নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৫ অক্টোবর ২০২৬ দুপুর ১২:১০:৩৮
মার্কিন যুদ্ধজাহাজ কাছে এলেই হামলার হুঁশিয়ারি ইরানের
যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজ পারস্য উপসাগর ও ইরানের জলসীমার কাছে এলে হামলা চালানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। অন্যদিকে, ইরানে নতুন করে ব্যাপক হামলা চালানো হবে, নাকি নৌ অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে চাপ অব্যাহত রাখা হবে- তা নিয়ে ভাবছে ওয়াশিংটন। স্থানীয় সময় শুক্রবার (২৩ অক্টােবর) ফ্লোরিডায় এক সমাবেশে এ কথা জানান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। খবর আল জাজিরার।
ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ইরানের বিরুদ্ধে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামে পরিচিত ব্যাপক বোমাবর্ষণ অভিযান আবারও চালাতে পারে। এর আগে তিনি ইরানে বড় ধরনের হামলা চালিয়ে দ্রুত যুদ্ধ শেষ করা অথবা নৌ অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে তেহরানের ওপর চাপ অব্যাহত রাখার সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেন।
স্থানীয় সময় শনিবার (২৪ অক্টােবর) ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফের প্রধান আলী আবদোল্লাহি বলেন, ইরানের সামরিক সক্ষমতার কারণে মার্কিন নৌবাহিনীর পক্ষে দেশটির জলসীমায় বা আশপাশে ফিরে আসা সম্ভব নয়। তিনি দাবি করেন, ওই অঞ্চলে যেকোনো জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করার সক্ষমতা ইরানের রয়েছে।
আবদোল্লাহি বলেন, পারস্য উপসাগরে আবার মার্কিন সেনা ও সামরিক বাহিনীর প্রবেশের স্বপ্নই দেখতে পারেন ট্রাম্প। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ২৮ ফেব্রুয়ারির আকস্মিক হামলার জবাবে ইরান তাদের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে জড়িয়ে ফেলতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
হরমুজ প্রণালিতে হামলা, বাড়ছে তেলের দাম
হরমুজ প্রণালি ও আশপাশের জলপথে জাহাজে হামলার ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়েছে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১১৭ ডলারে পৌঁছেছে, যা এপ্রিলের পর সর্বোচ্চ।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করেছে, বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত সাতটি তেলবাহী জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে অথবা মাইনে আঘাত লেগেছে। শুক্রবার আরও দুটি সুপারট্যাংকার মাইনে আঘাত লাগার দাবি করে সংস্থাটি। তবে এসব দাবির স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
এদিকে, ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাতও অব্যাহত রয়েছে। শনিবার রিয়াদে আবারও হামলার খবর পাওয়া গেছে। এর আগে দাম্মামের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও শায়বাহ তেলক্ষেত্র লক্ষ্য করে হামলার ঘটনা ঘটে। জবাবে সৌদি বাহিনী হুথি-নিয়ন্ত্রিত ইয়েমেনের মারিব, তাইজসহ কয়েকটি প্রদেশে বিমান হামলা চালিয়েছে।
দক্ষিণ লেবাননেও ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত রয়েছে। শুক্রবার নাবাতিয়েহ এলাকার আশপাশে বিমান হামলা এবং জাওতার আশ-শারকিয়াহর কাছে গোলাবর্ষণের খবর পাওয়া গেছে। ইরান এর আগে দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেকোনো যুদ্ধবিরতির আওতায় লেবাননকেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
অন্যদিকে, হেবরনে ফিলিস্তিনি হামলায় দুই ইসরায়েলি সেনা নিহত হওয়ার পর অধিকৃত পশ্চিম তীরে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের নির্দেশ দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। আগামী ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলে নির্বাচন হওয়ার কথা, যার কয়েক দিন পর ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
