শফিকুজ্জামান সোহেল, গঙ্গাচড়া, রংপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ : ১৯ মে ২০২৬ দুপুর ০১:২৩:২৬
পদ্মা ব্যারাজে বরাদ্দ, তিস্তা প্রকল্পেও আশ্বাস প্রতিমন্ত্রীর
ফারাক্কা চুক্তি নবায়ন, পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প ও তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সবাইকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছেন পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ। তিনি বলেছেন, সরকার ইতোমধ্যে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের জন্য একনেকে বরাদ্দ দিয়েছে এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনাও বাস্তবায়ন করা হবে। এজন্য কিছু সময় ও কারিগরি যাচাই-বাছাই প্রয়োজন।
সোমবার (১৮ মে) দুপুরে রংপুরের শহীদ আবু সাঈদ স্টেডিয়াম-এ ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস-২০২৬’-এর আঞ্চলিক পর্যায়ের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, “তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হবে। এজন্য অপেক্ষা ও ধৈর্য ধরতে হবে। আমাদের সরকারের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সামনে বর্তমানে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ফারাক্কা চুক্তি, পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন।”
তিনি আরও বলেন, “আমাদের সরকার গঠনের মাত্র তিন মাস হয়েছে। তাই একটু সময় দিতে হবে। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য টেকনিক্যাল ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার কিছু বিষয় রয়েছে। যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়াও চলছে।”
ফরহাদ হোসেন আজাদ বলেন, “আগামী ১১ ডিসেম্বর ফারাক্কা চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে। আমরা সেই চুক্তি আবারও কার্যকর করতে চাই। এখন পর্যন্ত যতগুলো ফারাক্কা চুক্তি হয়েছে, তার মধ্যে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান-এর ১৯৭৭ সালের চুক্তিটি সবচেয়ে ভালো ও সময়োপযোগী ছিল। আমরা সেই আলোকে নতুন করে চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়ে আলোচনা করছি।”
তিনি জানান, সরকার আন্তঃসীমান্ত নদীর পানিবণ্টন, নদীশাসন এবং উত্তরাঞ্চলের দীর্ঘদিনের পানি সংকট সমাধানে গুরুত্ব দিচ্ছে। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে নদীভাঙন, শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাব এবং বন্যা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
এদিকে দীর্ঘদিনের প্রতিশ্রুতি আর অনিশ্চয়তার কারণে তিস্তাপাড়ের সাধারণ মানুষের মধ্যে এখনো রয়েছে সংশয়, হতাশা ও অপেক্ষা।
রংপুরের গঙ্গাচড়া, কাউনিয়া, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও নীলফামারীর তিস্তাপাড়ের মানুষ কাছে, তিস্তা শুধু একটি নদী নয়—এটি উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি ও টিকে থাকার লড়াই। বর্ষায় ভয়াবহ ভাঙন আর শুকনো মৌসুমে পানির সংকটে বছরের পর বছর দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে তাদের। দুর্ভোগে থাকা তিস্তাপাড়ের মানুষদের কাছে তিস্তা মহাপরিকল্পনা একটি বড় এক আশার নাম।
গঙ্গাচড়া উপজেলার কোলকোন্দ ইউনিয়নের বাসিন্দা আব্দুল কাদের বলেন, “প্রতিবারই শুনি তিস্তা প্রকল্প হবে, নদী খনন হবে, ভাঙন বন্ধ হবে। কিন্তু বাস্তবে কিছুই দেখি না। বর্ষা এলেই ঘরবাড়ি নিয়ে আতঙ্কে থাকতে হয়।”
নোহলি ইউনিয়নের বাসিন্দা মরিয়ম বেগম বলেন, “নদী আমাদের সব নিয়ে গেছে। বারবার আশ্বাস পাই, কিন্তু স্থায়ী কোনো সমাধান পাই না। এখন মানুষ কাজ দেখতে চায়।”
লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল হাদী বলেন, “তিস্তাপাড়ের মানুষ বছরের পর বছর শুধু আশ্বাস শুনে আসছে। কিন্তু বাস্তবে কোনো পরিবর্তন নেই। নদীভাঙন, খরা আর বন্যার সঙ্গে যুদ্ধ করেই মানুষের জীবন কাটছে। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে উত্তরাঞ্চলের মানুষের ভাগ্য বদলে যেত।”
স্থানীয়রা জানান, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে নদীশাসন, পানি সংরক্ষণ, সেচ সুবিধা বৃদ্ধি, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নৌপথ উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হবে। এতে উত্তরাঞ্চলের কৃষি ও অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, দীর্ঘদিন ধরে নানা আলোচনা, সমীক্ষা ও বিদেশি সহযোগিতার কথা শোনা গেলেও প্রকল্পটি এখনো বাস্তবায়নের দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। ফলে নতুন আশ্বাসকে সাধারণ মানুষ সতর্ক দৃষ্টিতে দেখছেন।
তিস্তাপাড়ের মানুষের প্রত্যাশা, এবার যেন আশ্বাসের গণ্ডি পেরিয়ে বাস্তব কাজ শুরু হয়। তাদের ভাষায়, “তিস্তা নিয়ে আর প্রতিশ্রুতি নয়, আমরা বাস্তবায়ন দেখতে চাই।”