নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সকাল ১১:৫০:৩৬
ইরানের প্রতি ট্রাম্পের কঠোর শর্ত কেবল কৌশল?
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে যে শর্ত দিয়েছেন তা তেহরান কি মানবে? যদি না মানে তবে ইরানে হামলার পথ ট্রাম্পের জন্য উন্মুক্ত হবে। তাই এই শর্ত আরোপ ট্রাম্পের কৌশল বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, আরব সাগরে বিমানবাহী রণতরী নিয়ে যুদ্ধংদেহী ইরানের চোখের সামানে দীর্ঘদিন অবস্থান করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কঠিন।
মিডলইস্ট আইয়ের এক প্রতিবেদনে এ সব তথ্য উঠে এসেছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক পর্যবেক্ষক সংস্থা চাথাম হাউজের
পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী ব্রোনওয়েন ম্যাডোক্স মনে করেন, এখানে ট্রাম্পের কৌশল সবচেয়ে
ধূর্ত ও মজার। কারণ শর্তগুলো ইরানের মানতে খুবই কষ্ট হবে। বিশেষ করে ব্যালিস্টিক মিসাইল
সক্ষমতা ধ্বংস করে দেওয়ার দাবি কখনো মানবে না তেহরান। আর এতেই ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের
সামনে হামলার পথ উন্মুক্ত হবে।
ম্যাডোক্স বলছেন, মিসাইলই ইরানের একমাত্র রক্ষাকবচ, যেগুলো
শত্রুদের হাত থেকে ইরানকে রক্ষা করে আসছে।
এসব মিসাইল ছাড়া ইসরায়েলের বিমান ও যুক্তরাষ্ট্রের স্টিলথ বোম্বারের কাছে ইরানের
আকাশ উন্মুক্ত হয়ে যাবে। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয়বারের মতো হামলা শুরু করবে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, তিনি আশা
করেন আলোচনা শিগগির আবার শুরু হবে। আগামী সপ্তাহে আরও এক দফা আলোচনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন
তিনি। শনিবার আল জাজিরাকে তিনি বলেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি কখনই আলোচনাযোগ্য
বিষয় নয়। তিনি সতর্ক করে দেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানি ভূখণ্ডে আক্রমণ করলে তেহরান মধ্যপ্রাচ্যে
মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করবে।
মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞ আবদুল্লাহ আল-শায়জি বলেন,
দুই শত্রু দেশে মধ্যে একটি নতুন চুক্তির আশা করা যায়। কিন্তু শান্তি ফেরার আশাবাদ দেওয়া
কঠিন। কাতারের রাজধানী দোহায় আল জাজিরা ফোরাম থেকে আল-শায়জি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের
একটি শক্তিশালী অবস্থান রয়েছে। ইসরায়েলের প্ররোচনায় ইরানীদের ওপর চাপ প্রয়োগ করছে
যুক্তরাষ্ট্র।
ট্রাম্প প্রশাসন মনে করে, বিক্ষোভকেন্দ্রিক ইরান সরকার
এখন দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। এই অবস্থায় চাপ প্রয়োগ করে উদ্দেশ্য সাধন করা যাবে। কিন্তু
ইরান নিজেদের প্রতিরক্ষার বিষয়টি অবিচ্ছেদ্য অধিকার বলে মনে করে।
আল-শায়জি মনে করেন, রণতরী দিয়ে দীর্ঘমেয়াদী চাপ প্রয়োগ
করতে পারবে না যুক্তরাষ্ট্র। আরাঘচি আশা প্রকাশ করেছেন, ওয়াশিংটন ‘হুমকি এবং চাপ’ থেকে বিরত থাকবে, যাতে
আলোচনা অব্যাহত থাকে।
ইরানকে পাঁচ শর্ত, যা মানা অসম্ভব
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম মারিভ জানিয়েছে, প্রথম দফার আলোচনায়
যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কাছে পাঁচটি প্রধান শর্ত জানিয়েছে। সেগুলো হলো- সমৃদ্ধ করা ৪০০
