নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ দুপুর ১২:৩৬:৩২
শিক্ষকতার বাইরে শিক্ষকরা করছে আরও ৩৭ প্রকারের কাজ
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা শিক্ষকতার বাইরে আরও ৩৭ প্রকারের নন-প্রফেশনাল কাজ করেন বলে জানাচ্ছে একটি গবেষণা।
৩ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি
(নেপ) আয়োজিত ‘বাংলাদেশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পেশাবহির্ভূত কর্মকাণ্ডে
সম্পৃক্ততার শিক্ষণ, শিখনগত ও অর্থনৈতিক প্রভাব মূল্যায়ন’ শীর্ষক গবেষণায় তুলে ধরা
হয় এ সব তথ্য। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা
ডা. বিধান রঞ্জন রায়। গবেষণায় মোট ৩৭ প্রকারের নন-প্রফেশনাল কাজ শনাক্ত করা হয়েছে,
যা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের করতে হয়।
জানা যায়, বিভিন্ন ধরনের জরিপে শিক্ষকরা সবচেয়ে বেশি সময়
ব্যয় করে। আর বিদ্যালয়ের রক্ষণাবেক্ষণ ও হোম ভিজিটে ব্যয় করেন সবচেয়ে কম সময়। মাসিক
গড়ে শিক্ষকপ্রতি প্রায় ২৪ ঘণ্টা কর্মঘণ্টা ব্যয় হচ্ছে নন-প্রফেশনাল কাজে।
গবেষণায় দেখা যায়, নন-প্রফেশনাল কাজে শিক্ষকরা যত বেশি
সময় ব্যয় করেন, সার্বিকভাবে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার তত কমে যায়। অতিরিক্ত দাপ্তরিক
কাজ শেষে শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করার পর ৯০ শতাংশ শিক্ষক পূর্ণ মনোযোগ ধরে রাখতে পারেন
না, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে শিক্ষার্থীদের ওপর।
৮৭ শতাংশ শিক্ষক মনে করেন, এর ফলে শিক্ষার্থীরা মৌলিক
বিষয়গুলো যথাযথভাবে বুঝতে পারে না এবং পরীক্ষার ফলাফলেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ
পিছিয়ে পড়া বা সুবিধাবঞ্চিত। এসব শিক্ষার্থীর জন্য ‘রেমিডিয়াল’ বা বিশেষ ক্লাস অত্যন্ত
প্রয়োজনীয় হলেও ৮৫ শতাংশ শিক্ষক জানিয়েছেন, নন-প্রফেশনাল কাজের চাপের কারণে তারা এসব
বিশেষ ক্লাস নিতে পারছেন না। অর্থনৈতিক দিক থেকে দেখা গেছে, বছরে প্রায় ১৯.৬৬ বিলিয়ন
টাকা সমমূল্যের শিক্ষকশ্রম প্রশাসনিক কাজে ব্যয়িত হচ্ছে।
একজন সহকারী শিক্ষক গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ৪ হাজার ১১৬
টাকার সমপরিমাণ সময় অ-পেশাদার কাজে ব্যয় করেন, যা বার্ষিক হিসেবে জনপ্রতি ৪৯ হাজার
৩৯৪.৫৫ টাকা। সারা দেশে ৩ লাখ ৪৬ হাজার ৩৪১ জন সহকারী শিক্ষকের নন-প্রফেশনাল কাজের
পেছনে বছরে মোট ১,৭১০,৭৩,৬০,৭৫১ টাকা ব্যয় হচ্ছে। এটি সরাসরি শিক্ষাখাতে বিনিয়োগ হলেও
এর সুফল শিক্ষার্থীরা পাচ্ছে না।
গবেষণার উপাত্ত অনুযায়ী, প্রধান শিক্ষকরা সহকারী শিক্ষকদের
তুলনায় বেশি সময় (গড়ে ২৭.৭৪ ঘণ্টা) নন-প্রফেশনাল কাজে ব্যয় করেন। মনস্তাত্ত্বিক দিক
থেকে দেখা যায়, জরিপে অংশগ্রহণকারী যেসব শিক্ষকের ক্ষেত্রে কর্মক্লান্তি বা বার্নআউট
নির্ণয় করা সম্ভব হয়েছে (২১৯ জন), তাঁদের মধ্যে ৯২.৬৯ শতাংশ ‘লেট-স্টেজ বার্নআউট’-এ ভুগছেন।
এই গবেষণার আলোকে প্রতীয়মান হয় যে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের
শিক্ষকদের ওপর নন-প্রফেশনাল কাজের অতিরিক্ত চাপ শিক্ষার মান, শিক্ষকের মানসিক স্বাস্থ্য
এবং শিক্ষার্থীদের শিখনফল-সবকিছুকেই নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করছে। এ প্রেক্ষিতে সুপারিশ
করা হয়েছে-ক্লাস চলাকালীন কোনো ধরনের তথ্য সংগ্রহ বা প্রশাসনিক কাজ শিক্ষকদের ওপর না
চাপানো, প্রতিটি বিদ্যালয়ে অফিস সহকারী বা ডিজিটাল অ্যাসিস্ট্যান্ট নিয়োগ, একক ডিজিটাল
পোর্টালের মাধ্যমে সব দাপ্তরিক কাজ সমন্বয়, শিক্ষকদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য ও স্ট্রেস
ম্যানেজমেন্ট প্রশিক্ষণ প্রদান এবং দীর্ঘমেয়াদে একটি ‘টিচিং আওয়ার প্রোটেকশন পলিসি’ প্রণয়ন করা।