৩ বছরেও সুরাহা হয়নি হত্যা রহস্যের শাহরাস্তিতে শিশু তাহারাত হত্যাকান্ড নিয়ে ধুম্রজাল

মোহাম্মদ বিপ্লব সরকার, চাঁদপুর প্রতিনিধি: শাহরাস্তিতে ৩ বছরেও সুরাহা হয়নি শিশু তাহারাত হত্যাকান্ডের। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশানের (পিবিআই) তদন্তে শিশুটিকে জবাই করে হত্যা ও ঘটনার সাথে জড়িত এক আসামী আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিলেও ময়না তদন্ত রিপোর্টে ওই শিশুকে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। এখন পর্যন্ত এই মামলায় একজন আসামী আটক হলেও ঘটনার সাথে আরও লোক জড়িত থাকতে পারে বলে দাবী করেছে হতভাগ্য ওই শিশুর পিতা মোঃ মনির হোসেন। এদিকে চলতি বছরের প্রথমদিকে তাহারাত হত্যাকান্ডের আদলেই ঢাকা মহানগরীর দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে হত্যা করা হয় মাদরাসা ছাত্র মোঃ মোকছেদুলকে (১৭)।
যার সাথে জড়িত থাকায় তাহারাত হত্যাকান্ডের একমাত্র আসামী শাহরাস্তি উপজেলার সেতীনারায়নপুর গ্রামের আরিফ হোসেন, একই উপজেলার মোঃ রাজু (আরিফের বন্ধু) ও চট্টগ্রামের কোতয়ালী থানাধীন চাকতাই এলাকার ফাহিমকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক মোঃ ইমদাদুল ইসলাম তৈয়ব। জানা যায়, শাহরাস্তি উপজেলার চিতোষী পশ্চিম ইউনিয়নের আয়নাতলী দক্ষিণ পাড়া জিয়াউদ্দিন পাটোয়ারী বাড়ির মৃতঃ হেদায়েত উল্যাহর পুত্র মোঃ মনির হোসেনের শিশু পুত্র মোঃ আশরাফুল ইসলাম তাহারাত(১১) ২০১৭ সালের ২৪ আগস্ট বৃহস্পতিবার নিখোঁজ হয়।
শাহরাস্তি থানা এলাকা, লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ ও নোয়াখালীর চাটখিল এলাকায় ব্যপক খোঁজাখুঁজি ও মাইকিং অব্যহত থাকাবস্থায় গত ২৬ আগস্ট দুপুরে পুলিশ পার্শবর্তী সেতীনারায়ন পুর গ্রামের স্পেন প্রবাসী নূরু ভুঁইয়ার বাড়ির পরিত্যাক্ত রান্নাঘর হতে লাকড়ি ও খড়কুটা চাপা অবস্থায় ভিকটিমের লাশ উদ্ধার করে। বেশ কয়েকদিন লাশ পড়ে থাকায় লাশের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকৃত হয়ে যায়। ঘটনার ১মাস পর ২২ সেপ্টেম্বর লাশের ময়নাতদন্ত রিপোর্টের ভিত্তিতে ভিকটিমকে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করা হয়েছে নিশ্চিত হবার পর ওইদিন ভিকটিমের পিতা মোঃ মনির হোসেন বাদী হয়ে শাহরাস্তি থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করে।
শাহরাস্তি থানাধীন উঘারিয়া তদন্ত কেন্দ্রের তদানীন্তন উপ-পরিদর্শক মোঃ রফিকুল ইসলামকে মামলাটির তদন্তভার দেয়া হয়। দীর্ঘ সময় পুলিশ এই মামলার কোন ক্লু উদ্ধারে সক্ষম না হওয়ায় পরবর্তীতে মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশানকে (পিবিআই) তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয়। ঘটনার পর হতে প্রায় আড়াই বছর ওই এলাকার সেতীনারায়নপুর গ্রামের মফিজ মিয়ার পুত্র আরিফ হোসেন এলাকায় অনুপস্থিত থাকলেও তাকে ভিকটিমের পরিবার বা পুলিশ কেউ সন্দেহ করে নি। চলতি বছরে ঢাকা মহানগরীর দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার একটি হত্যা মামলায় গত ২৭ ফেব্রুয়ারী রাতে চট্টগ্রামের বাকলিয়া থানার মাষ্টার বউবাজার বাউল সাহেবের বাড়ি হতে আরিফকে আটকের পর বিষয়টি এলাকায় চাউর হয়।
তাহারাত হত্যাকান্ডে আরিফ জড়িত থাকতে পারে মর্মে ভিকটিমের পিতা মোঃ মনির হোসেন পুলিশকে জানালে ওই মামলায় তাকে আটক দেখিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। গত ৮ আগস্ট আসামী আরিফ হোসেন চাঁদপুরের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ কামাল হোসাইনের আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। জবানবন্দিতে সে জানায়, ঘটনার আগে সে ঢাকায় একটি জিন্স প্যান্ট ওয়াশ কোম্পানীতে কাজ করতো। সেখানে এক বড় ভাইয়ের সাথে তার পরিচয় হয়। তার বিদেশ যাওয়ার খুব শখ কিন্তু অর্থের যোগান নেই একথা জানার পর ওই বড়ভাই তাকে এলাকা হতে বাচ্চা অপহরণ করে তার অভিভাবক হতে মুক্তিপণ আদায়ের মাধ্যমে বিদেশ যাওয়ার অর্থ উপার্জনের পরামর্শ দেয়। সে মতে সে বাড়ি চলে আসে এবং গ্রামে থাকাবস্থায় ওই পরামর্শের কথা মনে পড়ে। পরিকল্পনা অনুযায়ী সে ভিকটিমের বাড়ির সামনে মাচাংয়ে আড্ডা দিতে থাকে। ঘটনার দিন (২৪ আগস্ট ২০১৭) বিকেল ৪ টার দিকে মাচাংয়ে বসা অবস্থায় ভিকটিম আরিফের কাছে কুরবানির গরুর বাজার কোথায় জানতে চায়। আরিফ ভিকটিমকে নূরু ভুঁইয়ার বাড়ির সামনে বসতে বলে এবং আরিফ তার চাচার বাড়ি গিয়ে ১৫/২০ মিনিটের মধ্যে ফিরে আসে।
