৩০ বছর ধরে ভাঙছে, আমাগো সব জমি নদীতে চলে গেছে

মাহফুজুর রহমান বাপ্পী, বাগেরহাট প্রতিনিধি: ৩০ বছর ধরে ভাঙছে, একেরপর এক ভাঙনের কবলে পড়ে আমাগো সব জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এখন আর জমির কোনো আসা নাই। বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার সাউথখালী ইউনিয়নের বগী ও গাবতলা এলাকার বেড়িবাঁধ সংলগ্ন বাসিন্দা বিধবা শাহানা বেগম (৬০) এমন মন্তব্য করেন।

তিনি জানান, গত ৩০ বছর আগে আমাদের এলাকার অনেকের জমি ছিলো বর্তমান নদীর অঁাধা কিলোমিটার মধ্যবর্তী স্থানে। যা ভাঙতে ভাঙতে এখন আমাদের সম্পূর্ণ জমি নদী গর্ভে।

সাউথখালীর গাবতলা আশার আলো মসজিদ এলাকার ৩৫/১ পোল্ডারের বেড়িবাঁধের ভাঙন দেখতে গেলে এমন কথাই বলেন ওই বিধবা স্ত্রী ।

প্রতি বছরের ন্যয় বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই দেখা দিয়েছে শরণখোলার বগী ও গাবতলা এলাকার পানি উন্নয়ন বোর্ডের ৩৫/১ পোল্ডারের প্রায় দুই কিলোমিটার পুরাতন বাঁধ ও রিং বাঁধে ভাঙন। যার ব্যাপকতা দিনদিন বেড়েই চলেছে।

(৯ এপ্রিল) শনিবার রাত ৮ টার দিকে দক্ষিণ সাউথখালীর আশার আলো মসজিদ কাম সাইক্লোন সেল্টারের সামনের প্রায় ৫০ ফুট রিং বাঁধ সম্পূর্ণ ভেঙে যায়। ভাঙনের কারনে রাতে জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হতে পারে ওই এলাকার তিনটি গ্রাম। এতে রাতের ঘুম শেষ সেখানকার শতশত পরিবারের। ভাঙন এলাকার আল আমিন এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) উপকূলীয় বাঁধ উন্নয়ন প্রকল্প ফেজ-১ (সিইআইপি-১) এর ৬২ কিলোমিটার টেকসই বেড়িবাঁধের ৮০ ভাগ নির্মান কাজ প্রায় সম্পন্ন হলেও ঝুকিপূর্ণ ওই এলাকায় ৫ বছরেও কাজ শুরু হয়নি। যার ফলে নদী ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে সেখানকার শতশত একর ফসলি জমি ও তিন গ্রামের সহস্রাধিক পরিবার। এর আগে শুক্রবার পূর্ণিমার জোয়ারে আশার আলো মসজিদ এলাকার রিং বাঁধের বাহিরের প্রায় দুই বিঘা জমি নদী গর্ভে বিলিন হয়ে যায় । এখনো ঝুঁকিতে রয়েছে প্রায় চারটি পয়েন্ট । নদী শাসন ও জমি অধিগ্রহন জটিলতায় প্রায় পাঁচ বছর ধরে ঝুলে আছে ওই এলাকার দুই কিলোমিটার বাঁধের নির্মানকাজ।

এদিকে ভাঙনের খবর পেয়ে শনিবার দুপুরে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাগেরহাটের নির্বাহী প্রকৌশলী নাহিদুজ্জামান,শরণখোলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সরদার মোস্তফা শাহিন ও সিইআইপির প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন । একইদিনগত রাতে নতুন করে ভাঙন দেখা দিলে রাতেই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে ছুটে গিয়ে রিং বাঁধের ব্যবস্থা করেন।

এলাকাবাসী অভিযোগ করে বলেন, বলেশ্বর নদীর বগী ও দক্ষিণ সাউথখালীর বাঁধ সংলগ্ন এলাকাটি খুবই ঝঁকিপূর্ণ রয়েছে । তাই নদী শাসন না করে বাঁধ নির্মান করলে তা কোনো কাজে আসবে না। সরকারের সমস্ত টাকাই জলে যাবে । বাঁধ সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দারা জানান, সিডরে তাদের স্বজনদের হারিয়েছেন। সেই ভয় তাদের এখনো তাড়া করে বেড়ায় । তাই একটু বাতাস হলেই মনে হয় এই বুঝি দম বন্ধ হয়ে আসছে।

জানাগেছে, ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর ঘূর্ণিঝড় সিডরের পর এলাকাবাসীর দাবীর প্রেক্ষিতে ২০১৬ সালের ২৬ জানুয়ারী পানি উন্নয়ন বোর্ডের ৩৫/১ পোল্ডারের প্রায় ৬২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের কাজ শুরু হয় । যা বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (বাপাউবো) উপকূলীয় বাঁধ উন্নয়ন প্রকল্প ফেজ-১ সিইআইপি-১) এর মাধ্যমে টেকসই বাঁধ ও স্লুইসগেট নির্মান কাজ চলছে। ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে চায়নার ’সিএইচডব্লিউই’ নামে একটি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান এ কাজ করছে।

শরণখোলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সরদার মোস্তফা শাহিন বলেন, এলাকাটি মারাত্মক ঝুকিতে রয়েছে । ভাঙনরোধে সংশ্লিষ্ট কতর্ৃপক্ষকে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।

বাগেরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী নাহিদুজ্জামান বলেন, ৬২ কিলোমিটার টেকসই বাঁধের কাজ ইতোমধ্যে ৮০ভাগ প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। বাকি কাজ জমি অধিগ্রহণের সমস্যা মিটে গেলে শুরু হবে । বিশ্ব ব্যাংকে প্রস্তাবনা পাঠানোর পর নদী শাসনের বিষয়টিও সমাধানের পথে। আর ভেঙে যাওয়া রিং বাঁধের কাজ আজ রবিবার শুরু হবে।