শামীম আহমেদ জয়, মতলব উত্তর প্রতিনিধি
প্রকাশ : ১৪ মার্চ ২০২৬ সকাল ১১:৪৭:০৬
৩৮ বছরেও খনন হয়নি মেঘনা-ধনাগোদা সেচ প্রকল্পের খাল
গত ৩৮ বছরে মেঘনা-ধনাগোদা সেচ প্রকল্পের খাল সংস্কার না হওয়ায় জলাবদ্ধতার কারণে ফসল উৎপাদন কমেছে ৩০ হাজার মেট্রিক টন। ফলে কৃষক বঞ্চিত হচ্ছে অধিক মুনাফা থেকে।
চাঁদপুরের মতলব উত্তরে অবস্থিত দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মেঘনা-ধনাগোদা সেচ প্রকল্প ১৯৮৭–৮৮ অর্থবছরে নির্মাণ সম্পন্ন হলেও প্রকল্পের অভ্যন্তরে ছোট-বড় মিলিয়ে ১৫২.৬৪ কিলোমিটার খাল এখনও পূর্ণাঙ্গভাবে খনন হয়নি।
স্থানীয় কৃষকদের দাবি, মতলব উত্তর উপজেলার জলাবদ্ধতা প্রধানত তিন ধরনের—স্থায়ী, অস্থায়ী এবং মাঝারি। স্থায়ী জলাবদ্ধতার কবলে পড়েছে প্রায় ২,০০০ হেক্টর জমি, যেখানে সারা বছর পানি জমে থাকে। মাঝারি জলাবদ্ধতার কারণে প্রায় ৩,০০০ হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের ফলে স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলিয়ে মোট প্রায় ১২,০০০ হেক্টর জমি ক্ষতির মুখে পড়ে। যা কৃষকদের মারাত্মক ক্ষতির মুখে ফেলছে।
মেঘনা ধনাগোদা সেচ প্রকল্প সূত্রে, ৩৮ বছরে ১৫২.৬৪ কিলোমিটার খালের মধ্যে শুধুমাত্র ১২ কিলোমিটার খাল খনন করা হয়েছে। ১৪০.৬৪ কিলোমিটার খাল খনন করা হয়নি সেচ প্রকল্পের প্রতিষ্ঠার ৩৮ বছরেও ।
খালগুলোর অব্যবস্থাপনা ও অবৈধ দখলের কারণে এসব এলাকার পানি সঠিকভাবে নিষ্কাশিত হয় না, ফলে ফসল রোপণের মৌসুম গড়িয়ে যায় এবং প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ব্যাহত হচ্ছে। প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল নদী ও খালের দখল বন্ধ করে অধিক ফসল ঘরে তোলা। কিন্তু খাল দখল ও খনন না হওয়ায় সেচ কার্যক্রমে ভাটা পড়েছে এবং আবাদি জমি ধ্বংসের পথে। এছাড়া প্রকল্পের অভ্যন্তরে যত্রতত্র বাড়িঘর নির্মাণের কারণে প্রতিবছর ফসলি জমির পরিমাণ কমছে।
মতলব উত্তরের ৬৪ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ এবং প্রকল্পের অভ্যন্তরীণ ১৭,৫৮৪ হেক্টর জমি জলাবদ্ধতা থেকে রক্ষা ও ১৩,৬০২ হেক্টর জমিতে সেচের মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদনের উদ্দেশ্যে প্রকল্পটি নির্মিত হলেও এখনও সেই লক্ষ্য পূরণ সম্ভব হয়নি।
প্রকল্পের দুইটি পাম্প হাউস—উদমদী, কালিপুর ও দুইটি বুস্টার পাম্প এখলাসপুর ও ডুবগী দুইটি পাম্প হাউসের পাম্পের ধারন ক্ষমতা ২৫৫ কিউসেক করে পানি প্রবাহের সক্ষমতা রাখলেও বাস্তবে তা পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। বোরো মৌসুমে প্রায় ৭,০০০ হেক্টর জমির মধ্যে ৫,৬১৯.৭৪ হেক্টর গ্র্যাভিটি সিস্টেমের মাধ্যমে সেচ পায়,প্রায় ৮৮৬.৮৬ হেক্টর জমিতে কৃষকেরা নিজ উদ্যোগে টিউবওয়েলের মাধ্যমে পানি উত্তোলন করেন এবং প্রায় ৪৯৩.৪০ হেক্টর জমিতে লো-লিফট পাম্পের মাধ্যমে সেচ প্রদান করা হয়। উল্লেখযোগ্যভাবে, কিছু সেচ খাল ফেরোসিমেন্টের আওতায় আনা হয়েছে, যা জলপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল; অধিকাংশ মূল সেচ ও নিষ্কাশন খাল এখনও এর আওতার বাইরে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড, মেঘনা ধনাগোদা পওর বিভাগের উপ সহকারী প্রকৌশলী তন্ময় পাল বলেন, কালিপুর ও উদমদীর দুটি পাম্প হাউসের মোট ১০ টি মেশিন একসঙ্গে প্রায় ২৫৫ কিউসেক পানি সেচ দিতে সক্ষম। ইতিমধ্যে ধনাগোদা সেচ প্রকল্পের ১১৮.৪৪ কিলোমিটার খাল খনন প্রস্তাব করা হয়েছে।