নেতানিয়াহু ইরানের সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার ইচ্ছাও পুনর্ব্যক্ত করেছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ইরানের কয়েকটি গণমাধ্যম ও বিশ্লেষক দাবি করেছেন, দেশটি ‘ডেড হ্যান্ড’ নামে পরিচিত একটি কৌশল সক্রিয় করেছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের শীর্ষ নেতাদের আবার হত্যা করা হলে দেশের ৩১টি প্রদেশ থেকে মার্কিন, ইসরায়েলি ও আঞ্চলিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলা অব্যাহত রাখার ব্যবস্থা এটি। তবে এ দাবির স্বাধীন নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি।
ইরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে, দেশটির বেসামরিক অবকাঠামোতে আবার হামলা হলে সমুদ্রতলের ইন্টারনেট ও যোগাযোগের তারগুলোও লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। এদিকে, মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তথ্যের বরাতে জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন স্থানে মার্কিন কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে হামলার প্রস্তুতি বাড়িয়েছে ইরান। এ দাবির বিস্তারিত স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
ইস্তাম্বুলে কূটনৈতিক বৈঠক
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতায় আলোচনা এখনও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি পায়নি। তবে শুক্রবার তুরস্কের ইস্তাম্বুলে আঞ্চলিক ও ইউরোপীয় দেশগুলোর শীর্ষ কূটনীতিকেরা বৈঠক করেছেন। এতে তুরস্ক, সৌদি আরব, পাকিস্তান ও মিসরের পাশাপাশি যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি ও ইতালির প্রতিনিধিরা অংশ নেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান বৈঠকে ছিল না।
বৈঠকের পর তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বলেন, ইরানে নতুন হামলা হলে যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হবে এবং পুরো অঞ্চল সংঘাতে জড়িয়ে পড়বে। তার মতে, ইরানে সামরিক হস্তক্ষেপ কোনো সমাধান নয় এবং বর্তমানে কেউই তা সমর্থন করছে না।
জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়োহান ভাডেফুল মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতার জন্য ইরান ও হুথিদের দায়ী করেন। তবে চারটি আঞ্চলিক দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, মধ্যপ্রাচ্য ও এর বাইরের অস্থিতিশীলতার প্রধান উৎস ইসরায়েলি দখলদারত্ব।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের সমাধানে আঞ্চলিক দেশগুলো জুনে স্বাক্ষরিত ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক এবং আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি দিয়ে অবাধ জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে তারা। বেসামরিক মানুষ ও বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার বিরোধিতা করার পাশাপাশি সৌদি আরব ও লোহিত সাগরে দেশটির নৌবাণিজ্যিক স্বার্থে হুথিদের হামলার নিন্দা জানানো হয়েছে।
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল-সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যম নূর নিউজের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, কূটনৈতিক বক্তব্য ও যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতার মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। তাদের মতে, হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের তেহরানের দাবি মেনে নেওয়া এবং ইরান ও ইয়েমেনে হামলার দায় স্বীকার করার সঙ্গে যুক্ত।
ইরানের সংবাদপত্রগুলোতেও শনিবার যুদ্ধের আশঙ্কা ও তেলের দাম বৃদ্ধির বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। কট্টরপন্থী পত্রিকা ‘ভাতান-এ এমরুজ’ ব্রেন্ট তেলের দাম ১১৭ ডলার ছাড়ানোকে ট্রাম্পের জন্য ‘অপমানের প্রমাণ’ বলে উল্লেখ করেছে। সংস্কারপন্থী পত্রিকা ‘এতেমাদ’ লিখেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পদক্ষেপে যুদ্ধের আরেকটি তীব্র পর্যায় আসন্ন বলে মনে হচ্ছে।
তেহরানভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক রেজা নাসরি বলেছেন, কয়েক দশক ধরে হামলা, নিষেধাজ্ঞা, পারমাণবিক কর্মসূচিতে নাশকতা এবং চুক্তি ভঙ্গের অভিজ্ঞতার পর ইরান আর আগের অবস্থানে ফিরতে চায় না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লেখেন, বোমাবর্ষণের মধ্যে ইরান আর আলোচনা করবে না এবং প্রয়োজনীয় সব উপায়ে এই সংঘাতের চক্র শেষ করতে চাইবে।