আনোয়ারা (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি
প্রকাশ : ৪ আগস্ট ২০২৬ রাত ০৯:১৪:৪৪
আনোয়ারায় তিন সার কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত, আমন মৌসুমে সরবরাহ নিয়ে শঙ্কা
চট্টগ্রামের আনোয়ারায় অবস্থিত তিনটি সার কারখানার মধ্যে কোনোটিরই উৎপাদন স্বাভাবিক নেই। এর মধ্যে গ্যাস সংকটে দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেডে (সিইউএফএল)। কাঁচামাল সংকটে বন্ধ রয়েছে ডাই অ্যামোনিয়া ফসফেট (ডিএপি) ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএপিএফসিএল) উৎপাদনও।
অন্যদিকে, গ্যাস সংকটের কারণে বহুজাতিক সার কারখানা কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডের (কাফকো) উৎপাদন সীমিত করা হয়েছে। ফলে আসন্ন আমন মৌসুমে সারের চাহিদা মোকাবিলা করা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে খাদ্যশস্য উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।
বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) অধীনে চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেডের (সিইউএফএল) সার উৎপাদন গ্যাস সংকটের কারণে গত ৪ মার্চ থেকে বন্ধ রয়েছে। এর আগেও গ্যাস সংকট ও যান্ত্রিক সমস্যার কারণে কারখানাটি দীর্ঘ সময় বন্ধ ছিল। কারখানার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কারখানায় প্রায় ৬৫ হাজার টন ইউরিয়া সার উৎপাদন হয়েছে। এর আগের অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছিল প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার টন সার।
এ বিষয়ে কারখানাটির প্রধান রসায়নবিদ উত্তম চৌধুরী বলেন, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ পাওয়া গেলে চলতি অর্থবছরে প্রায় ১ দশমিক ৫ লাখ টন সার উৎপাদন করা সম্ভব হবে।
এদিকে, কাঁচামাল সংকটের কারণে বিসিআইসির দেশের একমাত্র ডিএপি সার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ডিএপিএফসিএলে টানা এক মাসের বেশি সময় ধরে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। সারটির প্রধান কাঁচামাল ফসফরিক অ্যাসিডের সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
কারখানা সূত্রে জানা গেছে, গত ২৮ জুন সকাল থেকে কারখানাটিতে সার উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। এই কারখানা দেশের কৃষিখাতে ব্যবহৃত ডিএপি সার উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দীর্ঘদিন উৎপাদন বন্ধ থাকলে ভবিষ্যতে সার সরবরাহব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সূত্র আরও জানায়, ডিএপি সার উৎপাদনের কাঁচামাল ফসফরিক অ্যাসিড আমদানির জন্য গত জানুয়ারি মাসে বিসিআইসি ই-জিপির মাধ্যমে দরপত্র আহ্বান করে। ২০ হাজার টন ফসফরিক অ্যাসিড সরবরাহের কার্যাদেশ পায় মেসার্স আর কে এন্টারপ্রাইজ। চুক্তি অনুযায়ী জুনের মধ্যেই কাঁচামাল সরবরাহের কথা ছিল। তবে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের সংঘাতের প্রভাবে আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়ায় কাঁচামাল সরবরাহে জটিলতা তৈরি হয়। এ কারখানায় গত অর্থবছরের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ মেট্রিক টন। কারখানাটির দুটি ইউনিটে দৈনিক উৎপাদনক্ষমতা ৮০০ মেট্রিক টন।
ডিএপিএফসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মঈনুল হক বলেন, ফসফরিক অ্যাসিড সংকটের কারণে কারখানার উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। আমরা দ্রুত উৎপাদনে যাওয়ার চেষ্টা করছি।
অন্যদিকে, বহুজাতিক সার কারখানা কাফকোতেও গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে। গ্যাস সরবরাহ সীমিত হওয়ায় কারখানাটির উৎপাদন নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। কাফকোর দৈনিক ইউরিয়া উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ১ হাজার ৭২৫ মেট্রিক টন এবং অ্যামোনিয়া উৎপাদনক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন।
কাফকোর চিফ অপারেশনস অফিসার (সিওও) মো. আবদুল্লাহ ফারুক বলেন, কাফকোতে উৎপাদন চালু আছে। তবে গ্যাস ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে।
কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিসিএল) সূত্র জানায়, বর্তমানে চট্টগ্রামে গ্যাসের দৈনিক স্বাভাবিক চাহিদা প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। সংকটের শুরুতে চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছিল মাত্র ২০০ মিলিয়ন ঘনফুটের কাছাকাছি। কিন্তু আগস্টের শুরু থেকে সরবরাহ আরও কমে গেছে। ফলে আবাসিক ও শিল্প—সব খাতেই তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে।
কেজিডিসিএলের মহাব্যবস্থাপক (ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিস ডিভিশন) প্রকৌশলী তাজউদ্দিন ঢালী বলেন, জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। সীমিত সরবরাহ রেশনিংয়ের মাধ্যমে বিতরণের চেষ্টা করা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চট্টগ্রামে লবণাক্ত পানির আগ্রাসনে আশঙ্কাজনক হারে কমছে বোরো ধানের চাষাবাদ। উপকূলীয় বিভিন্ন এলাকায় শুষ্ক মৌসুমে জমিতে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় সেচের পানির সংকট দেখা দিচ্ছে। ফলে অনেক জমি বোরো চাষের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। এতে বোরো মৌসুমে ধান উৎপাদন কমার পাশাপাশি কৃষকদের আমন ধানের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ছে।
চট্টগ্রাম জেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার হেক্টর জমি। সে হিসেবে জেলায় সারের চাহিদা রয়েছে—ইউরিয়া ৪৭ হাজার ৩৬৬ মেট্রিক টন, টিএসপি ২৪ হাজার ৬২৭ মেট্রিক টন, ডিএপি ২৫ হাজার ৫৪২ মেট্রিক টন এবং এমওপি ১২ হাজার ৮৪৩ মেট্রিক টন।
তবে মাঠপর্যায়ের কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে গুদামে পর্যাপ্ত সার মজুত থাকলেও উৎপাদনকারী কারখানাগুলো দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে আমন মৌসুমের মাঝামাঝি সময়ে সার সরবরাহের চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে ইউরিয়া ও ডিএপি সারের সরবরাহ স্বাভাবিক না থাকলে চাহিদার সময়ে সার পেতে ভোগান্তিতে পড়তে পারেন কৃষকরা।
কৃষকদের ভাষ্য, আমন মৌসুমে জমিতে সময়মতো সার প্রয়োগ করা না গেলে ফলন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই শুধু মজুদের পরিমাণ নয়, উপজেলা পর্যায়ে ডিলারদের মাধ্যমে নির্ধারিত দামে নিয়মিত ও পর্যাপ্ত সার সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। উৎপাদনকারী সার কারখানাগুলো দ্রুত চালু করা না গেলে ভবিষ্যতে কৃত্রিম সংকট কিংবা বাড়তি দামে সার বিক্রির সুযোগ তৈরি হতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন তাঁরা। তাঁদের দাবি, আমন মৌসুম শুরুর আগেই ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে সারের মজুত ও বিতরণব্যবস্থা কঠোরভাবে তদারকি করা হোক।
সারাদেশে সিইউএফএলের ২৮টি গুদাম থেকে সার সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে চট্টগ্রামসহ আশপাশের ৮টি জেলায় সার সরবরাহ করা হয় সিইউএফএল কারখানা ও কালুরঘাটে অবস্থিত দুটি গুদাম থেকে। চট্টগ্রাম ছাড়া বাকি জেলাগুলো হলো কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, ফেনী, লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালী।