রাকিবুল ইসলাম, লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ : ২০ মে ২০২৬ বিকাল ০৫:৪৯:২৩
ক্রেতা কম, গরু বেশি—লোকসানের শঙ্কায় বিক্রেতারা
আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে লক্ষ্মীপুর জেলার বিভিন্ন পশুর হাটে গরুর সরবরাহ বেড়েছে। জেলার খামারগুলোতে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন খামারিরা। তবে বাজারে পর্যাপ্ত গরু থাকলেও কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় হতাশ খামারি ও বিক্রেতারা। ক্রেতাদের তুলনায় গরুর সংখ্যা বেশি থাকায় দরপতনের অভিযোগ করছেন তারা। একই সঙ্গে ভারত থেকে গরু আসতে পারে—এমন আশঙ্কাও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
লক্ষ্মীপুর সদর গরুর বাজারসহ রায়পুর উপজেলার দক্ষিণ চরবংশী, কেরোয়া, চরমোহনা এবং পৌর শহরের বিভিন্ন অস্থায়ী গরুর বাজার ঘুরে দেখা যায়, ছোট-বড় বিভিন্ন জাতের গরু নিয়ে হাটে অবস্থান করছেন খামারিরা। তবে ক্রেতাদের উপস্থিতি তুলনামূলক কম থাকায় অনেকেই দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও গরু বিক্রি করতে পারছেন না। আবার অনেকে বাধ্য হয়ে কম দামে গরু বিক্রি করছেন।
রায়পুর উপজেলার স্থানীয় গরু ব্যবসায়ী আবদুল মালেক জানান, প্রায় এক বছর ধরে একটি গরু লালন-পালন করতে তার অনেক খরচ হয়েছে। গরুর খাবার, ওষুধ ও শ্রমিকের ব্যয় আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। বিশেষ করে খড়, ভুসি, ভুট্টা ও প্রস্তুতকৃত খাদ্যের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় গরু পালন এখন অনেক ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, “যে গরুর পেছনে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে, সেখানে ক্রেতারা ১ লাখ ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকার বেশি বলছেন না। এতে লাভ তো দূরের কথা, মূলধন তুলতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে।”
লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার আরেক ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিন বলেন, “বাজারে গরু বেশি, কিন্তু ক্রেতা কম। অনেকেই মনে করছেন ভারত থেকে গরু আসবে, তাই এখন দাম কম বলছেন। এতে স্থানীয় খামারিরা ক্ষতির মুখে পড়ছেন।”
জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এবারের কোরবানির জন্য লক্ষ্মীপুর জেলায় ৯৫ হাজার ৪৭৭টি পশু প্রস্তুত করা হয়েছে। জেলার চাহিদা রয়েছে ৮৯ হাজার ২১৫টি পশুর। সে হিসেবে চাহিদার তুলনায় প্রায় ৬ হাজার ২৬২টি পশু উদ্বৃত্ত থাকবে। জেলার পাঁচটি উপজেলায় প্রায় ৩ হাজার ছোট-বড় খামারে কোরবানির পশু লালন-পালন করা হয়েছে।
রায়পুর উপজেলার খামারি নেয়ামত উল্লাহ জানান, গত কয়েক বছরে গরুর খাদ্যের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। আগে যে খাদ্য কম দামে পাওয়া যেত, এখন তা প্রায় দ্বিগুণ দামে কিনতে হচ্ছে। ফলে গরুর উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় বাজারে গরুর দামও তুলনামূলক বেশি রাখতে হচ্ছে। কিন্তু সেই দাম দিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না অনেক ক্রেতা। তাদের দাবি, দেশীয় খামারিদের সুরক্ষায় বিদেশ থেকে গরু আমদানি বন্ধ রাখা প্রয়োজন।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কয়েক বছর ধরে দেশীয় খামারিরা কোরবানির পশুর চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। কিন্তু বাজারে গুজব ও অনিশ্চয়তার কারণে অনেক সময় দাম ওঠানামা করে। এ অবস্থায় খামারিদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে।
রায়পুর উপজেলার “বাহার আলী মোল্লারহাট” গরুর বাজারে আসা ক্রেতা মনির হোসেন বলেন, “গরুর দাম এখনও অনেক বেশি মনে হচ্ছে। তাই অনেকে অপেক্ষা করছেন। ঈদের আরও কাছাকাছি গেলে দাম কিছুটা কমতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।”
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এ কে এম ফজলুল হক বলেন, “লক্ষ্মীপুরে চাহিদার তুলনায় কোরবানির পশু বেশি রয়েছে। বাইরে থেকে যাতে কোনো পশু না আসতে পারে, সে বিষয়ে আমরা সজাগ রয়েছি। খামারিদের বিভিন্ন পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া পশুর হাটে ২০টি মেডিকেল টিম কাজ করবে।”
অন্যদিকে কোরবানির পশুর হাটে নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রস্তুতি নিয়েছে জেলা পুলিশ। জেলা পুলিশ সুপার জানান, লক্ষ্মীপুরে ২০টি স্থায়ী ও ৭০টি অস্থায়ী হাটে কোরবানির পশু বেচাকেনা হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সহযোগিতায় হাটগুলোতে জাল টাকা শনাক্তকরণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। পাশাপাশি টহল পুলিশ ও সাদা পোশাকের পুলিশ সদস্যরা হাটের সার্বিক নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করবেন।
তবে খামারি ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরকারিভাবে স্থানীয় খামারিদের সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হলে তারা আরও উৎসাহিত হবেন। অন্যথায় লোকসানের কারণে অনেকেই ভবিষ্যতে গরু পালনে আগ্রহ হারাতে পারেন।