নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : ৭ মে ২০২৬ সকাল ১০:৪৭:৪৭
ইরান যুদ্ধের প্রভাব: যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি
ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বেড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে সাধারণ মানের পেট্রোলের (রেগুলার গ্যাসোলিন) দাম। গত এক সপ্তাহে গ্যালনপ্রতি এর দাম বেড়েছে ৩১ সেন্ট। অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশন ‘এএএ’-এর তথ্য বলছে, গত বুধবার দেশটিতে প্রতি গ্যালন তেলের গড় দাম দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৫৪ ডলারে, যা ইরান যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় ৫২ শতাংশ বেশি।
গাড়ির জ্বালানি তেলের দাম এভাবে লাফিয়ে বাড়ার মূল কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে হরমুজ প্রণালীতে সৃষ্ট অচলাবস্থাকে। এই সরু জলপথটি দিয়ে সাধারণত বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন করা হয়। কিন্তু যুদ্ধের কারণে এই প্রণালীর কাছাকাছি তেলের ট্যাংকারগুলো আটকা পড়েছে। ইরান তাদের উপকূলীয় এই জলপথটি কার্যত বন্ধ করে দেওয়ায় গত দুই মাস ধরে অপরিশোধিত তেলের দাম ক্রমাগত বাড়ছে, যা গ্যাসোলিন তৈরির প্রধান উপাদান।
এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে সংঘাত কমে আসার আভাস পাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে তেলের দাম টানা দুই সপ্তাহ ধরে কমতির দিকে ছিল।
এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল এনার্জির গ্লোবাল ফুয়েল রিটেইল পরিচালক রব স্মিথ বলেন, “প্রাথমিক যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর এক ধরনের আশাবাদ তৈরি হয়েছিল যে, হয়তো সংঘাতের সমাপ্তি শুরু হতে যাচ্ছে। এর ফলে অপরিশোধিত তেলের দাম কমতে শুরু করে, যার ধারাবাহিকতায় খুচরা বাজারেও দাম কমিয়েছিলেন বিক্রেতারা।”
তবে হরমুজ প্রণালী নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শত্রুতা আরও গভীর হওয়ায় তেলের সরবরাহ ব্যাহত হয়। এর ফলে দাম কমার ধারা বদলে গিয়ে জ্বালানি তেলের দাম আবারও বাড়তে শুরু করেছে।
রব স্মিথ বলেন, বিশ্বজুড়ে জ্বালানির চাহিদার তুলনায় সরবরাহে একটি মৌলিক ঘাটতি দেখা দেবে, যা দামকে আরও বাড়িয়ে তুলবে। সরকার যা-ই বলুক বা বাজার বিশ্লেষকরা যা-ই ভাবুন না কেন, হরমুজ প্রণালী যতদিন অবরুদ্ধ থাকবে, ততদিন তেলের দামের ওপর প্রতিদিন একটি বড় ধরনের ঊর্ধ্বমুখী চাপ বজায় থাকবে। আর বর্তমানে এই জলপথটি মারাত্মকভাবে অবরুদ্ধ হয়ে আছে।
সাধারণত গ্যাস স্টেশনের মালিকরাই খুচরা পর্যায়ে তেলের দাম নির্ধারণ করেন। তবে এই দাম নির্ধারণের পেছনে অনেকগুলো বিষয় কাজ করে।
গ্যাসোলিনের দামের প্রধান অংশ জুড়ে থাকে এক ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের মূল্য। মার্কিন এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন গ্যাসোলিনের দামের প্রায় ৫১ শতাংশই ছিল অপরিশোধিত তেলের খরচ। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে তেলের দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। এর আগে ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর কয়েক মাস পর দেশটিতে প্রতি গ্যালন তেলের দাম ৫ ডলারে ঠেকেছিল। সাধারণত বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়লে পাল্লা দিয়ে গ্যাসোলিনের দামও বাড়ে। অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ কমে গেলে স্বাভাবিকভাবেই তেল ও গ্যাসোলিন—উভয়ের মূল্যই চড়া হয়।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) মতে, যুদ্ধের সময় ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ায় তেলের বাজারে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছে। এর প্রভাবে এপ্রিলের শুরুতে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১১২ ডলার পর্যন্ত উঠেছিল।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধ বন্ধে প্রাথমিক একটি চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছানোর আভাস পাওয়ায় গত বুধবার বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের নিচে নেমেছে। তেলের দাম কমার এই ধারা অব্যাহত থাকলে খুচরা পর্যায়ে গ্যাসোলিনের দামও কমে আসতে পারে।
জ্বালানি তেলের দামের গতিপথ বদলে যাওয়ার পেছনে বড় একটি ঘটনা ঘটে গত এপ্রিলে। সে সময় ইরান যাতে তেল রপ্তানি করতে না পারে, সেজন্য দেশটির সমুদ্রবন্দরগুলো অবরোধ করে যুক্তরাষ্ট্র।
রাইস ইউনিভার্সিটির বেকার ইনস্টিটিউটের এনার্জি রিসার্চ ফেলো জিম ক্রেন বলেন, “ইরান বিশ্ববাজারে অস্বাভাবিক হারে বেশি তেল সরবরাহ করছিল, যা তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করেছিল। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন ইরানকে শাস্তি দিতে এবং তাদের ওপর চাপ বাড়াতে তেল রপ্তানি বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়। এতে ইরানের ওপর যেমন চাপ সৃষ্টি হয়েছে, তেমনি বিশ্ববাজারেও এর প্রভাব পড়েছে এবং তেলের দাম বেড়ে গেছে। মূলত এটিই ছিল দাম বাড়ার বড় একটি কারণ।”
পারস্য উপসাগরে কোনো জাহাজে হামলার খবর কিংবা কূটনৈতিক আলোচনা থমকে যাওয়ার সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে তেল শোধনাগার ও ব্যবসায়ীদের মাঝে তেলের দাম নিয়ে চরম অস্থিরতা তৈরি হয়।
গত মার্চের শুরুতে এক সপ্তাহেই গ্যাসোলিনের দাম ৪৮ সেন্ট বেড়ে গিয়েছিল। তবে তেলের দাম এক সপ্তাহে সবচেয়ে বেশি বাড়ার রেকর্ড হয় ২০২২ সালের মার্চে। ‘এএএ’-এর তথ্যমতে, রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা চালানোর পর সে সময় এক সপ্তাহেই দাম বেড়েছিল ৬০ সেন্ট।