তবে কাগজে-কলমে উল্লেখিত সক্ষমতা বাস্তবে কতটা কার্যকর, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়েছে। খাল দখল ও অবৈধ ভরাটের কারণে বর্ষা মৌসুমে পানি অপসারণ করা যায় না এবং বোরো মৌসুমে কৃষকের জমিতে সময়মতো পানি পৌঁছাতে সমস্যা হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলা প্রশাসনের নিয়মিত মনিটরিংয়ের অভাবে খালগুলো বেদখল হয়ে যাচ্ছে। প্রভাবশালী মহল অবৈধ ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে বালুব্যবসা পরিচালনা করছে। এর ফলে খালের স্বাভাবিক গতিপথ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং আবাদি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আর মেঘনা-ধনাগোদা সেচ প্রকল্পের পানি ব্যবস্থাপনা ফেডারেশনের কমিটিগুলো রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় গঠিত হওয়ায় প্রকৃত কৃষকেরা সঠিকভাবে অংশগ্রহণ করতে পারছেন না। কৃষকদের অভিযোগ, ৩০টি পানি ব্যবস্থাপনা দল, ৬টি অ্যাসোসিয়েশন ও একটি ফেডারেশন পানি উন্নয়ন বোর্ডকে লজিস্টিক সহায়তা দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তারা উপেক্ষিত। দায়িত্ব পালন করছে কৃষক নামধারী কিছু ঠিকাদার, যারা রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে কৃষকের স্বার্থের পরিবর্তে নিজেদের আখের গুছাতে ব্যস্ত।
স্থানীয় সচেতন মহল বলেন, মাঝে মাঝে বরাদ্দ এলেও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হয়না। কাগজে-কলমে কাজ দেখানো হলেও মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। ফলে জলাবদ্ধতার কারণে ফসলের ক্ষতি অব্যাহত রয়েছে এবং পর্যাপ্ত পরিকল্পনা ও খাল খননের অভাবে মতলব উত্তর তথা মেঘনা-ধনাগোদা সেচ প্রকল্পের সম্ভাবনাময় কৃষি ক্ষেত্র পূর্ণ সক্ষমতায় কার্যকর করা সম্ভব হচ্ছে না।
মতলব উত্তর উপজেলা’র কৃষি উদ্যোক্তা পরিষদ প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি মো. আতাউর রহমান সরকার বলেন, সঠিক তত্ত্বাবধান ও নিষ্কাশন খাল পুনঃখনন করা গেলে এই প্রকল্প এলাকায় সারা বছর ধানের পাশাপাশি বিভিন্ন সবজি উৎপাদন সম্ভব। কিন্তু অব্যবস্থাপনার কারণে স্থানীয় চাহিদা পূরণ না হয়ে বাইরে থেকে কোটি টাকার সবজি আমদানি করতে হচ্ছে। খাল পুনঃখনন ও সেচনালা সম্পন্ন করা গেলে বছরে চার মৌসুম ফসল উৎপাদন সম্ভব; অন্যথায় কৃষিজমি অনাবাদি হয়ে বনায়নের দিকে ঝুঁকে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ফয়সাল মোহাম্মদ আলী জানান, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ফসলের ক্ষতি অব্যাহত থাকবে এবং কৃষকেরা আরও বড় আর্থিক সংকটে পড়বেন।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাহমুদা কুলসুম মনি বলেন, বর্তমান সরকারের খাল খনন একটি মেগা প্রজেক্ট,আশা করছি অতি দ্রুতই মেঘনা ধনাগোদা সেচ প্রকল্পের খাল গুলো খনন হবে, আমরা ইতিমধ্যে দুটি খাল খননের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি পাঠিয়েছি।