র সংগ্রাম চলছিলো। সারাদেশে খণ্ড খণ্ড যুদ্ধ এবং শহীদ হওয়ার ঘটনা ঘটছিলো। ভুরুঙ্গামারীতে শহীদ হয়েছিলেন বীর উত্তম আশফাকুস সামাদ।
ঈদের আগের দিন কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয় প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের মুখপত্র সাপ্তাহিক ‘জয়বাংলা’র ২৮তম সংখ্যা। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের বাণী বক্স আইটেমে। বাণীতে উল্লেখ করেন, “আমাদের দেশে এবার ঈদ এসেছে অত্যন্ত মর্মান্তিক পরিবেশে। ঈদের যে আনন্দ আজ আমরা হারিয়েছি, তা আমাদের জীবনে পুনঃপ্রতিষ্ঠা হবে সেদিনই যেদিন আমরা দেশকে শত্রুমুক্ত করব। যথাসর্বস্ব পণ করে যে স্বাধীনতা সংগ্রামে আমরা লিপ্ত, তার চূড়ান্ত সাফল্যের দিনটি নিকটতর হয়ে এসেছে। সেই মুহূর্তটিকে এগিয়ে আনার সংগ্রামে আমরা সকলে যেন নিঃস্বার্থভাবে নিজেদের নিয়োগ করতে পারি এই ঈদে তাই হোক আমাদের প্রার্থনা।”
তবে কলকাতায় ঈদের নামাজ হয়েছিলো। প্রবাসী সরকারের উদ্যোগে ঈদের নামাজের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। কলকাতার থিয়েটার রোডে মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী সচিবালয় প্রাঙ্গণে ঈদ নামাজের আয়োজন করা হয়েছিলো। নামাজে অংশ নিয়েছিলেন মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, অর্থমন্ত্রী এম মনসুর আলী, স্বরাষ্ট্র, ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রী এম কামরুজ্জামান, প্রধান সেনাপতি মোহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানী, বিমানবাহিনী প্রধান এ কে খন্দকার, অধ্যাপক ইউসুফ আলী প্রমুখ।
ঈদের দিনে রাতে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ সীমান্ত সংলগ্ন বাংলাদেশে প্রবেশ করার অভিজ্ঞতাও হয়েছিলো। সেসময়ে রণাঙ্গনের প্রধান সেনাপতি জেনারেল ওসমানীর জনসংযোগ কর্মকর্তা নজরুল ইসলামের ‘একাত্তরের রণাঙ্গন: অকথিত কিছু কথা’ গ্রন্থে মুজিবনগর সরকারের ঈদ উদযাপনের বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। সে গ্রন্থে রয়েছে-
ঈদুল ফিতর উপলক্ষে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম জাতির উদ্দেশ্যে বাণী দেন। এটি প্রচার করে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। ‘জয়বাংলা’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ২৬ নভেম্বরে। বাণীতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বলেন- “পবিত্র রমজান মাসেও হানাদার বাহিনীর বর্বরতায় বাংলাদেশের মুসলমান, হিন্দু নির্বিশেষে অসংখ্য নরনারী নিহত হচ্ছে। গত বছর আমরা বারোই নভেম্বর প্রলয়ঙ্করী ঝড়ে নিহত দশ লাখ মানুষের শোকে মুহ্যমান অবস্থায় ঈদ পালন করতে পারিনি। এবারও আমরা ইয়াহিয়ার সৈন্যদের বর্বরতায় নিহত দশ লাখ ভাইবোনের বিয়োগ বেদনা বুকে নিয়ে ঈদের জামাতে শামিল হয়েছি। কিন্তু দুঃখ-কষ্ট যাই হোক, ত্যাগের মন্ত্রে আমরা উদ্বুদ্ধ এবং যেকোনো ত্যাগের মূল্যে স্বাধীনতার ঘোষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে বদ্ধপরিকর। দেশকে শত্রুর কবল থেকে মুক্তি করার পর মাত্রই ঈদুল ফতেহ বা বিজয়ের ঈদ উৎসব পালন করবো এবং সেদিন খুব দূরে নয়, এই প্রতিশ্রুতি আমি আপনাদের দিতে পারি।”
