নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সকাল ১০:৩১:২৫
আদালতের নিষেধাজ্ঞা: অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক জারি ট্রাম্পের
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপ করা পাল্টা শুল্ককে অভৈধ ঘোষণা করেছিল সেদেশের সর্বোচ্চ আদালত। সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়ে জানিয়েছেন, ট্রাম্প যে আইনের আওতায় এসব শুল্ক আরোপ করেছিলেন, সেই আইন তাঁকে এমন ক্ষমতা দেয় না। তবে রায়ের পরপরই ট্রাম্প নতুন করে সব দেশের পণ্যের ওপর ফের অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়ে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছেন।
রায়ে বলা হয়, ট্রাম্প ইন্টারন্যাশনাল ইমারজেন্সি ইকোনমিক পাওয়ারস অ্যাক্ট (আইইইপিএ) প্রয়োগ করে যে পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছিলেন, সেটি আইনের পরিধির বাইরে। ৯ সদস্যের বেঞ্চে ৬ বিচারপতি পাল্টা শুল্ককে অবৈধ ঘোষণার পক্ষে মত দেন, আর ৩ জন বিচারপতি ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের পক্ষে অবস্থান নেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে আদালত জানায়, জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে এভাবে আমদানি শুল্ক আরোপ করা আইনের অপব্যবহার।
রায় ঘোষণার পর হোয়াইট হাউসে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তিনি বলেন, সুপ্রিম কোর্টের এই রায় ‘জাতির জন্য অসম্মানের’। কয়েকজন বিচারপতির সমালোচনা করে তিনি মন্তব্য করেন, তাঁদের জন্য তিনি ‘সত্যিকারের লজ্জা’ বোধ করছেন। এমনকি বিচারপতিরা ‘বিদেশিদের স্বার্থ রক্ষা’ করেছেন বলেও অভিযোগ তোলেন তিনি।
আইনি বাধার মুখে পড়ে থেমে না থেকে ট্রাম্প ঘোষণা দেন, অন্য আইন প্রয়োগ করে সব দেশের পণ্যের ওপর বিদ্যমান শুল্কের সঙ্গে অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে। তিনি ইঙ্গিত দেন, যুক্তরাষ্ট্রের ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইন এবং ১৯৬২ সালের বাণিজ্য সম্প্রসারণ আইনের মতো বিধান ব্যবহার করে নতুন পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। তাঁর দাবি, এসব পথ অনুসরণ করলে আরও বেশি রাজস্ব আদায় সম্ভব হবে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই শুল্ককে বৈদেশিক নীতি ও বাণিজ্য আলোচনার কৌশল হিসেবে ব্যবহার করে আসছেন। গত বছরের জানুয়ারিতে দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতার নজিরবিহীন প্রয়োগ শুরু করেন। প্রায় সব বড় বাণিজ্যিক অংশীদারের ওপর নতুন শুল্ক আরোপ করে তিনি দিনটিকে ‘আমেরিকার স্বাধীনতা দিবস’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। কিন্তু বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য তা বড় ধাক্কা হয়ে আসে।
ট্রাম্পের ঘোষণায় প্রথমে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর ৩৭ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপ করা হয়। এর আগে থেকেই বাংলাদেশি পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রে ১৫ শতাংশ শুল্ক বিদ্যমান ছিল। ফলে মোট শুল্কহার দাঁড়ায় ৫২ শতাংশে। পরবর্তী আলোচনা-সমঝোতার মাধ্যমে গত বছরের জুলাইয়ে পাল্টা শুল্ক কমিয়ে ৩৫ শতাংশ করা হয়। পরে আগস্টে তা নেমে আসে ২০ শতাংশে।
চলতি মাসের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বাণিজ্যচুক্তি সই করে বাংলাদেশ। চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিভিন্ন পণ্য আমদানির শর্ত অন্তর্ভুক্ত হয় এবং বাংলাদেশের পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক ১ শতাংশ কমে ১৯ শতাংশে দাঁড়ায়। তবে আদালতের রায়ে পাল্টা শুল্ক বাতিল হওয়ায় এবং নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণায় মোট কার্যকর শুল্কহার কত হবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
বাংলাদেশ ছাড়াও চীন, ভারত, কানাডা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নিয়ে টানাপোড়েন চলে। তিন মাসের আলোচনার পর বেশ কয়েকটি দেশের সঙ্গে চুক্তি বা সমঝোতা হয়। ট্রাম্প জানান, তাঁর শুল্কের চাপের মুখে যে সব বাণিজ্যচুক্তি হয়েছে, তার অনেকগুলো বহাল থাকবে। ভারতের নাম আলাদাভাবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাদের সঙ্গে চুক্তি কার্যকর থাকবে।
মার্কিন পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইওয়াই-পার্থেননের প্রধান অর্থনীতিবিদ গ্রেগরি ডাকো বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, আদালতের রায়ের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের গড় শুল্কহার ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে কমে ৯ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে। তবে এই হ্রাস সাময়িক হতে পারে, কারণ প্রশাসন নতুন করে শুল্ক আরোপের বিকল্প পথ খুঁজছে।
সুপ্রিম কোর্টের রায়ে ট্রাম্প প্রশাসনের বাণিজ্য নীতিতে বড় ধাক্কা এলেও প্রেসিডেন্টের নতুন ঘোষণায় পরিস্থিতি আবার অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশসহ রপ্তানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। কারণ শুল্কহার সামান্য বাড়া-কমাও রপ্তানি প্রতিযোগিতায় বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
এখন নজর থাকবে—নতুন ১০ শতাংশ শুল্ক কবে থেকে কার্যকর হবে, কোন আইনের অধীনে তা বাস্তবায়িত হবে এবং আদালতে আবারও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে কি না। একই সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকেও পরিস্থিতি মূল্যায়ন ও সম্ভাব্য কূটনৈতিক উদ্যোগের দিকেই তাকিয়ে আছেন সংশ্লিষ্টরা।
তথ্যসূত্র : এএফপি, সিএনএন