কেজি ইউরেনিয়াম তৃতীয় কোনো দেশে সরিয়ে ফেলতে হবে। ইরানের পারমাণবিক অবকাঠামোর বিলীন
ঘটাতে হবে। ব্যালিস্টিক মিসাইল সক্ষমতা ধ্বংস করতে হবে। মিসাইল কর্মসূচি বন্ধ করতে
হবে এবং সিরিয়া, ইয়েমেন, ইরাক ও লেবাননে সশস্ত্র মিত্রদের সহায়তা বন্ধ করতে হবে।
কোনোভাবেই ছাড় দিতে চান না ট্রাম্প
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ওমানের মাস্কাটে প্রথম দফার
আলোচনায় যুদ্ধের হুমকি কমলেও দুদেশের মধ্যে উত্তেজনা আগের মতোই আছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট
ডোনাল্ড ট্রাম্প কোনোভাবেই ইরানকে ছাড় দিতে চান না। তিনি ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে
নিষেধাজ্ঞাও জারি করেছেন।
ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যে জড়িত দেশগুলোরও ওপর শুল্ক হুমকি
জারি করেছেন। এই অবস্থায় ইরান নিজের অনড় অবস্থান ব্যক্ত করে বলেছে, আলোচনা শুধু পরমাণু
কর্মসূচি নিয়ে হচ্ছে। মিসাইল প্রসঙ্গে এখানে কোনো আলোচনা হবে না। কারণ বিষয়টি ইরানের
নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত।
ট্রাম্পের উদ্দেশ্য
হাসিলের একমাত্র পথ শক্তি প্রয়োগ
যুক্তরাষ্ট্র মূলত শক্তি প্রয়োগ করেই শান্তি আনতে চায়
এমন মনোভাব দেখাচ্ছে। ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জামাতা জ্যারেড কুশনার শনিবার
আরব সাগরে অবস্থানরত বিমানবাহী রণতরী পরিদর্শন করেন।
পরে সামাজিক মাধ্যমে এক পোস্টে উইটকফ বলেন, ‘বিমানবাহী
রণতরী আমাদের নিরাপদ রাখছে এবং শক্তির মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শান্তির বার্তা
সমুন্নত রাখছে। গত মঙ্গলবার স্পষ্ট উদ্দেশ্য ছাড়াই বিমানবাহী রণতরীটির কাছে আসা একটি
ইরানি ড্রোন ধ্বংসকারী পাইলটের সঙ্গেও কথা বলেন উইটকফ।
এ সময় মার্কিন নৌবাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান, নৌবাহিনীর
অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার সঙ্গে ছিলেন। উইটকফ বাহিনীর প্রশংসা করেন।
অন্যদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু
তড়িঘড়ি ছুটে যাচ্ছেন ওয়াশিংটনে। সেখানে আগামী বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের
সঙ্গে বৈঠক করবেন তিনি।
নেতানিয়াহুর কার্যালয় শনিবার জানিয়েছে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী
এই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলার হুমকি দিয়েছেন। আলোচনার মধ্যে ব্যালিস্টিক
ক্ষেপণাস্ত্র সীমিত করার বিষয়টি থাকা উচিত। তাছাড়া হামাস ও হিজবুল্লাহর মতো মিত্রশক্তির
প্রতি ইরানের সমর্থন বন্ধ করাও আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত চান নেতানিয়াহু।
ইরানকে রক্ষায় যুদ্ধে যাবে হাজারও ইরাকি স্বেচ্ছাসেবক
ইরানের ওপর মার্কিন হামলা থেকে ইরানকে রক্ষা করতে হাজার
হাজার ইরাকি নাগরিক একটি অঙ্গীকারে স্বাক্ষর করেছে।
একটি বিবৃতি অনুসারে, ‘ইরাকের দিয়ালা প্রদেশে প্রায় ৫ হাজার নাগরিক কোনো ক্ষতিপূরণ ছাড়াই যুদ্ধে ইরানকে সহায়তা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত। এজন্য পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস ইরানকে সমর্থন দিতে প্রস্তুত রয়েছে।’
সূত্র: আলজাজিরা ও মিডলইস্ট
আই