আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ : ১২ আগস্ট ২০২৬ রাত ০৭:২৬:১৫
চীনের অর্থনীতিকে আমূলে বদলে দেওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী ঝুর মৃত্যু
চীনের অর্থনীতিকে আমূল বদলে দিয়ে দেশটিকে ‘বিশ্বের কারখানা’ বানানো দূরদর্শী সংস্কারক ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী ঝু রংজি মারা গেছেন। বুধবার দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের গণমাধ্যমের খবরে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
মার্কিন বার্তা সংস্থা এপি লিখেছে, তুলনামূলক কম ধৈর্যের অধিকারী ও ক্ষুরধার বাকপটু এই সংস্কারক ১৯৯০-এর দশকে চীনের রাষ্ট্রীয় শিল্পে আমূল পরিবর্তন আনেন এবং দেশটিকে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেন। এর মধ্য দিয়ে দেশটির অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে ত্বরাণ্বিত করার কাজে সহায়তা করেন তিনি।
চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত বার্তা সংস্থা সিনহুয়া বলেছে, বুধবার চীনের স্থানীয় সময় সকাল ১১টার দিকে বেইজিংয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন ঝু। মৃত্যুর সময় তার বয়স হয়েছিল ৯৭ বছর।
বিশ্বের অন্যান্য কমিউনিস্ট শাসিত দেশের সংস্কারের প্রশংসা করায় যাকে একসময় শারীরিক পরিশ্রমের জন্য প্রত্যন্ত গ্রামে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছিল, সেই ঝু ১৯৯৮ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত চীনের শীর্ষ অর্থনৈতিক ‘প্রধানমন্ত্রী’ পদে বসে চোখধাঁধানো পরিবর্তনের ধারা বাস্তবায়ন করেছিলেন।
রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে দক্ষ ও লাভজনক করে তোলার প্রক্রিয়ায় কমিউনিস্ট পার্টির রক্ষণশীল এবং রাষ্ট্রীয় শিল্প প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিলেন ঝু। এর ফলে লাখ লাখ মানুষ চাকরি হারালেও ২০১০ সালে জাপানকে পেছনে ফেলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পর চীনকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত করতে সহায়তা করে তার এই পদক্ষেপ।
দেশটির সাবেক নেতা দেং শিয়াওপিংয়ের ১৯৭৯ সালের সংস্কারকে আরও এগিয়ে নিয়ে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) চীনের সদস্যপদ লাভের মতো ইতিহাস সৃষ্টিকারী সব পরিবর্তন বাস্তবায়নে ঝুর বিচক্ষণতা ও দৃঢ়তাকে মূল চাবিকাঠি হিসেবে দেখা হয়; যা চীনকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় রপ্তানিকারক দেশে রূপান্তরে সাহায্য করে।
এসব পরিবর্তন ২০০০ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে চীনের বার্ষিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশের ওপরে নিয়ে যায়। আর ২০০৭ সালে তা বেড়ে সর্বোচ্চ ১৪ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছায়।
১৯৯৮ সালে ৬৯ বছর বয়সে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করা ঝু কর্মকর্তাদের ব্যর্থতা ও দুর্নীতির সমালোচনা এবং সরকারের ব্যর্থতার দায় নিজে স্বীকার করে দেশটিতে ব্যাপক জনপ্রিয় ব্যক্তিতে পরিণত হন। কঠোর চাহিদাপূর্ণ কাজের শৈলী দেশটিতে তাকে ‘বস’ এবং ‘ঝু ফেংজি’ বা ‘পাগলা ঝু’ ডাকনাম এনে দিয়েছিল।
চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি নিয়ন্ত্রিত সংবাদপত্র পিপলস ডেইলি বলেছে, ‘‘১৯৯৮ সালে ঝু বলেছিলেন, আমি এখানে ১০০টি কফিন প্রস্তুত রেখেছি; ৯৯টি দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের জন্য এবং একটি আমার নিজের জন্য।’’
দলের শীর্ষ পর্যায়ে প্রেসিডেন্ট জিয়াং জেমিন এবং আলঙ্কারিক আইনসভা ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের চেয়ারম্যান লি পেংয়ের পরই তিন নম্বরে ছিল ঝুর অবস্থান। যদিও নিজস্ব কোনো শক্ত রাজনৈতিক বলয় না থাকায় টেকনোক্র্যাট হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হয় তাকে। ঝু প্রায়ই ক্ষোভ প্রকাশ করে বলতেন, এই কারণে অনেক কর্মকর্তা তার আদেশ উপেক্ষা করতেন।
১৯৯০-এর দশকে উপ-প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন চীনের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করে ঝু নিজের পরিচিতি তৈরি করেন। তিনি মূল্য নিয়ন্ত্রণ বিধি কার্যকর এবং লোকসানি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে ঋণ দেওয়া বন্ধ করে দেন। এ সময় স্থানীয় নেতাদের প্রতিরোধকে উপেক্ষা করেন তিনি। আর এই একই কৌশলে তিনি পরবর্তীতে সংস্কারের গতি নিয়ে রক্ষণশীলদের বিরুদ্ধে লড়াই করেন।
১৯৮০-এর দশকে শুরু হওয়া দীর্ঘ আলোচনার পর ডব্লিউটিওর সদস্যপদ নিশ্চিত করার চীনা প্রচেষ্টায় নেতৃত্ব দেন ঝু। বৈশ্বিক বাণিজ্য সংস্থায় চীনের অন্তর্ভূক্তির এই মর্যাদা মুক্ত বাণিজ্যকে দেশটিতে জাতীয় অঙ্গীকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে; যা পছন্দের প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুরক্ষা দেওয়া বন্ধে স্থানীয় কর্মকর্তাদের বাধ্য করার একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন ঝু।
১৯৯৯ সালে ডব্লিউটিওতে চীনের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিতে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন পাওয়ার আশায় ঝু যখন বাজার উন্মুক্ত করার বেশ কিছু প্রস্তাব নিয়ে ওয়াশিংটনে যান, তখন তার সেই প্রচেষ্টা প্রায় ভণ্ডুল হতে বসেছিল। ক্লিনটন প্রশাসন তার প্রস্তাবকে নাজুক বলে প্রত্যাখ্যান করে। অন্যদিকে নিজ দেশের রাজনৈতিক শত্রুরা তার বিরুদ্ধে অতিরিক্ত ছাড় দেওয়ার অভিযোগ তোলেন। কিন্তু ঝু সেই সঙ্কট উতরে যান এবং ২০০১ সালের ডিসেম্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে ডব্লিউটিওতে যোগদান করে চীন।
১৯৯৮ সালে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর ফ্ল্যাট বিক্রি করার এক উদ্যোগের মাধ্যমে চীনে ব্যক্তিগত আবাসন খাতের জোয়ার আনেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। পরিবারগুলো সেসব কিনতে দ্রুত এগিয়ে আসে এবং এক দশকের মধ্যে শহরাঞ্চলের অধিকাংশ আবাসন ব্যক্তিগত মালিকানায় চলে আসে।
তা সত্ত্বেও, মুক্ত উদ্যোগের সমর্থক হওয়ার চেয়ে পার্টির আদেশ বাস্তবায়ন করে রাষ্ট্রীয় শিল্পকে পুনর্গঠন করার মতো একজন দক্ষ আমলা বনে যান ঝু। অর্থনীতিকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার বা বেসরকারীকরণের ক্ষেত্রে কোনো আগ্রহ দেখাননি তিনি। ১৯৯০-এর দশকে ব্যাংক, বিমান সংস্থা, তেল কোম্পানি এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারিকরণ বজায় রেখেই মুনাফামুখী কর্পোরেশনে রূপান্তর করার পরিকল্পনা তৈরিতে মূল ভূমিকা পালন করেন তিনি।