ঈদের আগের দিন ১৯ নভেম্বর ‘এই ঈদে আমাদের প্রার্থনা হোক’ শিরোনামে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদের বাণী প্রকাশ করে ‘জয়বাংলা’ পত্রিকা। প্রধানমন্ত্রী বলেন- “আমাদের দেশে এবার ঈদ এসেছে অত্যন্ত মর্মান্তিক পরিবেশে। দখলীকৃত এলাকায় শত্রুসৈন্যের তাণ্ডব চলছে, লক্ষ লক্ষ মানুষ স্বাভাবিক জীবনযাত্রা থেকে বিচ্যুত হয়ে শরণার্থী হয়েছেন, মুক্ত এলাকায় সর্বাত্মক প্রস্তুতি চলছে শত্রুকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য, রক্তের বিনিময়ে মানুষ মাতৃভূমির স্বাধীনতা রক্ষার সংগ্রাম করছে। এবার ঈদে আনন্দ মুছে গেছে আমাদের জীবন থেকে, আছে শুধু স্বজন হারানোর শোক, দুর্জয় সংগ্রামের প্রতিজ্ঞা ও আত্মত্যাগের প্রবল সংকল্প।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এবং আমার নিজের পক্ষ থেকে ‘বাংলাদেশের জনসাধারণকে ঈদ উপলক্ষে আমি আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। ঈদের যে আনন্দ আজ আমরা হারিয়েছি, তা আমাদের জীবনে পুনঃপ্রতিষ্ঠা হবে সেদিনই, যেদিন আমরা দেশকে সম্পূর্ণরূপে শত্রুমুক্ত করব। আমি আপনাদের আশ্বাস দিচ্ছি যে, যথাসর্বস্ব পণ করে যে স্বাধীনতা সংগ্রামে আমরা লিপ্ত, তার চূড়ান্ত সাফল্যের দিনটি নিকটতর হয়ে এসেছে। সেই মুহূর্তটিকে এগিয়ে আনার সংগ্রামে আমরা সকলে যেন নিঃস্বার্থভাবে নিজেদের নিয়োগ করতে পারি, এই ঈদে তাই হোক আমাদের প্রার্থনা।”
অবরুদ্ধ ঢাকায় ঈদের সময় অবস্থান করছিলেন শিল্পী হাশেম খান। ‘২০ নভেম্বর ১৯৭১’ শিরোনামে একটি লেখায় সেদিনের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, “আজ ঈদ। আনন্দের দিন, উৎসবের দিন। কিন্তু, কী আনন্দ করবো এবার আমরা? নতুন জামা কাপড় বা পোশাক কেনা-কাটার আগ্রহ নেই! শিশু-কিশোরদের কোনো আবদার নেই, চাওয়া-পাওয়া নেই। বাড়িতে বাড়িতে কি পোলাও কোরমা ফিরনী সেমাই রান্না হবে? আমার বাড়িতে তো এসবের কোনো আয়োজন হয়নি। প্রতিটি বাঙালির বাড়িতে এরকমই তো অবস্থা।”
জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান তার ‘আমার একাত্তর’ গ্রন্থে লিখেন: ‘‘ঈদের কদিন আগে তাজউদ্দীন আমাকে ডেকে পাঠালেন। স্বভাবতই বিরাজমান পরিস্থিতি নিয়ে কথা হলো। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বিদেশ-সফরের গুরুত্ব সম্পর্কে তিনি কিছুটা ধারণা দিলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, বঙ্গবন্ধুর বিচারের ফল যাই হোক, বিশ্বজনমতের কারণেই, পাকিস্তানিরা তাঁকে হত্যা করতে পারবে না। মুক্তিযুদ্ধ যে চূড়ান্ত লক্ষের দিকে অগ্রসর হচ্ছে সে-বিষয়ে তাঁর সন্দেহ ছিল না।
কথাবার্তার শেষে উঠে গিয়ে ঘরের মধ্যে রাখা আয়রন শেলফ থেকে একটা খাম বের করে তিনি আমার হাতে দিলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম: ‘কী এটা?’ তিনি বললেন ‘সামনে ঈদ, তাই।’ খামে পাঁচশ টাকা ছিল- তখন আমার এক মাসের মাইনের সমান। আমি নিতে চাইলাম না। তিনি বললেন: ‘ঈদে আপনার বাচ্চাদের তো আমি উপহার দিতে পারি, নাকি।’ কথাটা বলতে গিয়ে তিনি নিজেই ভাবাবেগপূর্ণ হয়ে উঠেছিলেন, আমিও খুব অভিভূত হয়ে কিছু আর বলতে পারিনি।’’
