১৫ বছর ধরে ১৫০ দোকানে রোজ সকালে পূজা দিয়ে আসছেন ঠাকুর বিনোদ মুখার্জী

এস আর শানু খান, মাগুরা: তখনও আমাদের বাড়ি বৈদ্যুতিক বাল্বের সংস্পর্শে পড়েনি। তাতে কি লিখা-লিখি জগতে আমার বয়স তখন তিন বছরের উদ্ধে। কথায় আছে না ইচ্ছা থাকিলে উপায় হয়। নিজের লিখা কোন আর্টিকেল যখন পত্রিকায় ছাপা হয় সেটা দেখতে যে কতটা মধুর হয় এবং সেটা মনের ভিতরে সে যে কি স্বর্গীয় আনন্দের প্রয়াস ঘটায় সেটা সেই লেখকই ভালো বুঝবেন। যাইহোক লেখালিখির নেশাটা তখন পুরোপুরি ধরে ফেলেছে আমায়। তখন মাথায় শুধু একটায় চিন্তা কি নিয়ে লিখা যায়? কোনটা লিখলে ভালো হবে? আর কোনটা লিখলে পত্রিকার সম্পাদক গুরুত্ব সহকারে ছাপাবেন? সারা রাত কাগজে লিখি আর সকাল হলেই চোখ মুছতে মুছতে বগলে ল্যাপটপের ব্যাগ ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়তাম বিদ্যুতের সন্ধানে। উদ্দেশ্য একটাই রাতে লিখা গল্প,রম্য রচনা,কার্টন আইডিয়া,কলাম কিংবা প্রতিবেদনগুলো টাইপ করে পত্রিকায় পাঠাতে হবে। ছুটে যেতাম বাজারে। কখনও ক্লাবে কখনও বা রোকন ভাইয়ের দোকানে, কখনও কখনও বিভিন্ন জনের দোকানে ল্যাপটপ চার্জে দিয়ে বসে টাইপ করবার জন্য ধন্না ধরতাম। কত দোকানদ্বার যে বেয়াকুব করেছে তখন। বেশির ভাগ সময় শান্তু কাকার দোকানের ভিতরে বসে ল্যাপটপ চার্জে লাগিয়ে শুরু করতাম টাইপিং।

সকাল থেকে শুরু করে কোন কোন দিন বিকাল অবধি কোন কোন দিন টানা সন্ধ্যা পযর্ন্তও টাইপিং করতাম। টাইপ করে পত্রিকায় পাঠিয়ে তারপর বাড়ি ফিরতাম। আম্মু এই নিয়ে কত যে বকা দিয়েছেন।ল্যাপটপের ব্যাগ নিয়ে বের হলেই আম্মু বললো গরুর ডাক্তার। ভাবিরা বলতো পরিবার পরিকল্পনার লোক। কেউ বলতো এনজিওর লোক কিস্তি নিতে আয়ছে নাকি লোন দিতে আয়ছে। যখন শান্তু কাকার দোকানের ভিতরে বসে টাইপিং করতাম তখন একটা জিনিস প্রতিদিনই লক্ষ্য করতাম যে একজন মানুষ পরণে তার সাদা পাঞ্জাবি ও ধুতি,কাঁধের উপর দিয়ে হলুদ রঙের তোয়ালে। কপালে সাদা ফোটা। হাতের ঝুপড়ি ভরা বিভিন্ন রকমের তরতাজা সদ্যফোটা ফুল। মুখে তার অনবরত সংস্কৃত ং ৎ সংবলিত শব্দের ছোটাছুটি। দেখেই বোঝা যায় ঊনি ধর্মভীরু কোন এক ব্রাহ্মণ। শান্তু কাকার দোকানের ভিতরে গুনগুনিয়ে সংস্কৃত শব্দের হিন্দু ধর্মীয় মন্ত্র পড়তে পড়তে ঢুকে দোকানের ভিতরে টানানো দেবতার ছবিতে ফুল দিয়ে ভক্তি ভরে পূজা আর্চনা করেন। এবং পুজা আর্চনা শেষে শান্তু কাকার কপালে সাদা একটা ফোটা দেন। শান্তু কাকা দুই এক টাকা দেন সেটা নিয়ে চলে যান। টানা তিন বছর আমি এনাকে দেখেছি ঠিক একই ভাবে। রোজ রোজ উনার মুখের মন্ত্র শুনতে শুনতে আমার প্রায় মুখস্তই হয়ে উঠেছিলো। এরপর