ফকির আতিয়ার রহমান, রামপাল (বাগেরহাট) প্রতিনিধি
প্রকাশ : ৯ অক্টোবর ২০২৬ রাত ০৭:৪৫:২৬
রামপালে ঘুষের ভিডিও ভাইরাল: জেলা প্রশাসকের চিঠি, এক পক্ষের দাবি এআই
বাগেরহাটের রামপাল উপজেলা ভূমি অফিসে নামজারিসহ বিভিন্ন সেবা নিতে গিয়ে অনিয়ম ও ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি নামজারি আবেদনের প্রতিবেদন দেওয়ার বিনিময়ে এক সেবাগ্রহীতার কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার অভিযোগে কানুনগো মো. আবুল বাশারের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি এবং পরবর্তী সময়ে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
তবে ভাইরাল হওয়া ভিডিও ও জেলা প্রশাসকের চিঠি নিয়ে এক পক্ষের দাবি, এসব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে। এ নিয়ে এলাকায় আলোচনা-সমালোচনা চলছে। ফলে ভিডিওটির সত্যতা, প্রশাসনিক পদক্ষেপ এবং এআই ব্যবহারের অভিযোগ ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন ভুক্তভোগী জানান, জমির শ্রেণি ও আবেদনের ধরন অনুযায়ী নামজারিসহ বিভিন্ন সেবা নিতে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয় বলে তাঁদের অভিযোগ। তাঁদের দাবি, ভূমি অফিসের আশপাশে সক্রিয় দালালচক্রের কারণে সেবা নিতে এসে অনেককে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সম্প্রতি নামজারি আবেদনের প্রতিবেদন দেওয়ার বিনিময়ে কানুনগো মো. আবুল বাশার এক সেবাগ্রহীতার কাছ থেকে অর্থ নিয়েছেন—এমন অভিযোগে একটি ভিডিও ধারণ করা হয়। পরে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
এ ঘটনায় ২০২৬ সালের ৬ আগস্ট রামপাল উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) অভিজিৎ চক্রবর্তী কানুনগো মো. আবুল বাশারকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেন। নোটিশে উল্লেখ করা হয়, দাপ্তরিক দায়িত্ব পালনকালে নিজ কার্যালয়ে বসে নামজারি মামলার প্রতিবেদন দেওয়ার বিনিময়ে সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে নিয়মবহির্ভূতভাবে নগদ অর্থ গ্রহণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ-সংক্রান্ত ৩ মিনিট ৫৬ সেকেন্ড এবং ৫ মিনিট ২২ সেকেন্ড দৈর্ঘ্যের দুটি ভিডিও ক্লিপের তথ্যও নোটিশে উল্লেখ করা হয়।
নোটিশের বিষয়ে সন্তোষজনক জবাব না পাওয়ায় সরকারি সেবা প্রদানের বিনিময়ে উৎকোচ গ্রহণের অভিযোগে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর বিধি ৩(খ) অনুযায়ী ‘অসদাচরণ’-এর অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্ট দপ্তর সূত্রে জানা গেছে।
পরবর্তী সময়ে ১২ আগস্ট প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অভিযুক্ত কানুনগোর বিরুদ্ধে তথ্য-প্রমাণসহ বাগেরহাট জেলা প্রশাসকের কাছে চিঠি পাঠানো হয়। এর ধারাবাহিকতায় ৮ সেপ্টেম্বর স্মারক নম্বর ০৫.৪৪.০১০০.০১৪.১৯.২০.২৬-এর মাধ্যমে বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন অভিযুক্ত কানুনগোর বিরুদ্ধে মামলা রুজুর বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে খুলনা বিভাগীয় কমিশনারের কাছে চিঠি দেন বলে জানা গেছে।
তবে এ বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপের অগ্রগতি সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। দীর্ঘ সময়েও দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নেওয়া হয়ে থাকলে তার কারণ কী, তা জানতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য প্রয়োজন। এদিকে অভিযোগের বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন কয়েকজন সেবাগ্রহীতা।
অন্যদিকে, ভাইরাল ভিডিও ও প্রশাসনিক চিঠিকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এআই ব্যবহারের অভিযোগও সামনে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, ভিডিওটি ও জেলা প্রশাসকের চিঠি এআই দিয়ে তৈরি করে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্মানহানি ও সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। তবে ভিডিও ও চিঠি এআই দিয়ে তৈরি কি না, সে বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
এ ঘটনায় আরও অভিযোগ উঠেছে, ভাইরাল ভিডিওকে কেন্দ্র করে পরিচয়ধারী কিছু সাংবাদিক বিশেষ সুবিধা নিয়েছেন। তবে এ অভিযোগের পক্ষে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে, বিভিন্ন ভূমি অফিসে সেবা নিতে আসা কয়েকজন গ্রাহক অভিযোগ করেন, সরকারি নিয়মের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হয়। তাঁদের ভাষ্য, অতিরিক্ত অর্থ দিতে না চাইলে আবেদনের কাগজপত্রে নানা সমস্যা দেখানো হয়। অথচ একই ফাইলের ক্ষেত্রে অর্থ দেওয়ার পর সমস্যার সমাধান হয়ে যায় বলে তাঁদের দাবি।
ক্ষোভ প্রকাশ করে কয়েকজন সেবাগ্রহীতা বলেন, তাঁরা শুনেছেন জেলা প্রশাসকের চিঠির পরও অভিযুক্ত কানুনগোর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে না। তাঁদের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা নাকি বলে বেড়ান, ‘ওপরের সবকিছু ম্যানেজ হয়ে গেছে।’ তবে এ বক্তব্যের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ভুক্তভোগীরা অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত, দোষ প্রমাণিত হলে শাস্তি এবং ভূমি অফিসে দালালচক্রের দৌরাত্ম্য বন্ধের দাবি জানিয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে কানুনগো মো. আবুল বাশারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি কী বলব, আপনি এসিল্যান্ড স্যারদের কাছে শোনেন।’ এ কথা বলেই তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
এ বিষয়ে রামপাল উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) অভিজিৎ চক্রবর্তী বলেন, ‘ঘটনার তিন দিন পর বিষয়টি আমার নজরে আসে। এরপর ওই দিনই তাঁকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিই। নোটিশের জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে চিঠি পাঠিয়েছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি রামপাল উপজেলা ভূমি অফিসকে দুর্নীতিমুক্ত করতে বদ্ধপরিকর। অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তির পরিচয় যা-ই হোক, অপরাধ করলে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছি এবং ভবিষ্যতেও নেব।’