নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সকাল ১০:১৩:৩৪
নিউইয়র্কে করোনা ত্রাণ তহবিল আত্মসাৎ, ৮ বাংলাদেশিসহ ৯ জনের দোষ স্বীকার
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরে করোনাভাইরাস মহামারির সময় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সহায়তার জন্য বরাদ্দ করা ত্রাণ তহবিল আত্মসাতের ঘটনায় ৯ জন আসামি দোষ স্বীকার করেছেন। তাদের মধ্যে আটজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এবং একজন পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত। দীর্ঘ তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে কুইন্স সুপ্রিম কোর্টে পৃথক সময়ে তারা নিজেদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ স্বীকার করেছেন।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ২০২৫ সালের মে থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে আসামিরা পর্যায়ক্রমে আদালতে দোষ স্বীকার করেন। আদালত তাদের সম্মিলিতভাবে ১০ লাখ ৯১ হাজার ৭২০ মার্কিন ডলার ক্ষতিপূরণ পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছেন। এর মধ্যে ইতিমধ্যে প্রায় ৭ লাখ ৬০ হাজার ডলার পরিশোধ করা হয়েছে।
গত ১৩ ফেব্রুয়ারি এক যৌথ বিবৃতিতে বিষয়টি নিশ্চিত করেন ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি মেলিন্ডা ক্যাটজ এবং লাকি ল্যাং। তারা জানান, মহামারির মতো জরুরি পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য বরাদ্দ করা অর্থ আত্মসাৎ করা গুরুতর অপরাধ।
আসামিদের নাম ও ঠিকানা প্রকাশ করেছে কর্তৃপক্ষ। তবে ছবি প্রকাশ করা হয়নি। তারা হলেন মাহবুব মালিক (৪১), তোফায়েল আহমেদ (৫০), ইউসুফ এমডি (৪৫), মোহাম্মদ চৌধুরী ওরফে খোকন আশরাফ (৬৮), জাকির চৌধুরী (৫৯), মোহাম্মদ খান (৪৯), তানভীর মিলন (৫৫), জুনেদ খান (৫৬) এবং পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত নাদিম শেখ (৫৬)।
সরকারি তদন্তে জানা গেছে, ২০২০ সালের জুন মাস থেকে আসামিরা নিউইয়র্ক স্টেটের ‘এম্পায়ার স্টেট ডেভেলপমেন্ট প্যান্ডেমিক স্মল বিজনেস রিকভারি গ্র্যান্ট প্রোগ্রাম’-এর আওতায় একাধিক ভুয়া ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নামে আবেদন করেন।
করোনা তহবিলের ত্রাণ পেতে আবেদনকারীরা আবেদনে উল্লেখ করেন, সরকার থেকে পাওয়া অর্থ ব্যবসায় কর্মচারীদের বেতন, অফিস ভাড়া, গ্যাস-বিদ্যুৎ বিল ও সরঞ্জাম কেনার জন্য প্রয়োজন।
নিউইয়র্ক স্টেট ইন্সপেক্টর জেনারেলের অফিসে তদন্তে উঠে আসে, সরকারি অর্থ পাওয়ার পরপরই অধিকাংশ টাকা তাঁদের ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করা হয়। ব্যাংক রেকর্ড ও ট্যাক্স নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, তহবিল পাওয়ার আগে এসব প্রতিষ্ঠানের কোনো ব্যবসায়িক কার্যকলাপ ছিল না।
কুইন্স ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি মেলিন্ডা ক্যাটজ গণমাধ্যমকে বলেন, মহামারির মতো নজিরবিহীন সংকটে হিমশিম খাওয়া ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বরাদ্দ করা তহবিল চুরি করা গুরুতর অপরাধ। দোষ স্বীকারের মাধ্যমে আসামিরা এখন ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য।
নিউইয়র্কস্টেট ইন্সপেক্টর জেনারেল লুসি ল্যাং বলেন, দুর্যোগকালীন তহবিল ব্যক্তিগত লাভের জন্য ব্যবহার করলে তা আইনি পরিণতি বয়ে আনে। এ ধরনের অপরাধ শনাক্ত ও বিচারের আওতায় আনতে তাদের দপ্তর কাজ করে যাচ্ছে।
মায়ের মরদেহ বাসায় লুকিয়ে রেখে বছরের পর বছর পেনশন তুলেছেন নারী
নিউইয়র্ক স্টেট ইন্সপেক্টর জেনারেলের অফিস ২০২৪ সালের মে মাসে তদন্ত শুরু করে এবং মামলাটি কুইন্স ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির অফিসে হস্তান্তর করে। অভিযোগ জানার পর আসামিরা ২০২৫ সালের ৬-৯ মে এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে আত্মসমর্পণ করেন।
বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত জাকির চৌধুরী এ মামলার একজন আসামি। কুইন্স কাউন্ট্রি ক্রিমিনাল কোর্ট তাকে দেড় লাখ ডলার পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছেন। ইতিমধ্যে তিনি ৭৫ হাজার ডলার পরিশোধ করেছেন। ২৩ মার্চের মধ্যে বাকি টাকা পরিশোধ করবেন বলে জানান।
জাকির চৌধুরী বলেন, আমি চাইলে ট্রায়ালে যেতে পারতাম। আমার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের অফিস, কর্মচারী—সবই আছে। তিন বছর সময় লেগে যাবে এবং বদনামের ভাগীদার হব বলে আমি কোর্টের নির্দেশমতো টাকা পরিশোধ করছি। সরকারের নির্দেশমতো এটি এখন সেটেলড (মীমাংসা) হয়ে গেছে।
জাকির চৌধুরী বলেন, আমাকে মূলত এ পরিস্থিতিতে ফেলেছে আমার সাবেক ব্যবসায়িক পার্টনার কুমিল্লার খোকন আশরাফ। করোনার সময় আমার অফিসের নাম ব্যবহার করে খোকন আশরাফ সরকারি অনুদান নেওয়ার ব্যবস্থা করে। অনুদান পাওয়ার পর অর্ধেক টাকা সে নিয়ে যায়। এখন আমাকে জরিমানা দিতে হচ্ছে।
মামলার আরেকজন আসামি মোহাম্মদ চৌধুরী ওরফে খোকন আশরাফ। তিনি বলেন, কোর্টের নির্দেশনা পাওয়ামাত্র আমিই প্রথম ৭০ হাজার ডলার পরিশোধ করেছি। বিষয়টি ইতিমধ্যে সমাধান হয়ে গেছে।
মামলাটি প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, মহামারিকালীন তহবিল অপব্যবহারের অভিযোগে আরও কয়েকটি বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।