আমাদের এলাকা বিদ্যুতের পরশে আলোকিত হলো সেই সঙ্গে আমাদের বাড়িও। ল্যাপটপ নিয়ে বাজারে যাওয়া বন্ধ হলো। বহু বছর খুব সকালে যাওয়া হয় না বাজারে। আর তাইতো সেই ব্রাহ্মণকেও দেখা হয় না। হঠাৎ সেদিন ঊনাকে নিয়ে ভাবতে ইচ্ছা হলো। শুরু করলাম তথ্য সংগ্রহ করা। জানতে পারলাম এখনও তিনি একই রুটিনে রোজ সকালে বাজারে আসেন। দোকানে দোকানে পুজা দিয়ে বেড়ান। সাদা মাঠা ন¤্র ও ভদ্র এই মানুষটার নাম বিনোদ মূখার্জী। জন্মসুত্রেই ব্রাহ্মণ ও গংগারামপুরেরই বাসিন্দা। কোন এক সন্ধ্যায় গিয়ে হাজির হলাম উনার বাড়ি। গংগারামপুর বালিকা বিদ্যালয়ের লাগা উত্তরের ঊনার বাড়ি। এক ছেলে-বউমা আর স্ত্রীকে নিয়েই তিনার সংসার। ভদ্রলোকটার বাবার নাম হরিপদ মুখার্জী। মিষ্টভাষী এই মানুষটার মুখের হাসিতে রয়েছে এক অদ্ভুদ সুখের প্রতিচ্ছবি। জীবনের গল্পের শুরুটা করলেন এইভাবে. জন্ম যেহেতু ব্রাহ্মণ পরিবারে পুজা আর্চনা আমার রক্তের সাথে মেশা। বুঝতে শেখার পর থেকে দেখেছি বাবা কাকারা পূজা আর্চনা দিয়ে বেড়িয়েছেন। এরপর যখন আমার বয়স এলো পৈতা দেওয়া হলো তখন থেকেই পুজা আর্চনা করা শুরু। সংসারের টানা পোড়নে পড়াশুনাটা কপালে জুটে নাই। যা কিছু শিখেছি যা কিছু করি সবই বাবা কাকাদের শেখানো। এরপর বিবাহ করলাম তখনও পুজা আর্চনা করেই চলে সংসারের চাকা। পুজা আর্চনাতো আর রোজ রোজ হতো না তখনও। ঐ যা হতো তাই দিয়েই কায়ক্লেশে চলতো। তখন গংগারামপুর বাজার বেশ উন্নত হয়ে উঠেছে। দোকান প্রাসাদও হয়েছে। একদিন আমাকে বাজারের ডাকলেন। তখন বাজারের বেশির ভাগ দোকানই ছিলো হিন্দুদের। তো তারা ডেকে আমাকে একটা প্রস্তাব দিলেন যে রোজ সকালে তাদের দোকানে গিয়ে পুজা দিতে হবে। বিনিময়ে তারা সন্তুষ্টু হয়ে যা দুই চার আনা দিবে তাতেই সন্তুষ্টু থাকতে হবে। আমি রাজি হলাম। এবং তখন থেকেই এই বাজারে দোকানের পুজা করা শুরু হলো আমার। ১৫ বছর ধরে করছি এটা। প্রথমে দোকানদ্বারেরা আট আনা চার আনা করে দিলেও যুগের সাথে তাল মিলিয়ে এখন দুই টাকা থেকে পাঁচ টাকাও দেয় কেউ কেউ। বাজারে বর্তমানে তা প্রায় ১৫০টা দোকানে রোজ সকালে পূজা দেয় আমি নিজ হাতে। এ থেকে রোজ ২৫০-৩০০ টাকার মত কামায় হয়। এবং বিভিন্ন বাড়িতেও পুজা আর্চনা করি। তাছাড়া আরও একটা গুরু দায়িত্ব পালন করছি গত দুই বছর সেটা হলো গংগারামপুর তথা ৪৩টি গ্রামের সমন্বয়ে গঠিত পুজা মন্দিরের প্রধান পুরোহিত আমি। শারিরিক অবস্থার কথা জানতে চাইতেই হাসি ভরা মুখে বলেন- বয়সওতো আর কম হলো না ৬৩-৬৫ বছর তো হবেই। সব কিছু মিলিয়ে মোটামুটি ভালোই রেখেছেন ঈশ্বর। বাকি জীবনটাও এভাবে হাসি আনন্দ ও মানুষের ভালোবাসায় কাটিয়ে দিতে চাই।