‘চরমপত্র’ খ্যাত সাংবাদিক এমআর আখতার মুকুল, তার স্মৃতিচারণে বলেন, “আমরা যখন থিয়েটার রোডে পৌঁছালাম তখন কেবলমাত্র নামাজ শেষ হয়েছে। তাই প্রায় সবার সঙ্গে কোলাকুলি করলাম। এরপর সবার অশ্রুভেজা কণ্ঠে কেবল রণাঙ্গন ও ঢাকার আলাপ। প্রতি মুহূর্তে উপলব্ধি করলাম, দৈহিকভাবে আমরা মুজিবনগরে থাকলেও আমাদের মন-প্রাণ সবই পড়ে রয়েছে দখলীকৃত বাংলাদেশে। আর সেখানকার সব মানুষ তাকিয়ে আছে আমাদের সাফল্যের দিকে। বাঙালি জাতির এ রকম একাত্মতাবোধ আর দেখিনি।”
সাহিত্যিক আবু জাফর সামসুদ্দীন, ৭১ এর ঢাকায় ঈদের বর্ণনায় লিখেন, “ঈদের দিন শনিবার। যুদ্ধকালে কোন জামাত জায়েজ নয়। নামাজে যাইনি। কনিষ্ঠ পুত্র কায়েসকে সঙ্গে নিয়ে সকাল ৯টায় ছিদ্দিক বাজারের উদ্দেশ্যে বেরোলাম। রিকশায় চড়ে দেখি সড়ক জনমানবশূন্য। টেলিভিশন অফিসে যেতে রিকশা ফিরিয়ে দিল। ট্রাকে ট্রাকে টহল ও পাহারায়ও মিলিটারি — যাওয়ার সময় দেখলাম বায়তুল মোকাররম মসজিদে মিলিটারি পাহারায় ঈদ জামাত হচ্ছে– আমার জীবনে এই প্রথম ঈদের জামাতে শরিক হইনি।”
জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে যুক্তরাজ্যস্থ বাংলাদেশ ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ ও বাংলাদেশ মহিলা সমিতিসহ কয়েকটি সংগঠন। ১৬ নভেম্বর বাংলাদেশ মহিলা সমিতির একটি আবেদনপত্রে প্রবাসীদের ফেতরা টাকা মুক্তিযোদ্ধাদের প্রদান করার আহ্বান জানানো হয়। আবেদনপত্রটি ছিলো নিম্নরূপ-
BANGLADESH WOMEN’S ASSICIATION IN GREAT BRATAIN
103, Ledbury Road, London, W. II
Telephone: 01 727 6578
Ref: 2/R.
Date: 16 November, 1971
সুধী,
পবিত্র ঈদ সমাগমে প্রতিটি দেশপ্রাণ বাঙালির মন স্বভাবতই ভারাক্রান্ত। দেশ ও জাতি আজ ঘোরতর দুর্যোগের সম্মুখীন। ইয়াহিয়ার নীতি ও ধর্মজ্ঞান বিবর্জিত নৃশংস সেনাবাহিনীর অত্যাচারে জর্জরিত। অত্যাচারী এজিদ বাহিনী বাঙালি জাতির নাম পৃথিবী থেকে মুছে ফেলতে বদ্ধপরিকর। দেশের এই সংকটে আমাদের একমাত্র ভরসাস্থল মরণজয়ী জেহাদেরত মুক্তিবাহিনী ভাইরা। বাংলা ও বাঙালিকে তারা বাঁচাবেই- প্রয়োজন হলে তাঁদের জীবনের বিনিময়ে। আমাদের ঈদ ব্যর্থ হবে যদি এই পবিত্র দিনে তাদের প্রতি আমাদের কর্তব্য ভুলে যাই।
তাই যুক্তরাজ্যস্থ বাংলাদেশ মহিলা সমিতি সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবারের ফেতরার পয়সা সংগ্রহ করে মুক্তিবাহিনীর কাপড়-চোপড় ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য জিনিস খরিদ করার জন্য পাঠিয়ে দেবে। এ ব্যাপারে আমরা অনুরোধ করছি আপনাদের আন্তরিক সহযোগিতা।
আসুন ভাই ও বোনেরা, এবারের ফেতরার পয়সা মুক্তিবাহিনীর নামে বাংলাদেশ মহিলা সমিতির কাছে পাঠিয়ে দিয়ে জিহাদে শরিক হই। দানের দ্বারা দেশের প্রতি আপনার গুরুদায়িত্বের ভার কিছুটা লাঘব করুন। আপনার ঈদ সার্থক ও পবিত্রতর হোক।
জয় বাংলা।
নিবেদিকা
মিসেস বখশ
রণাঙ্গনের যোদ্ধাদের প্রেরণা যোগানোর জন্য স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ভূমিকা অনস্বীকার্য। ২০ নভেম্বর ঈদে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত হয় বিশেষ অনুষ্ঠানমালা। এতে আলোচিত ও আলোড়িত ছিল ‘চাঁদ তুমি ফিরে যাও/ দেখো মানুষের খুনে খুনে রক্তিম বাংলা/ রূপসী আঁচল কোথায় রাখবো বলো” শীর্ষক গানটি। গানটির কথা লিখেছেন শহীদুল ইসলাম, সুর করেছেন অজিত রায়, শিল্পী রূপা ফরহাদসহ আরও অনেকেই গানটি কোরাসে গেয়েছিলেন।