সন্ধ্যা ৫টা বা সাড়ে ৫টার দিকে আরিফ ২টি পাখি ধরে আনার প্রলোভনে ভিকটিমকে নূরু ভুঁইয়ার বাড়ির পিছনে খালি জায়গায় নিয়ে শুইতে বলে। ভিকটিম শুইলে আরিফ তার বুকের উপর বসে এবং তার দু’হাত পায়ের নিচে চাপ দিয়ে ধরে। বাম হাতে ভিকটিমের মুখ চেপে ধরে ডানহাতে থাকা চাকু দিয়ে তাকে জবাই করে। ৫ মিনিটের মধ্যে ভিকটিমের মৃত্যু হলে তার দেহ রান্নাঘরের জানালা দিয়ে ভিতরে ফেলে দেয় এবং চাকুটি বাড়ির বাউন্ডারির বাইরে থাকা জমিতে গেঁথে রাখে। এরপর বাড়িতে গিয়ে গোসল করে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে থাকে। রাত ৮টার দিকে এলাকার ছেলেদের সাথে তাহারাতকে খুঁজতে বের হয় পরদিন শুক্রবার ঢাকা চলে যায়। যে বড় ভাইয়ের পরামর্শে সে শিশু অপহরণের সিদ্ধান্ত নেয়, সে বড় ভাইয়ের নাম তার মনে নেই বলে সে স্বীকারোক্তিতে আদালতকে জানায়। এদিকে ঢাকা মহানগরীর দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা এলাকায় চলতি বছরের ২৪ ফেবুয়ারি আগানগর ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের মানিক হাজী বাড়ির ৩য় তলার বাসিন্দা পটুয়াখালী জেলার বাউফলের প্লেনসীট ব্যবসায়ী মোঃ শাহাবুদ্দিন চৌকিদারের ছেলে একটি মাদরাসার কিতাবখানার ছাত্র মোঃ মোকছেদুলকে (১৭) অপহরণ করে ২ কোটি টাকা মুক্তিপণ দাবী করে শাহরাস্তি উপজেলার সেতীনারায়নপুর গ্রামের আরিফ হোসেন, একই উপজেলার মোঃ রাজু (আরিফের বন্ধু) ও চট্টগ্রামের কোতয়ালী থানাধীন চাকতাই এলাকার ফাহিম (ভিকটিমের সহপাঠি)।
মোকছেদুলের বাবা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে কিছু টাকা পরিশোধ করলেও তার ছেলেকে ফেরত না পেয়ে র‌্যাপিড একশন ব্যাটালিয়ানের (র‌্যাব-১০) শরণাপন্ন হয়। র‌্যাব তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে ফাহিমকে আটক করলে তার দেয়া তথ্যমতে কেরানীগঞ্জ থানাধীন হাবিব নগর রতনের খামারের পাশে পরিত্যাক্ত বালুর মাঠের নিচু জমিতে মাটিচাপা দেয়া অবস্থায় মোকছেদুলের গলাকাটা মৃতদেহ উদ্ধার করে। এ ঘটনায় দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার (মামলা নং ৫০/১১০) মামলায় আসামীদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয়া হয়েছে। এদিকে মুক্তিপনের জন্য মোঃ আশরাফুল ইসলাম তাহারাতকে একাই আরিফ হোসেন হত্যা করেছে একথা মানতে রাজি নয় ভিকটিমের পিতা ও মামলার বাদী মোঃ মনির হোসেন। তার মতে, আরিফ একার পক্ষে তার পুত্রকে হত্যা করতে সক্ষম নয়। আরিফের সাথে আরও লোকজন জড়িত থাকতে পারে।
মুক্তিপণ আদায়ের জন্য তার ছেলেকে আটক করা হলেও তার কাছে কেউ মুক্তিপণ দাবী করেনি। ভিকটিমের মৃতদেহ উদ্ধারের সময় তার মাথা হতে কোমর পর্যন্ত এসিড দিয়ে ঝলসে দেয়া হয়েছে। ঘটনার সময় ওই বাড়ির মঞ্জুর হোসেন প্রঃ বাবু’র অটোরিক্সার ব্যাটারির এসিড শূন্য ছিল। আদালতের স্বীকারোক্তিতে আরিফ যে বড় ভাইয়ের কথা বলেছিলো সেই বড় ভাইয়ের নাম না বলে এ ঘটনায় জড়িত অন্যদের বাঁচাতে চাচ্ছে। তিনি তার ছেলে হত্যার সুষ্ঠ বিচারের জন্য এ ঘটনায় জড়িত অন্য আসামীদের খুঁজে বের করার দাবী জানান। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশানের (পিবিআই)পরিদর্শক মোঃ কবির হোসেন জানান, আদালতের স্বীকারোক্তিতে আসামী আরিফ হোসেন একাই হত্যার দায় স্বীকার করেছে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ পত্র প্রদানের প্রস্তুতি চলছে।