মো. আরিফ হোসেন চৌধুরী
প্রকাশ : ১৭ আগস্ট ২০২৬ বিকাল ০৪:৫৮:৩০
গ্যাস সংকটে বিপাকে সিএনজি চালকরা, কিস্তির টাকা তুলে দিতে হচ্ছে মালিকের জমা
রাজধানীর উত্তরায় তীব্র গ্যাস সংকটে চরম বিপাকে পড়েছেন সিএনজি অটোরিকশাচালকরা। দিনের পর দিন পাম্পে গ্যাসের জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও অনেক চালককে ফিরতে হচ্ছে খালি হাতে। এতে একদিকে যেমন নষ্ট হচ্ছে কর্মঘণ্টা, অন্যদিকে কমে যাচ্ছে আয়। সবচেয়ে মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে নিম্নআয়ের এসব চালকের সংসারে—অনেকেই গাড়ির জমা দিতে গিয়ে ধার-কর্জ কিংবা কিস্তির টাকা তুলতে বাধ্য হচ্ছেন।
সোমবার (১৭ আগস্ট) উত্তরা, আব্দুল্লাহপুর, বিমানবন্দর, খিলক্ষেত ও আশপাশের এলাকা ঘুরে দেখা যায়, কয়েক দিন ধরে চলমান গ্যাস সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। ভোর থেকেই বিভিন্ন সিএনজি ফিলিং স্টেশনে গাড়ির দীর্ঘ সারি দেখা যায়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেক চালক প্রয়োজনীয় গ্যাস পাচ্ছেন না।
চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গ্যাসের জন্য দিনের বড় একটি সময় পাম্পের লাইনে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এতে যাত্রী পরিবহনের সময় কমে যাওয়ার পাশাপাশি আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। অথচ প্রতিদিনই গাড়ির মালিককে নির্ধারিত টাকা জমা দিতে হচ্ছে। ফলে আয় না থাকলেও জমার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে অনেক চালক ঋণ বা কিস্তির আশ্রয় নিচ্ছেন।
উত্তরার এক সিএনজি চালক মো. মনা বলেন, “কিস্তি থেকে টাকা উঠিয়ে সিএনজি মালিকের জমা দিতে হচ্ছে। ভোর ৪টা থেকে লাইনে আছি, এখনো গ্যাস পাইনি। গাড়ির মালিককে জমা দেব কীভাবে, সংসার চালাব কীভাবে? সামনে বাসা ভাড়া দিতে হবে।”
আরেক চালক জাহাঙ্গীর বলেন, “প্রতিদিন মহাজনকে ১ হাজার ২০০ টাকা জমা দিতে হয়। গ্যাস লাগে প্রায় ৫০০ টাকার। এর বাইরে সারাদিনে আমার নিজেরও ২০০ থেকে ২৫০ টাকা খরচ আছে। সব মিলিয়ে প্রতিদিন ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। কিন্তু গ্যাস না পাওয়ায় গত দুই মাস ধরে আয়-রোজগার প্রায় বন্ধ।”
চালকদের ভাষ্য, গ্যাস সংকট শুধু তাদের আয় কমিয়ে দেয়নি, বরং পরিবার চালানোও কঠিন করে তুলেছে। নিয়মিত গাড়ির জমা, বাসাভাড়া, খাবার ও সন্তানদের খরচ—সবকিছু মিলিয়ে তারা এখন চরম আর্থিক চাপে রয়েছেন। গ্যাস না পাওয়ায় অনেক সময় সারাদিন পাম্পে দাঁড়িয়ে থেকেও কোনো আয় হচ্ছে না।
গ্যাস সংকটের বিষয়ে এম এ মাসুদ ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার কামাল চ্যানেল এসকে বলেন, “চার-পাঁচ দিন আগেও স্টেশনে পর্যাপ্ত গ্যাস ছিল। এরপর মাঝখানে কয়েক দিন গ্যাস একেবারেই পাওয়া যায়নি। গতকাল রাতে কিছুটা গ্যাস সরবরাহ হলেও বর্তমানে আবারও সংকট দেখা দিয়েছে।”
তিনি বলেন, “নিয়মিতভাবে সিগন্যাল দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত চাপের গ্যাস নেই। আমাদের স্টেশনের বাল্ব কম প্রেসারে ওপেন হয় না। ফলে যেসব স্টেশনের বাল্ব কম প্রেসারেও চালু হয়, তারাই কিছুটা গ্যাস সরবরাহ পাচ্ছে।”
তবে বিকেলের দিকে গ্যাসের চাপ কিছুটা বাড়তে শুরু করে বলে জানান তিনি। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে সংকটের কিছুটা সমাধান হতে পারে। বর্তমানে বিশেষ করে রাতের দিকে কিছুটা গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে।
গ্যাস সংকটের কারণে সিএনজি পাম্পগুলোতে দীর্ঘ সারি তৈরি হওয়ায় আশপাশের সড়কেও যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। এতে ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ যাত্রী ও অন্যান্য যানবাহনের চালকরাও।
পরিবহনসংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাসের স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে সংকট আরও তীব্র হতে পারে। তাই দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করে সিএনজি চালকদের কর্মঘণ্টা ও আয়-রোজগার ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমাতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।