সিলেটে বছরের পর বছর পাথর উত্তোলনের নামে চলছে ধ্বংসযজ্ঞ

এনাম রহমান, সিলেট জেলা প্রতিনিধি: পূণ ভূমি সিলেটের পরিবেশ ও পর্যটন শিল্পের সৌন্দর্য হারাচ্ছে পাথর খেকোদের হাতে, সাথে সরকার হারাচ্ছে বড় ধরনের রাজস্ব। সিলেটের সীমান্তবর্তী জনপদ গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জ, কানাইঘাট ও জৈন্তাপুরে চলছে পাথর উত্তোলনের নামে বছরের পর বছর চলেছে ধ্বংসযজ্ঞ।

পাহাড়, টিলা, সমতলভূমি ও নদী থেকে শুরু করে ঘরবাড়ি, কৃষিজমি, চা বাগান বাদ যায়নি কিছুই এই পাথর খেকো রাক্ষসদের হাত থেকে। এদিকে দেরিতে হলেও প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য ঘেরা ভূমি এই ধ্বংসযজ্ঞ বন্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছে প্রশাসন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য পাথর কোয়ারি চালু রাখতে নানা মহলে তদবির চলছে।

মেঘালয়ের পাহাড়ঘেষা কোম্পানিগঞ্জ উপজেলার শাহ আরেফিন টিলা। এই আরফিন টিলায় চিরনিদ্রায় সায়িত আছেন ৩৬০ আউলিয়ার একজন শাহ আরেফিন (র.) এর মাজার। এক সময়ের সবুজ শ্যামল, উঁচু নিচু ও বিশাল আয়তনের এ টিলাটি এখন রীতিমতো একাধিক গভীর হ্রদের পরিনিত হয়েছে। শুধু আরেফিন টিলাই নয়, পাথর উত্তোলনের পাথর খেকোদের থাবায় ক্ষত বিক্ষত হয়েছে সিলেটের চার উপজেলার সীমান্তবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকা।

যার মধ্যে আছে দৃষ্টিনন্দন প্রকৃতির সৌন্দর্য কন্যা জাফলং, বিছনাকান্দি, লোভাছড়া, ভোলাগঞ্জের মতো বিখ্যাত সাদাপাথর সহ অসংখ্য পর্যটন স্পটও। এসময় গত তিন বছরে অবৈধ পাথর উত্তোলনের বলি হয়েছেন ৭৬ জন নীরিহ পাথর শ্রমিক। দেরি হলেও চলতি মৌসুমে অবাধে পাথর উত্তোলন বন্ধ করে প্রশাসন। কিন্তু ইজারার নামে নামমাত্র রাজস্ব দিয়ে হাজার কোটি টাকার অবৈধ পাথর ব্যবসায় বাধা আসায় নানান মহল থেকে তদবির চালাচ্ছে একটি কুচক্রী সিন্ডিকেট। সিলেট চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজ সভাপতি আবু তাহের মোহাম্মদ শোয়েব জানান,

প্রশাসনের মাধ্যমে যদি কোয়ারিগুলো লিজ দিয়ে ব্যবসা করা হয় তবে আমাদের যারা শ্রমিক আছেন তারাও বাঁচবেন। এই পাথরের সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ীরা উপকৃত হবেন। সিলেট কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল বলেন, এই পাথর কোয়ারিগুলো সচল থাকলে সরকার এখান থেকে প্রচুর পরিমাণে রাজস্ব পাবে। কোয়ারী বন্ধ থাকলে এই অঞ্চলের মানুষ অর্থনৈতিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আর মানুষ যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয় তবে সরকারও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

পর্যটন শিল্পের সাথে যারা জড়িত পরিবেশবাদীকর্মী ও এই শিল্পের সঙ্গে সরাসরি জড়িত সিলেটের অসংখ্য হোটেল মোটেল রিসোর্ট ব্যাবসাহীরা বলছেন, এসব যুক্তি অজুহাতমাত্র। পরিবেশ রক্ষা করে পাথর উত্তোলন অসম্ভব। সিলেট বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম কীম জানান, একটা সময় পাহাড়ি ঢলে পাথর আসতো শ্রমিকরা সেগুলো সংগ্রহ করতো।

এতে পরিবেশে কোন প্রভাব পড়তো না। কিন্তু যখনই আমরা ভূপ্রকৃতির মধ্যে ঢুকে গেছি তখনই এটা পরিবেশ এবং প্রকৃতির মধ্যে এতো বড় একটা আঘাত আসবে আমরা ভাবতে পারিনি। সিলেট বিভাগীয় কমিশনার মশিউর রহমান জানালেন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সমন্বয় ও সংস্কার বিভাগের সচিবের সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে অনেক কিছু।

তিনি আরো বলেন মন্ত্রীপরিষদ বিভাগ থেকে একটি কমিটি করে দেয়া আছে। তারা এসে দেখে গিয়েছেন। তারা প্রতিবেদন জমা দেবার পর সরকারের পক্ষ থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে। এদিকে বর্তমানে পাথর উত্তোলন কিছুটা বন্ধ থাকায় অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে আসতে শুরু করেছে জাফলং, ভোলাগঞ্জ, বিছনাকান্দির মতো স্পটগুলো, মুখোড়িত হয়ে উঠেছে পিকনিক স্পট গুলি।

সিলেটের পর্যটন শিল্প ও পরিবেশ রক্ষায় অবৈধ পাথর বাণিজ্য বন্ধের বিকল্প নেই বলেই মনে করছেন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা ভ্রমণ পিপাসুরা ও পরিবেশকর্মীরা।