রুহুল আমিন কিবরিয়া, বগুড়া জেলা প্রতিনিধি
প্রকাশ : ১০ জুলাই ২০২৬ রাত ০৮:০১:৩৪
দুই যুগের বেশী সময় ধরে উত্তরবঙ্গের মানুষের কাছে বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ ছিল প্রতিশ্রুতির নাম
কখনও নির্বাচনী ইশতেহার, উন্নয়ন পরিকল্পনা, আবার কখনও মন্ত্রী-এমপিদের বক্তব্যে উঠে এসেছে এই প্রকল্পের কথা। হয়েছে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা। অনুমোদিত হয়েছে প্রকল্প এবং বেড়েছে ব্যয়। বাস্তবে দেখা যায়নি এক ইঞ্চি রেললাইনও। সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে কাগজের প্রকল্পটি এবার ‘লাইনে’ এসেছে। জমি অধিগ্রহণ কার্যক্রমে এসেছে বড় অগ্রগতি। শেষ হয়েছে ৫৬টি মৌজার যৌথ তদন্ত। ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দিতে ছাড় হয়েছে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা। ইতোমধ্যে চেক বিতরণ শুরু হয়েছে।
রেলওয়ে ও বগুড়া জেলা প্রশাসনের নথি ঘেঁটে দেখা গেছে প্রকল্পটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলোর মধ্যে ভূমি অধিগ্রহণে দৃশ্যমান অগ্রগতির চিত্র। বগুড়া অংশে মোট ৪৮১ দশমিক শূন্য ৯ একর জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে। ইতোমধ্যে বগুড়া সদর, শাজাহানপুর, শেরপুর ও কাহালু উপজেলার ৫৬টি মৌজার যৌথ তদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। মাঠ জরিপ, ভিডিও ধারণ এবং মালিকানা যাচাই কাজও শেষ। গত ২২ জুন ভূমি অধিগ্রহণ বাবদ এক হাজার ৯৬৯ কোটি ১০ লাখ টাকার চেক বগুড়া জেলা প্রশাসকের হাতে এসেছে। এখন পর্যায়ক্রমে ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি মালিকদের মধ্যে ক্ষতিপূরণের চেক বিতরণ কাজ চলছে।
আট বছর পর কাজে গতি
বগুড়া-সিরাজগঞ্জ ডুয়েলগেজ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পের আলোচনা নতুন নয়। যমুনা বহুমুখী সেতু চালুর পর থেকেই উত্তরবঙ্গের সঙ্গে ঢাকার সরাসরি রেল যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। পরে বিভিন্ন সময়ে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, রুট নির্বাচন এবং কারিগরি বিশ্লেষণ করা হলেও প্রকল্পটি দীর্ঘদিন পরিকল্পনার টেবিলেই আটকে ছিল।
২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় বগুড়া-সিরাজগঞ্জ ডুয়েলগেজ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন পায়। প্রকল্পের ব্যয় ছিল ৫ হাজার ৫৭৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা। দীর্ঘসূত্রতা, ভূমি অধিগ্রহণ ব্যয় বৃদ্ধি, নতুন অবকাঠামো সংযোজন এবং মূল্যস্ফীতির কারণে সংশোধিত প্রস্তাবে ব্যয় বেড়ে এখন প্রায় সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার কারণে ভূমির মূল্য, নির্মাণসামগ্রীর দাম এবং প্রকল্পের বিভিন্ন উপাদানের ব্যয় বেড়ে যায়। এতে সংশোধিত ব্যয় প্রায় দ্বিগুণে পৌঁছায়।
প্রকল্পের আওতায় বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জের শহীদ এম মনসুর আলী স্টেশন পর্যন্ত প্রায় ৮৬ কিলোমিটার নতুন ডুয়েলগেজ রেললাইন নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি লুপলাইন, নতুন স্টেশন, সেতু, কালভার্ট, সিগন্যালিং ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। উত্তরবঙ্গের মানুষের কাছে প্রকল্পটি ধীরগতির কারণে ‘কাগজের রেলপথ’ হিসেবেই পরিচিতি পায়।
বগুড়ার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) পিএম ইমরুল কায়েস বলেন, সরকার থেকে অর্থ পাওয়া গেছে। পর্যায়ক্রমে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হচ্ছে। ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া নির্ধারিত আইন অনুযায়ী এগিয়ে চলছে। জমি অধিগ্রহণ শেষ হলেই নির্মাণকাজ শুরুর প্রশাসনিক প্রস্তুতি জোরদার হবে।
