সারোয়ার ওয়াদুদ চৌধুরী
প্রকাশ : ৬ জুলাই ২০২৬ বিকাল ০৩:৫৭:১০
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের দেশপ্রেম ও সততা অবিস্মরণীয়
বাংলা একাডেমির সভাপতি ও দুর্নীতি বিরোধী জাতীয় সমম্বয় কমিটির সহ-সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন একজন সৎ, সাহসী, সত্যনিষ্ঠ, নির্ভীক, নির্মোহ ও নিবেদিতপ্রাণ দেশপ্রেমিক। তিনি একাধারে দেশবরেণ্য শিক্ষাবিদ, প্রখ্যাত গবেষক, বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক এবং বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক ও মননশীল জগতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তাঁর জীবন ও কর্ম ছিল সত্য, ন্যায়, মানবিকতা এবং দেশপ্রেমের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি ছিলেন জাতির বিবেকের কণ্ঠস্বর।
রোববার (৫ জুলাই) মিরপুরের একটি রেস্তোরাঁয় দুপুরের খাবার খেতে গিয়ে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। পরে নিকটস্থ একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর।
১৯৪০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর কিশোরগঞ্জ জেলার পাকুন্দিয়া উপজেলায় তাঁর জন্ম। তাঁর বাবা ছিলেন মুহাম্মদ আবদুল হাকিম এবং মা জাহানারা খাতুন।
১৯৫৯ সালে তিনি ময়মনসিংহ জিলা স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর ১৯৬১ সালে আনন্দমোহন কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখান থেকে ১৯৬৫ সালে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক (সম্মান) এবং ১৯৬৬ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তিনি অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, অধ্যাপক আহমদ শরীফ, অধ্যাপক নীলিমা ইব্রাহিমসহ প্রথিতযশা শিক্ষকদের সান্নিধ্যে এসে প্রগতিশীল চিন্তাচর্চায় উদ্বুদ্ধ হন।
পরবর্তী সময়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে চার দশকেরও বেশি সময় অধ্যাপনা করেন। শিক্ষক হিসেবে তিনি যেমন ছিলেন জনপ্রিয়, তেমনি একজন গভীর চিন্তাবিদ ও প্রাজ্ঞ গবেষক হিসেবেও সুপরিচিত ছিলেন। বাংলা বিভাগের সভাপতির দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি নজরুল রচনাবলীর সম্পাদনা পরিষদের সদস্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৮২ সাল থেকে তিনি প্রগতিশীল সাময়িকী লোকায়ত-এর সম্পাদক ছিলেন এবং বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক ও সাময়িকীতে নিয়মিত প্রবন্ধ ও কলাম লিখেছেন।
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক দুই ডজনের কাছাকাছি গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে মুক্তিসংগ্রাম (১৯৭২), নৈতিকতা: শ্রেয়োনীতি ও দুর্নীতি (১৯৮১), রাজনীতি ও দর্শন (১৯৮৯), আধুনিকতাবাদ ও জীবনানন্দের জীবনোৎকণ্ঠা (২০০৪) এবং রাষ্ট্রচিন্তায় বাংলাদেশ (২০০৮)। তিনি বার্ট্রান্ড রাসেলের Political Ideals গ্রন্থ বাংলায় অনুবাদ করেন। এছাড়া ইতিহাসের আলোকে বাংলাদেশের সংস্কৃতি এবং স্বদেশচিন্তা ও আকবরের রাষ্ট্রসাধনা তাঁর সম্পাদিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ।
ব্যক্তিজীবনে তিনি দুই সন্তানের জনক। তাঁর কন্যা অধ্যাপক ড. শুচিতা শরমিন একজন শিক্ষাবিদ। পুত্র ফয়সল আরেফিন দীপন ছিলেন জাগৃতি প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী।
২০১৫ সালের ৩১ অক্টোবর জঙ্গিদের হাতে নির্মমভাবে নিহত হন ফয়সল আরেফিন দীপন। সন্তানের এমন মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের পরও অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক প্রতিশোধের ভাষায় কথা বলেননি। বরং তিনি বলেছিলেন, “আমি কোনো বিচার চাই না। আমি চাই শুভবুদ্ধির উদয় হোক। যারা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ নিয়ে রাজনীতি করছেন, যারা রাষ্ট্রধর্ম নিয়ে রাজনীতি করছেন—উভয় পক্ষই দেশের সর্বনাশ করছেন। উভয় পক্ষের শুভবুদ্ধির উদয় হোক। জেল-ফাঁসি দিয়ে কী হবে?” এই বক্তব্য তাঁর অসাধারণ সহনশীলতা, মানবিকতা ও রাষ্ট্রচিন্তার গভীরতার পরিচয় বহন করে এবং সে সময় দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক কেবল একজন শিক্ষক বা লেখক ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন প্রজ্ঞাবান রাষ্ট্রচিন্তাবিদ, যিনি আজীবন সাধারণ মানুষের মুক্তি, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছেন। তাঁর প্রবন্ধ, গবেষণা ও চিন্তাধারা বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরকে সমৃদ্ধ করেছে। স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, নৈতিকতা ও মানবিক সমাজ নির্মাণে তাঁর দর্শন আগামী প্রজন্মের জন্যও প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের মৃত্যু বাংলাদেশের শিক্ষা, সাহিত্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। তাঁর দেশপ্রেম, সততা, নৈতিক দৃঢ়তা এবং মুক্তচিন্তার আদর্শ ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দীর্ঘদিন পথ দেখাবে।
লেখক: সাধারণ সম্পাদক ও মুখপাত্র, দুর্নীতি বিরোধী জাতীয় সমন্বয় কমিটি।