১৯২৮ সালের ২৩ অক্টোবর মাও সেতুংয়ের নিজ প্রদেশ হুনানে জন্মগ্রহণকারী ঝু ঝুঁকি গ্রহণ এবং স্পষ্ট কথা বলার জন্য কর্মজীবনের শুরুতেই মাসুল গুনেছিলেন।
অর্থনৈতিক পরিকল্পনাকারী হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করলেও ১৯৫৭ সালে হাঙ্গেরি ও যুগোস্লাভিয়ার সংস্কারের প্রশংসা করায় তাকে ‘ডানপন্থী’ তকমা দেওয়া হয়। এর ফলে তার ক্যারিয়ার ২২ বছরের জন্য স্থবির হয়ে পড়ে। ১৯৬৬-৭৬ সালের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় শারীরিক পরিশ্রম করার জন্য তাকে নির্বাসিত করা হয় গ্রামে।
১৯৭৯ সালে পুনর্বাসিত হয়ে দ্রুত পদোন্নতি পান ঝু। তিনি ১৯৮৭ সালে সাংহাইয়ের ডেপুটি পার্টি সেক্রেটারি এবং পরের বছর মেয়র হন। ১৯৮৯ সালে মেয়র থাকাকালীন বিক্ষোভকারীদের দমন এবং সামরিক বাহিনী না ডাকার অঙ্গীকার করে পরিমিতিবোধ ও সহনশীলতার খ্যাতি অর্জন করেন ঝু।
১৯৯১ সালের ‘দ্য প্রু-ডেমোক্রেসি প্রটেস্টস ইন চায়না: রিপোর্টস ফ্রম দ্য প্রভিন্সেস’ বইয়ে অস্ট্রেলীয় কূটনীতিক শেলি ওয়ার্নার লিখেছেন, সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হলে যে উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতির জন্ম হতো, ঝু অত্যন্ত সূক্ষ্মতার সাথে তা নিষ্ক্রিয় করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
ঝুর উর্ধবতন কর্মকর্তা জিয়াং জেমিনকে শিগগিরই দেং জিয়াওপিং বেইজিংয়ে ডেকে নিয়ে পার্টির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব দেন। এরপর ১৯৯১ সালে উপ-প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত হন ঝু এবং ১৯৯৩ সালে পার্টির শাসন পরিচালনাকারী স্থায়ী কমিটিতে যোগ দেন তিনি।
সরকারি ভুল স্বীকার ও দায় নেওয়ার মাধ্যমে নেতাদের ‘ভুল না করার’ প্রথাগত ধারণাকে ভেঙে দিয়েছিলেন ঝু।
১৯৯৮ সালে গ্রীষ্মকালীন বন্যায় ৪ হাজার ১৫০ জন মারা যাওয়ার পর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের জন্য বরাদ্দ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়। সেই সময় ক্ষোভ প্রকাশ করে ঝু বলেছিলেন, কিছু বাঁধ ‘সিমের বীজের গুড়ার’ চেয়েও দুর্বল।
এই ঘটনার তিন বছর পর দক্ষিণ চীনে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিস্ফোরণে অন্তত ৪২ জন নিহত হয়। প্রাণহানির এই ঘটনায় মন্ত্রিসভা জনগণকে সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় জাতীয় টেলিভিশনে ক্ষমা চেয়েছিলেন তিনি।
ঝু প্রকাশ্যে কৌতুক করে, এমনকি মাঝে মাঝে নিজেকে নিয়েও রসিকতা করে পার্টির একঘেয়ে ভাবমূর্তি দূর করেছিলেন। ১৯৯৯ সালের এক সংবাদ সম্মেলনে নিজের একটি ছবি দেখিয়ে তিনি বলেছিলেন, ছবিতে আমাকে মরা মানুষের মতো লাগছে। তখন পুরো সভাকক্ষে হাসির রোল পড়ে যায়।
উপ-প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ঝুর সবচেয়ে গর্ব করার মতো সাফল্যগুলোর একটি ছিল এমন এক কর ব্যবস্থা তৈরি করা; যা স্থানীয় কর্মকর্তাদের সংগৃহীত রাজস্বের বড় অংশ বেইজিংয়ের কেন্দ্রীয় তহবিলে জমা দিতে বাধ্য করেছিল। ১৯৯৬ সালে তিনি বলেছিলেন, এই কাজের জন্য তার অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়া উচিত।
প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে অবসর নেওয়ার পর চীনের অর্থনীতির এই রূপকার জনসম্মুখে আর খুব বেশি দেখা যায়নি।
সূত্র: এপি, এনসিবিসি নিউজ।