বদলে যাবে যোগাযোগের চিত্র
রেলওয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন রেললাইন চালু হলে বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ হয়ে ঢাকার সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের সরাসরি রেল করিডোর তৈরি হবে। এতে ঢাকার সঙ্গে রেলপথের দূরত্ব প্রায় ১১২ কিলোমিটার কমবে। যাত্রাকালও তিন-চার ঘণ্টা পর্যন্ত কমে আসতে পারে। এর সুফল শুধু যাত্রী পরিবহনেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। উত্তরাঞ্চলের আলু, ধান, ভুট্টা, সবজি, মাছ, দুগ্ধজাত পণ্যসহ বিপুল কৃষিপণ্য দ্রুত ও কম খরচে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিবহন করা সম্ভব হবে। বর্তমানে এসব পণ্য প্রায় পুরোপুরি সড়কপথে পরিবহন হওয়ায় যানজট, দুর্ঘটনা এবং অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয়ের কারণে ব্যবসায়ীদের লোকসান গুনতে হয়।
বগুড়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি সাইরুল ইসলাম বলেন, বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ শুধু একটি জেলার প্রকল্প নয়। এটি বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের আট-দশটি জেলার ব্যবসা-বাণিজ্যে বড় পরিবর্তন আসবে। কৃষিপণ্য দ্রুত বাজারে পৌঁছাবে, পরিবহন ব্যয় কমবে এবং নতুন শিল্পে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে।
চাপ কমবে মহাসড়কে
বর্তমানে বগুড়া-ঢাকা মহাসড়ক উত্তরাঞ্চলের সবচেয়ে ব্যস্ত করিডোর। উৎসবের ছুটির সময় তো বটেই, সাধারণ দিনেও দীর্ঘ যানজট এখন নিয়মিত ঘটনা। সম্প্রতি বগুড়া থেকে ঢাকায় যেতে অনেক যাত্রীর ১০-১২ ঘণ্টা সময় লাগে। চার লেন, ছয় লেন এবং সেতু নির্মাণের পরও সড়কপথের ওপর চাপ কমেনি। সড়কপথ বিশেষজ্ঞ আমিনুল হক বলেন, উত্তরাঞ্চলের উল্লেখযোগ্য অংশের যাত্রী ও পণ্য যদি রেলপথে স্থানান্তর করা যায়, তাহলে মহাসড়কের ওপর চাপ অনেকটাই কমবে। দুর্ঘটনার ঝুঁকিও হ্রাস পাবে।
পশ্চিমাঞ্চল রেলের মহাব্যবস্থাপক ফরিদ আহম্মেদ বলেন, এই প্রকল্প শুধু একটি নতুন রেললাইন নয়; উত্তরাঞ্চলের জন্য বিকল্প পরিবহন করিডোর। দীর্ঘ মেয়াদে সড়ক পরিবহনের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
নির্মাণকাজ শুরু বড় চ্যালেঞ্জ
জমি অধিগ্রহণে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে, তবু প্রকল্পের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন মূল নির্মাণকাজ শুরু করা। ভূমি অধিগ্রহণ শেষ হওয়ার পর দরপত্র আহ্বান, ঠিকাদার নিয়োগ এবং পূর্ণাঙ্গ অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই ধাপগুলো দ্রুত শেষ করা না গেলে আবারও সময় ও ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রকল্প পরিচালক মনিরুল ইসলাম ফিরোজী বলেন, জমি বুঝে পাওয়া গেলে দরপত্র ও মূল নির্মাণকাজ শুরুর প্রশাসনিক প্রস্তুতি আরও দ্রুত এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। প্রকল্পতে বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত প্রায় ৮৬ কিলোমিটার নতুন ডুয়েলগেজ রেলপথ নির্মিত হবে। এতে শুধু যাত্রী পরিবহন নয়; কৃষি ও শিল্পপণ্য পরিবহনেও বড় পরিবর্তন আসবে।
বগুড়ার জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান বলেন, বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণ কার্যক্রম পুরোদমে চলছে। সরকারের বরাদ্দ পাওয়া অর্থ থেকে পর্যায়ক্রমে ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি মালিকদের ক্ষতিপূরণ পরিশোধ করা হচ্ছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে শুধু বগুড়া নয়; উত্তরাঞ্চলের সামগ্রিক যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতি পাল্টে যাবে।